• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 3 July, 2026

জিআই স্বীকৃতি পেল কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, ঘূর্ণির শিল্পীদের দীর্ঘ লড়াইয়ে বড় সাফল্য

ঘূর্ণির শিল্পীদের মতে, এই স্বীকৃতির ফলে আর অন্যত্র তৈরি মাটির পুতুলকে ‘কৃষ্ণনগরের পুতুল’ নামে বাজারে চালানো হবে না। ফলে প্রকৃত শিল্পীরা যেমন তাঁদের সৃষ্টির যথাযথ স্বীকৃতি পাবেন, তেমনই ক্রেতাদের কাছেও আসল পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে

জিআই স্বীকৃতি পেল কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, ঘূর্ণির শিল্পীদের দীর্ঘ লড়াইয়ে বড় সাফল্য

Photo: Representational Image

বাংলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পী কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল অবশেষ পেল জিআই বা জিউগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন স্বীকৃতি। দীর্ঘদিন নকল ও বাণিজ্যিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে নদিয়ার ঘূর্ণির শিল্পীরা। অবশেষে এই স্বীকৃতি শুধু আইনি স্বীকৃতিই নয়, বরং তাঁদের বহু প্রজন্মের শিল্প ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শিল্পীদের আশা, এর ফলে একদিকে যেমন কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে, তেমনই দেশ-বিদেশের বাজারে এই পুতুলের কদর আরও বাড়বে।

‘কৃষ্ণনগর ক্লে ডল’ নামে জমা পড়া আবেদনে অনুমোদন মিলেছে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন রেজিস্ট্রির। সরকারিভাবে জিআই রেজিস্ট্রি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশা, খুব তাড়াতাড়িই শিল্পীদের হাতে সরকারি শংসাপত্রও তুলে দেওয়া হবে।

ঘূর্ণির শিল্পীদের মতে, এই স্বীকৃতির ফলে আর অন্যত্র তৈরি মাটির পুতুলকে ‘কৃষ্ণনগরের পুতুল’ নামে বাজারে চালানো হবে না। ফলে প্রকৃত শিল্পীরা যেমন তাঁদের সৃষ্টির যথাযথ স্বীকৃতি পাবেন, তেমনই ক্রেতাদের কাছেও আসল পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যাবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

নদিয়ার কৃষ্ণনগর শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ঘূর্ণি ভারতের অন্যতম প্রাচীন শিল্পগ্রাম। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকেই এখানকার শিল্পীরা বাস্তবধর্মী মাটির পুতুল তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। নিখুঁত কারুকাজ, মানবদেহের সূক্ষ্ম গঠন, মুখের অভিব্যক্তি এবং বাস্তবতার জন্য ঘূর্ণির মাটিরর পুতুল বিশ্বের নানা দেশের সংগ্রহশালা, জাদুঘর, শিল্পগ্যালারি ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে স্থান করে নিয়েছে।

কৃষ্ণনগরের রাজপরিবার নাটোর ও ঢাকা অঞ্চল থেকে দক্ষ কুমোর পরিবারগুলিকে ঘূর্ণিতে বসবাসের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সেই শিল্পীরাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমন এক স্বতন্ত্র শিল্পধারা গড়ে তোলেন, যা আজ কৃষ্ণনগরের পরিচয়ের সঙ্গে আঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

ঘূর্ণি বহু খ্যাতনামা শিল্পীর জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হলেন বীরেন পাল। তিনি ছাড়াও রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত সুবীর পাল, গণেশ পাল, তরিত পাল-সহ বহু শিল্পী এই ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। জাতীয় পুরস্কার না পেলেও আরও বহু শিল্পী বিদশে প্রদর্শনী ও বিভিন্ন শিল্পকর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।

তবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সত্ত্বেও অধিকাংশ শিল্পীর আর্থিক অবস্থা কখনওই খুব স্বচ্ছল ছিল না। হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পী ছাড়া অধিকাংশ পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেও জীবনের শেষ পর্যায়ে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন বীরেন পাল। যা ঘূর্ণির শিল্পীদের বাস্তব পরিস্থিতির এক প্রতীক হয়ে রয়েছে।

 

শিল্পীদের দাবি, কৃষ্ণনগরের আসল মাটির পুতুল তৈরি করতে দীর্ঘ সময়, ধৈর্য এবং নিখুঁত হাতের কাজের প্রয়োজন হয়। ফলে উৎপাদন খরচও অনেক বেশি। অন্যদিকে, পার্যপ্ত বিপণন ব্যবস্থা ও সংগঠিত বাজারের অভাবে তাঁরা ন্যায্য মূল্য পান না। সেই সুযোগে বিভিন্ন জায়গায় ছাঁচে তৈরি নিম্নমানের পণ্য ‘কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল’ নামে বিক্রি হওয়ায় প্রকৃত শিল্পীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন।

এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের লক্ষ্যেই জেলা ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং কুটির শিল্প দপ্তরের উদ্যোগে ওঠে ঘূর্ণি ক্লে ডল অ্যান্ড টেরাকোটা আটিজান ক্লাস্টার কো-অপারেটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি লিমিটেড। ২০২১ সালে এই সমবায় সংস্থাই কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের জন্য জিআই স্বীকৃতির আবেদন জানায়।

কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার অসাধরণ বাস্তবধর্মিতা। মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, শরীরের গঠন, ভঙ্গি এবং আবেগকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলাই এই শিল্পের মূল পরিচয়। এই বৈশিষ্ট্যই দেশের অন্যান্য মাটির বা টেরাকোটার শিল্পধারা থেকে ঘূর্ণির কাজকে আলাদা করেছে।

জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর শিল্পীদের আশা, এবার কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড পরিচিত তৈরি হবে। এতে আসল হস্তনির্মিত শিল্পকর্মের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সহজ হবে এবং নকল পণ্যের দৌরাত্ম্যও অনেকটাই কমবে।

রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী সুবীর পাল এই স্বীকৃতিকে দীর্ঘ আন্দোলনের সাফল্য বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘বহু বছরের অপেক্ষার অবসান হল। আমরা আশা করি, জিআই স্বীকৃতি ঘূর্ণির মাটির শিল্পের স্বকীয়তা রক্ষা করবে। আমাদের শিল্পের মৌলিকত্বকে সুরক্ষিত রাখবে। এই সম্মান শুধু বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের নয়, যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁদের সকলের।‘

ঘূর্ণির শিল্পীদের কাছে এই জিআই স্বীকৃতি কেবল একটি আইনি স্বীকৃতি নয়, এটি বাংলার এক অনন্য শিল্প ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক মর্যাদার স্বীকৃতি। তবে এই স্বীকৃতি শিল্পীদের আর্থিক অবস্থার কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তা নির্ভর করবে কার্যকর বিপণন, শক্তিশালী ব্র্যান্ড গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার উপর।