হুগলির ঐতিহ্যের ভাণ্ডারে এবার যুক্ত হল গৌরবের নতুন অধ্যায়। চন্দননগরের বিখ্যাত জলভরা সন্দেশ, জনাইয়ের ঐতিহ্যবাহী মনোহরা এবং বলাগড়ের শতাব্দীপ্রাচীন ডিঙি নৌকা শিল্প পেল জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা জিআই স্বীকৃতি। এই সম্মান শুধু তিনটি পণ্যের পরিচিতিকেই নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিল তা নয়, একই সঙ্গে দেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের মানচিত্রে আরও উজ্জ্বল করল হুগলির নাম।
বাঙালির রসনা তৃপ্তিতে জলভরা সন্দেশ এক আবেগের নাম। এতদিন এই জনপ্রিয় মিষ্টি ‘সূর্য মোদকের জলভরা’ হিসেবেই পরিচিতি ছিল। কিন্তু জিআই স্বীকৃতির পর এই মিষ্টি এখন বিশ্বদরবারে পরিচিত হবে ‘চন্দননগরের জলভরা’ নামে। দীর্ঘ চার বছরের আইনি ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার পর এই স্বীকৃতি মিলেছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট মিষ্টি ব্যবসায়ী শৈবাল মোদক। তাঁর কথায়, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে এই স্বীকৃতি অত্যন্ত জরুরি ছিল। তবে শুধু সম্মান নয়, এখন বড় চ্যালেঞ্জ জলভরার সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি করা। ব্যবসায়ীদের দাবি, গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মিষ্টি ভালো থাকার মেয়াদ বা ‘শেল্ফ লাইফ’ বাড়ানো গেলে বিদেশের বাজারেও বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হবে। একইসঙ্গে জলভরার স্রষ্টা সূর্য মোদকের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে তাঁর মূর্তি স্থাপনের দাবিও উঠেছে।
অন্যদিকে, জনাইয়ের বিখ্যাত মিষ্টি মনোহরাও জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। শতাব্দীপ্রাচীন এই মিষ্টি তার স্বাদ ও বিশেষ প্রস্তুত প্রণালীর জন্য বাংলার মিষ্টি ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। ব্যবসায়ীদের আশা, এই স্বীকৃতির হাত ধরে দেশ-বিদেশে আরও বাড়বে মনোহরার পরিচিতি ও বাজার। মিষ্টির পাশাপাশি জিআই সম্মান পেয়েছে বলাগড়ের ঐতিহ্যবাহী ডিঙি নৌকা শিল্পও। প্রায় চার বছরের গবেষণা, বিস্তৃত নথি এবং পাঁচ দফা শুনানির পর এই স্বীকৃতি মিলেছে। গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানান, বলাগড়ের নৌকার নির্মাণশৈলী, ইতিহাস ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই ঐতিহ্যকে সামনে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন অধ্যাপক পিনাকী ঘোষ এবং শান্তনু পান্ডা।
তবে স্বীকৃতির আনন্দের মাঝেও রয়ে গেছে শিল্পীদের উদ্বেগ। বলাগড়ের নৌকার প্রধান ক্রেতা অধিকাংশই আর্থিকভাবে দুর্বল মৎস্যজীবীরা। সে কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারিগররা নৌকার যথাযথ মূল্য পান না বলে অভিযোগ। নৌকা তৈরির কাজে যুক্ত শিল্পীদের দাবি, জিআই স্বীকৃতির পাশাপাশি নৌকাকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি আর্থিক সহায়তা, আধুনিক বিপণন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করুক। বিশেষজ্ঞদের মতে, জিআই ট্যাগ কোনও পণ্যের শুধুমাত্র পরিচয়ের সনদ নয়। বরং এটি একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেয়। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে চন্দননগরের জলভরা, জনাইয়ের মনোহরা এবং বলাগড়ের ডিঙি নৌকা আগামী দিনে বিশ্ববাজারে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অনন্য দূত হয়ে উঠতে পারে।




