• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 1 July, 2026

বিনামূল্যে আড্ডা মারার দিন শেষ? রবীন্দ্র সরোবরে ঢুকতে গেলেই এবার লাগবে ‘প্রবেশ মূল্য’

কলকাতার অন্যতম প্রধান সবুজ ফুসফুস রবীন্দ্র সরোবরে সকাল ১০টার পর প্রবেশ মূল্য বা টিকিট ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে নগরোন্নয়ন দফতর ও কেএমডিএ।

বিনামূল্যে আড্ডা মারার দিন শেষ? রবীন্দ্র সরোবরে ঢুকতে গেলেই এবার লাগবে ‘প্রবেশ মূল্য’

রবীন্দ্র সরোবর (IANS)

কংক্রিটের জঙ্গলঘেরা তিলোত্তমার বুকেও যেটুকু সবুজ অবশিষ্ট রয়েছে, তার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল দক্ষিণ কলকাতার রবীন্দ্র সরোবর (Rabindra Sarobar)। এবার সেই ঢাকুরিয়া লেকের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে গেলে পকেট থেকে খসতে পারে নগদ অর্থ। রাজ্য নগরোন্নয়ন দফতর (Urban Development Department) এবং কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা কেএমডিএ (KMDA) সরোবর চত্বরে সকাল ১০টার পর থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ মূল্য (Entry Fee) নির্ধারণ করার একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে। আর এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই কলকাতায় শুরু হয়েছে বিতর্ক। নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে পরিবেশকর্মী ও পক্ষীপ্রেমীদের একাংশ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যথারীতি সরব হয়েছেন।

এক নজরে প্রস্তাব ও বিতর্ক (Key Highlights)

  • মূল প্রস্তাব: সকাল ১০টার পর রবীন্দ্র সরোবরে ঢুকতে গেলে সাধারণ নাগরিকদের কাটতে হবে টিকিট।
  • প্রশাসনের সওয়াল: রক্ষণাবেক্ষণের খরচ সংগ্রহ এবং মাত্রাতিরিক্ত ভিড় ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ।
  • নাগরিকদের আপত্তি: প্রকৃতির বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ হোক, শহরের অন্যতম উন্মুক্ত সবুজ স্থানটি সর্বসাধারণের জন্য অবারিত রাখা হোক।
  • পক্ষীপ্রেমীদের উদ্বেগ: সকাল ১০টার পরেই নিভৃতে পক্ষী-চর্চার প্রকৃত সময়। প্রবেশ মূল্য চালু হলে সমস্যায় পড়বেন শিক্ষার্থী ও পরিবেশ গবেষকরা।

রক্ষণাবেক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ: প্রশাসনের যুক্তি

সম্প্রতি রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল (Urban Development & Municipal Affairs Minister Agnimitra Paul) রবীন্দ্র সরোবর চত্বর পরিদর্শন করেন। লেকের জল পরিচ্ছন্ন রাখা, শুকনো পাতা ও আগাছা পরিষ্কার এবং সামগ্রিক সৌন্দর্যায়নের (Beautification) উপর তিনি বিশেষ জোর দেন। এর পরেই প্রশাসনের উচ্চমহল থেকে এই প্রবেশ মূল্যের প্রস্তাবটি সামনে আসে। কেএমডিএ-র এক শীর্ষ কর্তার মতে, সরোবরের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং অসামাজিক কার্যকলাপ বা অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ (Crowd Control) করার লক্ষ্যেই এই টিকিট ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণকারীদের (Morning Walkers) আশ্বস্ত করে জানানো হয়েছে, সকাল ১০টা পর্যন্ত তাঁদের জন্য বিশেষ বিনামূল্যে পাসের (Free Pass) ব্যবস্থা থাকবে। এর পর সাধারণ দর্শনার্থীদের টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। বর্তমানে সল্টলেকের বনবিতান বা সেন্ট্রাল পার্কেও (Central Park) এই ধরনের ব্যবস্থা সফলভাবে চালু রয়েছে বলে আধিকারিকরা যুক্তি দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন: কলকাতায় ছুটবে ওয়াটার মেট্রো, কোন কোন রুটে পাবেন পরিষেবা?

প্রকৃতির বাণিজ্যিকীকরণ রুখতে হবে: ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ

প্রশাসনের এই যুক্তি অবশ্য কোনওভাবেই মেনে নিতে নারাজ সরোবরের নিয়মিত দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, শহুরে দমবন্ধ পরিবেশে প্রকৃতির এই মুক্ত বাতাসটুকু সকলের মৌলিক অধিকার, সেখানে টিকিটের পাঁচিল তোলা অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। দক্ষিণ কলকাতার এটাই একমাত্র বড় উন্মুক্ত সবুজ পরিসর (Open Green Space), যেখানে দিনমজুর থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত, প্রবীণ নাগরিক ও সমাজের প্রান্তিক (Underprivileged) মানুষজন নিখরচায় কিছুটা সময় কাটানোর বা বিশ্রামের সুযোগ পান। অবসরের আড্ডায় বা ক্লান্তির বিশ্রামে এভাবে টাকার অঙ্ক জুড়ে দেওয়াকে ‘প্রকৃতির বাণিজ্যিকীকরণ’ (Commercialization of Nature) বলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন নিয়মিত ভ্রমণকারীরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এটি কোনও ফান্ডের অভাব নয়, বরং সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অভাব। প্রতিদিন প্রবেশ মূল্য দিতে হলে তা সাধারণ মানুষের পকেটে বড়সড় টান ফেলবে।

আশঙ্কায় পরিবেশবিদরা

এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন কলকাতার পক্ষীপ্রেমী ও পরিবেশবিদদের সংগঠন ‘বায়োডাইভারসিটি অফ রবীন্দ্র সরোবর’ (Biodiversity of Rabindra Sarobar)-এর সদস্যরা। ঢাকুরিয়া লেক শুধুমাত্র মানুষের ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি শহরের অন্যতম প্রধান জীববৈচিত্র্য হটস্পট (Biodiversity Hotspot)। এখানে সাইবেরিয়া বা হিমালয় অঞ্চল থেকে প্রতি বছর বহু পরিযায়ী পাখি (Migratory Birds) আসে। পক্ষীবিদ ও গবেষকদের দাবি, সকাল ১০টার পর যখন প্রাতঃভ্রমণকারীদের কোলাহল কমে, তখনই শান্ত পরিবেশে পাখি দেখার আসল সময় শুরু হয়। যদি প্রতিদিন প্রবেশ মূল্য দিতে হয়, তবে স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, তরুণ গবেষক এবং অপেশাদার প্রকৃতিপ্রেমীরা সরোবরে আসার আগ্রহ হারাবেন। সল্টলেকের বনবিতানে প্রবেশ মূল্য চালুর পর সেখানেও পক্ষী-চর্চায় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ নথিবদ্ধকরণে ভাঁটা পড়েছে বলে তাঁরা উদাহরণ দেন। ক্যামেরা ব্যবহারের উপর অতিরিক্ত শুল্ক বসানোর আশঙ্কাও তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। এই বিষয়ে পুনর্বিবেচনার জন্য তাঁরা শীঘ্রই নগরোন্নয়ন মন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে চলেছেন বলে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে, রবীন্দ্র সরোবরের টিকিট চালুর এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র নানা মুনির নানা মত। একদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের সওয়াল, অন্যদিকে আমজনতার মুক্ত বাতাসের অধিকার, এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে ঢাকুরিয়া লেকের জলে কতটা আলোড়ন পড়ে তার উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভেই নিহিত।