অতনু রায়
রাজনীতি মানেই কি কেবল পাটিগণিতের হিসেব, ভোটব্যাঙ্ক আর ইস্তাহারের লড়াই? আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে থাকে মানুষের অবদমিত বাসনা, ভয় আর অহং-এর এক মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান যখন নীতি আর কৌশলের কচকচানিতে ব্যস্ত, তখন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে রাজনীতি কেবল নীতির লড়াই নয়, বরং তা হয়ে ওঠে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক রঙ্গমঞ্চ।
Advertisement
ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ বা সাইকোঅ্যানালাইসিস তত্ত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম যুগান্তকারী আবিষ্কার। সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্যের পাশাপাশি রাজনীতির জটিল সমীকরণ বুঝতেও এই তত্ত্বের প্রয়োগ সর্বজনস্বীকৃত। ফ্রয়েড মানবমনকে চেতন বা কনসাস, অবচেতন বা সাব-কনসাস ও অচেতন বা আনকনসাস, তিন স্তরে ভাগ করেছিলেন। ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণের নিরিখে ভারতীয় রাজনীতির বহুস্তরীয় প্রেক্ষাপটে রাজনীতিকদের আচরণ এবং জনমানসে তার প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে ক্ষমতা, জনমত এবং নেতৃত্বের মনস্তত্ত্বের এক ভিন্ন আঙ্গিক উন্মোচিত হতে পারে, বলাই বাহুল্য।
Advertisement
ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব বলে, মানুষের ব্যক্তিত্ব তিন উপাদানে বিভক্ত। ইড্, ইগো আর সুপার-ইগো। ‘ইড্’ হল আমাদের অবদমিত বাসনা যা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি খোঁজে। ভারতীয় রাজনীতিতে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার যে প্রবল প্রবণতা বা মোহ আমরা দেখি, তা ‘ইড’-চালিত আচরণ বলা চলে। রাজনৈতিক ইস্তাহার, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বা নেতাদের ভাষণে যে নৈতিকতার কথা শুনি, তা এই সুপার-ইগোর প্রকাশ। আসলে তা সমাজের নীতিবোধ এবং আদর্শের সুপার-ইগোর রূপক। আর বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে ‘ইড্’ আর ‘সুপার-ইগো’কে ব্যালান্স করে ‘ইগো’।
কিন্তু ভারতীয় রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায় জনসমক্ষে সুপার-ইগোর প্রতিশ্রুতির নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ে ‘ইড্’-এর ক্ষমতালিপ্সা। চকিত দলবদল, অর্থের অপব্যবহার সহ নানাবিধ দুর্নীতি প্রমাণ করে যে, সমসাময়িক রাজনীতিতে অনেকক্ষেত্রেই ‘ইগো’ তার যুক্তি বিসর্জন দিয়ে ‘ইড’-এর কাছে আত্মসমর্পণ করছে।
ফ্রয়েড বলেছিলেন, মানুষ যখন অসহ্য সত্যের মুখোমুখি হয়, তখন সে মানসিক আত্মরক্ষা বা ‘ডিফেন্স মেকানিজম্’ অবলম্বন করে যা মূলত ‘ডিনাইয়াল’, ‘র্যাশনালাইজেশন’ এবং ‘প্রজেকশন’-এর উপর দাঁড়িয়ে। ভারতীয় রাজনীতিতে ‘ডিফেন্স মেকানিজম্’ দিনের আলোর মতোই দৃশ্যমান। রাজনীতিবিদরা অত্যন্ত সুচারুভাবে নিজেদের স্বার্থে এগুলির ব্যবহার করেন।
‘ডিনাইয়াল’ ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রকট বৈশিষ্ট্য। কোনো বড় রাষ্ট্রীয় সংকটকে অস্বীকার করে মেকি পজিটিভিটির প্রচার, যে কোনো অর্থনৈতিক ব্যর্থতার পরিসংখ্যানকে মুখের উপর অস্বীকার করা, সামাজিক সাম্যহীনতার প্রশ্ন শুনতে অস্বীকার করাকে কেবলই কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং নেতাদের ভাবমূর্তি বা রাজনৈতিক ‘ইগো’ অক্ষুণ্ণ রাখার অবচেতন প্রচেষ্টা বা প্রাতিষ্ঠানিক ‘ডিনাইয়াল’ হিসেবেই দেখা যায়।
র্যাশনালাইজেশনও আছে শিরায় শিরায়। ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক জোট বা ঘোড়া কেনাবেচার (পড়ুন জনপ্রতিনিধি) মতো অনৈতিক ঘটনাগুলোকে বৃহত্তর জনস্বার্থের মোড়কে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করার চেষ্টা তো চলে হরবখত্।
নিজের দুর্বলতা বা দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভারতীয় রাজনীতির এক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। একজন নেতা নিজের দলের দুর্নীতিকে আড়াল করতে প্রতিপক্ষের দিকে রোজ আঙুল তোলেন। একটি রাজনৈতিক দল তাদের সাম্প্রদায়িক অবস্থানকে জাতীয় নিরাপত্তার ভাষায় মুড়ে দেয়। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব বা প্রশাসনিক সমস্ত ব্যর্থতার দায় ক্ষমতাসীন দল অবলীলায় বিরোধী দল, পূর্বতন সরকার, বা অদৃশ্য কোনো চক্রান্তের ওপর চাপিয়ে দেয়। এ সবই ‘প্রজেকশন’-এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ফ্রয়েডীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব অচেতন মনের সেই কাজ, যেখানে নিজের অগ্রহণযোগ্য আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিপক্ষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ভারতীয় সমাজে পরিবারের কর্তার প্রতি একধরণের প্রশ্নহীন আনুগত্য তথা নির্ভরতার সংস্কৃতি রয়েছে। রাজনীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। সাধারণ মানুষ বা ‘মাস’ তাদের দৈনন্দিন জীবনের হতাশা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তি পেতে অবচেতনভাবেই একজন অভিভাবকের সন্ধান করে। সিংহভাগ রাজনৈতিক দলই একজন নির্দিষ্ট নেতা বা নেত্রীকে ‘সর্বময়’ কর্তৃত্ব দেয় এবং অভিভাবক হিসেবে প্রজেক্ট করে সেই মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতার সুযোগ নেয়। শুরু হয় ব্যক্তিপুজো বা ‘কাল্ট পলিটিক্স’। সেই নেতার ভুলভ্রান্তিকেও মানুষ অন্ধভাবে সমর্থন করতে শুরু করে, কারণ তাঁর পতন ‘মাস’-এর অবচেতনের নিরাপত্তাবোধকে বিঘ্নিত করে। ফ্রয়েডের ‘ফাদার ফিগার নিউরোসিস’-এর ধারণা অনেকটাই ছুঁয়ে যায় ‘কাল্ট পলিটিক্স’কে।
ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ‘নার্সিসিজম’ বা আত্মরতি। ভারতীয় রাজনীতির জাতীয় ও আঞ্চলিক উভয় ক্ষেত্রেই এই ধরণের নার্সিসিস্টিক নেতৃত্বের উত্থান আমরা দেখেছি যা ফ্রয়েড বিধৃত প্যাটার্নের সঙ্গে মেলে। রাজনীতিতে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর পর অনেক নেতার মধ্যেই এই আত্মরতির চরম প্রকাশ দেখা যায়। তাঁরা নিজেদের ইমেজকে দলের এবং আরো বাড়াবাড়িতে রাষ্ট্রের সমার্থক ভাবতে শুরু করেন যা মেগালোম্যানিয়া’ বা অতি-অহং-এরই বহিঃপ্রকাশ। এই নার্সিসিস্টিক প্রবৃত্তিই জন্ম দেয় ‘অটোক্রেসি’ বা একনায়কতন্ত্রের, যা যেকোনো সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করতে শেখায়।
ফ্রয়েড তাঁর ‘গ্রুপ সাইকোলজি অ্যান্ড দ্য অ্যানালিসিস অব দ্য ইগো’ গ্রন্থে জনগণের মনস্তত্ত্ব বর্ণনা করে দেখিয়েছেন, কীভাবে ‘মাস’-এর অবচেতনে আবেগ প্রাধান্য বিস্তার করে ও ব্যক্তির নিজস্ব বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। ভারতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে এই ‘গ্রুপ সাইকোলজি’ বড় অস্ত্র। নির্বাচনী জনসভাতে নেতারা তথ্য বা যুক্তির চেয়ে ধর্ম, জাতপাত, আঞ্চলিক অস্মিতার মতো আবেগের বিষয়ে বেশি জোর দেন। এবার, জাতি, ধর্ম বা ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সমর্থন প্রায়শই যুক্তিনির্ভর নয়। কিন্তু ‘গণ’ যখন কোনো একজন ব্যক্তির মধ্যে তাঁদের যাবতীয় স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষাকে সমর্পণ করে, তখন ফ্রয়েডের ‘আইডিয়াল ইগো’র ধারণাটি সামনে চলে আসে। সাধারণ মানুষ নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা সেই নেতার মধ্যে সফল হতে দেখে। ফলে নেতার ভুলত্রুটিগুলি তখন তাঁদের কাছে গৌণ হয়ে যায়, কারণ সেই নেতা তখন কেবল একজন মানুষ নন, বরং তাঁদের নিজেদেরই একটি উন্নত সংস্করণের প্রতিফলন। তখন, ‘মাস’-এর মন আর যুক্তি বোঝে না, তারা চরমপন্থী আবেগে সাড়া দেয়। আর এই আবেগ উসকে দিয়েই সমাজে মেরুকরণ সৃষ্টি করা হয়।
রাজনীতিতে ভাষার ব্যবহার এবং প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমণ অনেক সময়ই ফ্রয়েডীয় ‘থ্যানাটোস’ বা ‘ডেথ ড্রাইভ’ তত্ত্বের প্রকাশ। জনসভায় নেতাদের উচ্চস্বর, আক্রমণাত্মক শরীরী ভাষা এবং প্রতিপক্ষকে ধুলিসাৎ করে দেওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়, তা আদতে মানুষের আগ্রাসী প্রবৃত্তিরই সামাজিক রূপান্তর। যখন কোনো নেতা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষণ দেন, তখন তিনি জনগণের মধ্যের সঞ্চিত ক্ষোভ আর অবদমিত ক্রোধকে একটি পথ করে দেন। জনতা সেই ক্রোধের মধ্যে নিজেদের মুক্তি খুঁজে পায়।
ভারতীয় রাজনীতি আজ এমন অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পারসেপশন-এর মূল্য অনেক বেশি। ভারতীয় রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় সেই মনস্তত্ত্বই, যা মানুষের ভয়কে ভরসায় আর ক্রোধকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতাদের কেবল তাঁদের কথার নিরিখে বিচার করলে চলবে না, তাঁদের অবচেতন মনস্তত্ত্বকেও বুঝতে হবে। কারণ, রাজনীতিকরাও প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত মানুষ। একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব হল আবেগের বশবর্তী না হয়ে, ‘ইড্’-এর প্ররোচনাকে পাশ কাটিয়ে ‘ইগো’ এবং ‘সুপার-ইগো’র যৌক্তিক মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করা। কারণ রাজনীতি কেবল ভোটব্যাঙ্কের হিসেব নয়, বরং মানবমনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দর্পণ। রাজনীতি মানুষের তৈরি। আর মানুষ কখনও সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত নয়। ফ্রয়েড সেই অযুক্তির মানচিত্র এঁকে দিয়েছিলেন। ভারতীয় রাজনীতির জটিল আবর্তে সেই মানচিত্র আজও প্রাসঙ্গিক। তাই সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মৃত্যুর প্রায় ন’দশক পরেও তাঁর মনঃসমীক্ষণ তত্ত্ব মানবমনের গহীনে আলো ফেলার এক অনন্য হাতিয়ার হয়ে রয়েছে।
Advertisement



