শ্রেয়া সরকার
জলে ভেসে চলছে ভেলা। এই নদীই নাকি তাকে পৌঁছে দেবে স্বর্গে। সাপে কাটা দেহকে দাহ করা হয় না, ভাসিয়ে দেওয়া হয় জলে। তার স্বামীর মরদেহর সঙ্গে তাই সেও চলেছে ভেসে। পরিবারের সবাই বারণ করেছিল তাকে, সে শোনেনি। তার আলুথালু বেশভূষা দেখে নদী পারের কেউ অবাক হচ্ছে, তো কেউ পাগল ভেবে দেখছে অবজ্ঞার চোখে। সে সব গায়ে মাখেনি সে। সে জানে তার লক্ষ্য অনেক বড়, অনেক কঠিন।
Advertisement
দেবদেবীদের থেকে নিজের স্বামীর প্রাণভিক্ষা চাইতে হবে তাকে। নিয়তির লিখন মুছে সিঁথির সিঁদুর বাঁচানো কি মুখের কথা! কিন্তু এই ঘাটে নাইতে আসা গ্রামের বউ-ঝিদের বিদ্রূপ কানে আসে তার। অবাক হয় সে, নিজেরা মেয়ে হয়ে অন্য এক মেয়ের দুঃখে প্রাণ কাঁদে না এদের? তবুও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সে। কিন্তু তার প্রতিবাদ না করাটা যেন আরো উপহাসের ব্যাপার হয়ে ওঠে ওদের কাছে। আর সহ্য হয় না তার। নদী থেকে এক আঁজলা জল তুলে সে ছুঁড়ে দেয় ওই গ্রামের বাতাসে, সঙ্গে ভেসে যায় তার স্বগতোক্তি— ‘আমি যদি সতী হই, তবে আমার চরম দুঃখে পরিহাস করার অপরাধে আমার মতোই অকাল বৈধব্যের জ্বালা যেন ভোগ করতে হয় তোমাদেরকেও…’
Advertisement
১
‘এতো লোভ করার কী দরকার ছিল বল তো? এখন ঠ্যালা সামলাও…’
—শ্যামলের কপালের কেটে যাওয়া অংশটায় তুলোয় করে ডেটল ঘষতে ঘষতে প্রায় ফুঁপিয়ে উঠলো বনানী!
শ্যামল মোবাইলটা ঘাঁটছিল। সম্ভবত আজকের ঘটনার কোনো খবর সমাজমাধ্যমে এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে কিনা জানতে। বনানীর কথার জবাবে ফোনের স্ক্রিন থেকে মুখটা তুলল—
‘আরে, আমি কীভাবে জানবো যে আগের প্রধান ওই বিডিওর সঙ্গে মিলে এমন একটা ঘাপলা পাকিয়ে রেখেছে…’
‘আমি আগেই পইপই করে বলেছিলাম যে— ওগো তোমার ব্লকের চাকরিতেই আমাদের চলে যাবে; যতোই কন্ট্র্যাক্টচুয়াল কাজ হোক, জমিজমাও তো কিছু আছে আমাদের নাকি… ছোট সংসার… ভালোভাবেই চলে যেত। কিন্তু না, তোমার পার্টির সাঙ্গোপাঙ্গোদের কথায় নেচে আমাকে পঞ্চায়েত ভোটে দাঁড় করালে। আর আমাদের গাঁয়ের লোকগুলোকেও বলিহারি যাই বাপু! সেই কোন সত্যযুগে আমার শ্বশুরমশাই স্কুলের নামী হেডমাস্টার ছিলেন বলে আমাকেই ভোটে জেতাতে হবে! যত্তো সব। এখন নিজেরা তো ঘরে মুখ লুকিয়ে বসে থাকবে আর বিরোধী দলের যতো হুজ্জুত সব আমাদের পোয়াতে হবে…’
—কথাগুলো একনাগাড়ে বলে গরমে হাঁপাতে শুরু করেছে বনানী।
শ্যামল কাউকে একটা ফোনে ধরবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ওপাশে রিং হয়ে কেটে গেল।
শ্যামলের বাবা এখন আর বেঁচে নেই। শ্যামলের মা বছর আটেকের নাতিকে পাশের বাড়িতে টিউশন পড়তে নিয়ে গিয়েছেন। ঘণ্টা দেড়েক পরে পড়া শেষ হলে নাতিকে সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরবেন। পাশের বাড়ির হালদার গিন্নির সঙ্গে পান মুখে দিয়ে সন্ধের টিভি-সিরিয়ালটা দেখা ওঁর নিত্যকর্মের মধ্যেই পড়ে।
‘…এখন নতুন জয়েন্ট বিডিও সাহেবই ভরসা। নদীর ড্রেজিং আর অন্যান্য সংস্কারের জন্য যে টাকাটা সরকার থেকে মঞ্জুর করেছিল তার খরচ আর কাজের হিসেবের গরমিলটা তো ওই নতুন জয়েন্ট বিডিওই ধরলেন। আর সেই নিয়ে জিজ্ঞেস করাতেই বিডিও অফিসে আগের প্রধান এসে এমন হাঙ্গামা খাড়া করলো আজ যে, ব্যাপার একেবারে হাতাহাতি অব্দি পৌঁছে গিয়েছে! আমি যে এখনকার গ্রামপ্রধানের স্বামী আর ওই অফিসেই কাজ করি সে তো সবারই জানা! বিডিও এখন পুরো চুপ। এমন হাবভাব করছে যেন দোষটা আমাদের, মানে নিজেদের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে, নিজেদের পিঠ বাঁচিয়ে গ্রামের লোকদের বোকা বানানোর চেষ্টা আরকি! ভাবো একবার।’
—শ্যামলের কথাগুলো শুনে মনে মনে ভয়ে যেন আরো কুঁকড়ে গেল বনানী। নেহাত সে শ্যামলের প্রেমে পড়েছিল তাই, নইলে বনানীর বাবা এই জগাইপুর অঞ্চলে মেয়ের বিয়ে দিতেন না কিছুতেই! সেই কোন কাল থেকেই বিভিন্ন কারণে অকাল-বিধবা হওয়ার ঘটনা এখানে নেহাত কম নয়!
গ্রামপ্রধান হওয়ার এক মাসও পেরোয়নি; আর শ্যামলকে এখন দুষলেও বনানী নিজেও জানে যে, কোনও বদ মতলবে ওকে ভোটে দাঁড় করায়নি শ্যামল। সুনাম রয়েছে বলেই ভোটে জিতেছে ওরা। তবুও থেকে থেকে একই কথা বিড়বিড় করেই চলে সে— ‘এবার কী হবে বল তো…’
২
নদীটার নাম বেহুলা। স্থানীয় মানুষদের কেউ কেউ উচ্চারণের দোষে বলে বেউলা। উত্তরবঙ্গের এই জেলার মূল নদী মহানন্দার শাখানদী এই বেহুলা নদী— মহানন্দা আর টাঙ্গন নদীর মাঝের যোগসূত্র। মহানন্দা থেকে জল এই নদীর মধ্যে দিয়েই গিয়ে মেশে টাঙ্গনে।
—এই সব কেতাবি জ্ঞান রণজয় জেনেছিল সরকারি প্রশাসনিক চাকরির পড়া পড়বার সময়। এখন জয়েন্ট বিডিও হয়ে এই ব্লকে আসার পর তার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে জমা হচ্ছে আসল বাস্তব জ্ঞান।
‘দ্যাখেন স্যার, ইটভাঁটার সব আবর্জনা তো ওই নদীতেই গিয়ে জমে; এমনকি পাশের শ্মশানের ছাইভস্ম ফেলার জায়গাও ওই বেউলা! ড্রেজিং ফ্রেজিং তো আজ অব্দি কখনো হয়নি। গাঁয়ের লোকজনও কিছু কম যায় না! হয় কেউ ধারের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে নয়তো চরা পড়া জায়গায় বাড়িঘরও বানিয়ে ফেলছে! এদিকে নদীটার অবস্থা পচা ডোবার মতো হয়ে যে, নিজেরাই চাষের জল আর মাছচাষের সুবিধা ক’দিন পর থেকে আর পাবেই না, সেই খেয়াল আর কারোর নেই…’
—কথাগুলো একটানা বলে দম নিল জগাইপুর অঞ্চলের পঞ্চায়েত মেম্বার নিরঞ্জন মন্ডল। আজ প্রধান বনানী দাসের স্বামী শ্যামল একা আসেনি, সঙ্গে এনেছে একেও। আগের দিনের ঘটনার পর আনবারই কথা। যদিও নতুন জয়েন্ট বিডিও রণজয় নন্দী এর থেকেও বেশি লোকজন আশা করেছিল।
‘হুঁ, সবই তো বুঝলাম। না হয় প্রশাসনিক দিক থেকে একটু কড়া হলেই ওই ইটভাঁটা আর নদীর ধারের মাটি চুরির ঘটনাগুলো কমানো সম্ভব। তবে শ্মশানের ব্যপারটাই একটা ধর্মীয় ভাবাবেগ থাকায় সেটা আপনাদের মতো স্থানীয়দেরকেই ম্যানেজ করতে হবে। আর ড্রেজিংয়ের ব্যাপারটা খুবই গোলমেলে হয়ে আছে। শ্যামলবাবু তো সবই জানেন। খাতায়-কলমে দেখাচ্ছে কাজ হয়েছে, টাকা খরচ হয়েছে অথচ শুনছি কিছুই নাকি হয়নি! এখন এই রহস্যের কোনো ঠিকঠাক সমাধান না হলে তো একই কাজের জন্য আবার সরকারি অনুদান পাওয়া সম্ভব নয়।’
—রণজয় কথা শেষে সামনের ফাইলটার দিকে হাত বাড়ায়।
শ্যামল আর নিরঞ্জন হতাশ দৃষ্টিতে একে অপরের মুখের দিকে তাকায়।
৩
শ্রাবণ মাসের প্রায় শেষ এখন। মনসা গানের সময়। সংক্রান্তিতে পূজার ঘট ভরে প্রায় সারা রাত ধরে চলে পালা-গান। ‘মনসামঙ্গল’-এর সব ঘটনাই দেখানো হয় নেচে, গেয়ে, অভিনয় করে। বেহুলা-লখীন্দরের বিয়ের দিন সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় প্রতি বছর। এই বছর অবশ্যি ব্যতিক্রম!
গত কয়েক মাসের প্রচুর ঝগড়া-ঝামেলার পর গাঁয়ের মাতব্বরেরা জমা হয়েছে আলোচনা সভায়।বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত আছে জগাইপুরের প্রতিটি বাড়ি থেকে অন্তত একজন করে সদস্য। এছাড়াও পঞ্চায়েতের কর্মচারীরা— মানে সচিব, সহায়ক আর সরকারি আমলা অর্থাৎ বিডিও এবং জয়েন্ট বিডিও অব্দি উপস্থিত আছে মিটিংয়ে। প্রাক্তন ও বর্তমান প্রধান, উপপ্রধান, মেম্বার ছাড়াও যোগ দিয়েছে দুই দলের সাধারণ কর্মীরা। পঞ্চায়েত অফিসের পাশেই হাইস্কুলের মাঠে বসেছে এই সভা। সভায় পৌরোহিত্য করতে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ রাধু মল্লিককে। অন্তত নিরপেক্ষ একজনকে তো সভাপতি করা উচিত; তাই রাধুবাবুকে নিয়ে আপত্তি তোলেনি কেউই। সভার উদ্দেশ্য একটাই— বেহুলা নদীর সংস্কারের ব্যবস্থা।
‘গত কয়েক মাস ধরে তো অনেক অশান্তির খবরই কানে আসছে! এতো সমস্যা তো কখনো ছিল না এই গাঁয়ে। তা বলি ও হরেন, শ্যামলরা যা অভিযোগ করছে তা কি ঠিক? তুমি একটা পয়সাও নদীটার পরিষ্কারের কাজে লাগাওনি এতোদিন?’ —রাধু মল্লিকের গলাটা গমগম করে ওঠে।
জগাইপুর অঞ্চলের প্রাক্তন গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান হরেন হালদার সঙ্গে সঙ্গে ফোঁস করে ওঠে— ‘আপনারা তো আজকাল আমার কিছুই ভালো দেখেন না কাকা! আর আপনারই বা দোষ কী, মা মনসার কৃপায় খানিক টাকাপয়সা যেই করেছি অমনি কিছু লোকের কু-নজর পড়েছে কিনা! হিংসে, হিংসে…’ —কথাগুলো বলতে বলতে মাঝবয়সী হরেন আড়চোখে একবার তাকালো শ্যামলের দিকে— ‘আরে বাবা, আমার তিন পুরুষের বাস এই গাঁয়ে। নদীর ধারেই কত বিঘা জমিতে চাষবাস আর সেই কবেকার মাছের ভেড়ির ব্যবসা, তা এই স্থানীয় নদীটাই যদি মজে যায় তো আমার ক্ষতি বৈ লাভ তো আর হবে না! তাহলে আমি কেন ওই ড্রেজিংয়ের টাকা মারব বলেন তো? এইতো রণজয়বাবু বসে আছেন এখানে, উনি তো নতুন এই এলাকায়। ওইসব সেটিং-ফেটিংয়ের কেস নেই আমার সঙ্গে। ওনাকেই শুধান যে, ওনার এক কথায় আমি আমার ইটভাঁটার সব ময়লা নদীর কাছেপিঠে অব্দি ফেলা বন্ধ করেছি কিনা? কী স্যার বলেন কিছু…’
শেষ লাইনটা রণজয়ের উদ্দেশ্যে বলা। তা যুক্তি দিয়ে ভাবলে কথাগুলো মিথ্যে বলেনি হরেন হালদার। কিন্তু লোকটা এতোটা সৎও নয় যে ওর সব কথা চোখ বুজে বিশ্বাস করা যায়! মিটিংয়ে আসা গ্রামের বাসিন্দাদের তাই জিজ্ঞেস করলো রণজয়। কিন্তু সেখানেও আরেক গেরো! গ্রামের সবার বাড়ি নদীর কাছে নয়, আর তা ছাড়া লোকজনের অন্নচিন্তা চমৎকার, তাই এইসব ব্যাপারে তাদের নাক গলানোর সময় ও আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই খুব কম। সুতরাং কবে নদী সংস্কারের কাজ হয়েছিল কিংবা আদৌ হয়েছিল কিনা স্পষ্টভাবে মনে করতে পারলো না কেউই! আবার এমনটাও হতে পারে যে, হরেন হালদারকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে অপছন্দ করায় মনে থাকলেও, তা এখন আর স্বীকার করতে চাইল না কেউ কেউ। তবে বেশিরভাগই কোনো তরফকেই চটাতে চায় না বলে মুখ খুললো না।
যার দিকে এই ব্যাপারে কিছুটা হলেও সন্দেহের কালি ছিটেছে সেই বিডিও সাহেবই মুখ খুললেন এতক্ষণে— ‘আচ্ছা বুঝলাম না হয় যে, গত কয়েক বছরের মধ্যে এই বেহুলা নদী সংস্কারের কাজ হয়েছে কিনা, সে কথা কারোর মনে নেই। কিন্তু গত দুই মাস ধরে কিছুটা আপনাদের থেকেই চাঁদা তুলে, আর কিছুটা পঞ্চায়েতের ফান্ড থেকে ম্যানেজ করে যে ড্রেজিংয়ের কাজটা করা হয়েছে সেটা তো নিশ্চয় দেখেছেন সবাই? তাহলে এক হপ্তা আগেই প্রায় রাতারাতি অতটা মাটি ভরাট হয়ে নদীটার একটা অংশের অবস্থা আবার এতটা প্যাথেটিক হলো কীভাবে— এটা ভেবে দেখেছেন কেউ? যে কারণেই এটা ঘটে থাকুক না কেন, এর আগে ড্রেজিং হলেও যে সেই একই কারণে নদীটার অবস্থা ‘পুনঃ মূষিক ভবঃ’ হয়নি তার কি গ্যারান্টি আছে কিছু? এর জন্য তো আর নদীর পাড়ে পাহারা বসানো সম্ভব নয়।’
কোনো পক্ষই কিছু বলছে না আর! আজ এই সভায় প্রধান হিসেবে উপস্থিত রয়েছে বনানীও, মানে থাকতে বাধ্য হয়েছে আর কী। নইলে সংসারের হাজারটা কাজ ফেলে এইসব মিটিং-মিছিলে মোটেই উৎসাহ নেই তার। শ্যামলকে চুপ থাকতে দেখে সেই বলে উঠলো এবার— ‘হতেও তো পারে যে, কেউ হয়তো নিজেদের পুরানো দোষ ঢাকতে মাথা খাটিয়ে এসব করেছে।’
ইঙ্গিতটা যে তার দিকেই তা বুঝতে পেরে এবার চেঁচিয়ে ওঠে হরেন— ‘তা যা কয়েছো বৌমা, কেউ আবার অন্যের ঘাড়ে অকারণ দোষ চাপাতেও এসব করে থাকতেই পারে, কিছুই বলা যায় না।’
নরমে-গরমে নানান চাপান-উতোর চলতেই থাকে, কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না! কোনো প্রাকৃতিক কারণে এমনটা ঘটে থাকতে পারে কিনা ভাবার চেষ্টা করে রণজয় কিন্তু কিছুই মাথায় আসে না সেই মুহূর্তে!
সাঁঝের আঁধার নেমে আসছে কচুরিপানা ভরা বেহুলা নদীর বুকে। নদীর পাড়ে কতগুলো ছোট বড় নানা আকারের মনসার প্রতিমা রাখা। পূজা শেষে এই দেবীমূর্তি বিসর্জনের নিয়ম নেই অনেকের মধ্যে, তাই নদীর ধারেই স্থান হয়েছে সেগুলোর। কিছুটা দূরেই শ্মশান। চাঁদু ডোম এক ছিলিম গাঁজা নিয়ে বসে সেখানে। আজ কোনও মরদেহ দাহ-কাজের জন্য আসেনি এখানে। বোধহয় আজ গেরামে কোনো কিছু আছে। যদিও মানুষের মড়া পোড়ানো সবের ওপরে, কোনো কিছুর জন্যই অপেক্ষা করে না মরণ! ও পাড়ের ইস্কুলের মাঠটা থেকে মাইকের আওয়াজ আসছিল চাঁদুর কানে; ক’দিন আগে গাঁয়ের মাতব্বরেরা ওকে ডেকে মানা করেছিল শ্মশানের জঞ্জাল নদীর জলে ফেলতে। হুঁঃ, মানুষ চিতার আগুনে পুড়লেই কিনা জঞ্জাল হয়ে যায়! মাস কয়েক আগে ওই নতুন আপিসবাবুটাও তো এয়েছিল চাঁদুকে ওই এক কথা আবার বোঝাতে। তা বাধ্য ছেলের মতো ঢক করে খুব ঘাড় নেড়েছিল চাঁদু। তার নিজের ছেল্যাটা থাকলে আজ ওই বয়সীই হতো হয়তো। পঞ্চায়েত আপিসের পাশে ওই ইস্কুলেই তো পড়তো ছেল্যাটা। বারো কেলাসের পরীক্ষায় পাশ করে চাকরির চেষ্টায় লাগলো। মড়া পোড়ানোতে নাক সিঁটকাতো, বলতো গন্ধ লাগছে। ওর কথায় হাসতো চাঁদু। গব্বের হাসি, ছেল্যা তার লেখাপড়া শিখ্যা ভদ্দরলোক হয়সে। তারপর একটা ওষুধের দোকানে কাজও জুটিয়ে ফেললো। কিন্তু নিজের দরকারে আর ওষুধ জুটলো না গো! বিয়া ঠিক করেছিল চাঁদু ওর। বাপ-ছেলের সংসারে লক্ষ্মী আসার আগেই একদিন এই বেউলার ধারে চাঁদুর ছেলের সাপেকাটা ঠান্ডা দেহটা উদ্ধার হোল! সেই কোন কালের অভিশাপ বারবার ফলে কেমনে জানে না চাঁদু! সে মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, শুধু বুঝেছে যতদিন এই নদী থাকবে ততদিন সেই শাপের ছায়া কেড়ে নেবে প্রাণ! তাই চাঁদু বাঁচতে দেবে না এই নদীকে সে যে যতোই চেষ্টা করুক না কেন! বয়স বাড়লেও গতরে খাটতে পারে সে; লুকিয়ে এক পৃথিবী ময়লা-মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলবে সে এই নদীর নিষ্ঠুর বুক! আগেও করেছে, পরেও করবে, যতদিন না ওই নতুন জমিতে নতুন প্রাণের জন্ম হয়।
Advertisement



