সাধারণতন্ত্র দিবস মানে কেবল কুচকাওয়াজ, শৌর্যপ্রদর্শন বা সাফল্যের তালিকা নয়। এই দিনটি আমাদের সংবিধানের আত্মাকে নতুন করে মনে করার, তার আলোকে রাষ্ট্রের চলমান পথচলাকে যাচাই করার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ভাষণ সেই ঐতিহ্য মেনেই দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা ও উন্নয়নের দিকগুলি তুলে ধরেছে। আত্মনির্ভরতার কথা, বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বার্তা— এই সবই আজকের ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু।
রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে সাম্প্রতিক কালের নানা জাতীয় সাফল্যের উল্লেখ করেছেন। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতার অগ্রগতি, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ভারতের সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সংস্কার, নারীশক্তির বিকাশ— এই বিষয়গুলি নিঃসন্দেহে দেশের অগ্রগতির ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে। ‘বন্দে মাতরম’-এর দেড়শো বছর পূর্তি কিংবা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের অবদানের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐতিহ্য ও ঐক্যের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। কৃষক, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে সাফাইকর্মীদের ভূমিকার স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয় বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
Advertisement
তবে সাধারণতন্ত্র দিবসের তাৎপর্য এখানেই শেষ নয়। এই দিনটি আত্মপ্রশংসার পাশাপাশি আত্মসমীক্ষারও দাবি জানায়। সংবিধান কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, তা এক জীবন্ত অঙ্গীকার— যেখানে নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রাষ্ট্রপতির ভাষণে ‘সংবিধানিক জাতীয়তাবাদ’-এর উল্লেখ সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— এই আদর্শগুলি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে?
Advertisement
অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার বা সামরিক শক্তি কোনও দেশের উন্নতির একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। সংবিধানের মূল চেতনা নিহিত রয়েছে সামাজিক ন্যায়, সমতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের মধ্যে। আজও দেশের বড় অংশের নাগরিক মৌলিক পরিষেবা, ন্যায্য জীবিকা ও নিরাপত্তা নিয়ে লড়াই করছেন। রাষ্ট্র যখন সাফল্যের খতিয়ান পেশ করে, তখন সেই বাস্তব সমস্যাগুলিও উপেক্ষিত হওয়া উচিত নয়।
বিশেষত, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ধর্মীয় মেরুকরণ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া— এই বিষয়গুলি সংবিধানের আদর্শকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাতন্ত্র্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা— এই সব ক্ষেত্রেই বিতর্ক ও আশঙ্কা বাড়ছে। দুর্নীতির অভিযোগও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থাকে ক্ষয় করছে।
সভ্যতার গৌরবগাথা বা অতীতের কৃতিত্বের পুনরুক্তি যদি বর্তমানের বাস্তব সংকটকে আড়াল করার অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে তা সংবিধানসম্মত রাষ্ট্রচিন্তার পরিপন্থী। সাধারণতন্ত্র দিবসের আসল শিক্ষা হল, রাষ্ট্রকে নাগরিকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। ক্ষমতার ভাষা যতই দৃপ্ত হোক না কেন, তা যদি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে সেই সাফল্য ফাঁপা হয়ে পড়ে।
ভারতের সাধারণতন্ত্র আজ অষ্টম দশকে পা দিয়েছে। এই দীর্ঘ পথচলায় সাফল্য যেমন আছে, তেমনই অসম্পূর্ণতাও আছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ আমাদের গর্ব করার উপাদান দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার— সংবিধানের আদর্শ রক্ষা করা একটি চলমান সংগ্রাম। গণতন্ত্র কোনও স্থির অর্জন নয়, তা প্রতিদিনের চর্চা ও দায়িত্ববোধের ফল।
এই সাধারণতন্ত্র দিবসে তাই প্রয়োজন দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি— অর্জনের স্বীকৃতি এবং ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। কেবল উৎসব নয়, আত্মসমালোচনাই পারে সাধারণতন্ত্রকে সত্যিকারের শক্তিশালী করে তুলতে। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হল— তার আদর্শকে জীবন্ত রাখা, কথায় নয়, কাজে।
Advertisement



