প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে সোমবার গুজরাতের ভুজ জেলার ঢোরডো অঞ্চলে প্রদর্শিত হল বিশ্বের বৃহত্তম খাদি নির্মিত জাতীয় তেরঙ্গা পতাকা। মহাত্মা গান্ধীর খাদি ভাবনার উত্তরাধিকার বহন করা এই বিশাল তেরঙ্গা গর্ব, সম্মান ও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় উন্মোচিত করা হয়। আর মুহূর্তের মধ্যেই কচ্ছের সাদা লবণযুক্ত মরুভূমি এক ঐতিহাসিক জাতীয় মঞ্চের রূপ ধারণ করে ।
খুদে লবণ কণায় মোড়া বিস্তীর্ণ সাদা প্রান্তরের পটভূমিতে খাদির তেরঙ্গা যেন হয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্য, আত্মনির্ভরতার শক্তি এবং ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ খাদি শিল্পী তাঁদের নিজ নিজ ঘর থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম তেরঙ্গাকে স্যালুট জানিয়ে এক নতুন রেকর্ড গড়েন। এই আবেগঘন মুহূর্তে ভারতীয় সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জওয়ানরা পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় খাদির তেরঙ্গা স্থাপন করে রাষ্ট্রীয় স্যালুট জানান।
Advertisement
অনুষ্ঠানের আর এক আবেগময় অধ্যায়ে মঞ্চ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর শহিদ সার্জেন্ট মুরলিধরের স্ত্রী শ্রীমতী রাজকুমারীকে সম্মান জানান খাদি ও গ্রামশিল্প কমিশনের চেয়ারম্যান মনোজ কুমার। তাঁর ত্যাগ, সাহস ও দেশের প্রতি অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গোটা অনুষ্ঠানস্থলে এক গভীর আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
Advertisement
এই বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খাদি ও গ্রামশিল্প কমিশনের চেয়ারম্যান মনোজ কুমার, ভারতীয় সেনা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ আধিকারিকেরা, গুজরাত সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খাদি শিল্পীরা। প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে গুজরাতের শিল্পীদের মধ্যে গ্রামোদ্যোগ বিকাশ যোজনা প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ বিতরণ করা হয়, যাতে গ্রামীণ অর্থনীতি ও আত্মনির্ভরতার ভিত আরও মজবুত হয়।
এ বছর প্রজাতন্ত্র দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর হয়, কারণ এই দিনেই স্মরণ করা হয় দুই হাজার এক সালের ভুজ ভূমিকম্পের পঁচিশ বছর পূর্তিকে। সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের স্মৃতির মধ্যেই কচ্ছের অদম্য মানসিকতা, পুনর্গঠনের ক্ষমতা এবং উন্নয়নের দীর্ঘ যাত্রাপথকে তুলে ধরা হয় এই অনুষ্ঠানে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের স্মরণ করে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়, পাশাপাশি কচ্ছের পুনর্জাগরণের কাহিনি হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানের অন্যতম বার্তা।
নিজের ভাষণে মনোজ কুমার বলেন, ‘প্রজাতন্ত্র দিবসে কচ্ছের রান প্রান্তরে বিশ্বের বৃহত্তম খাদি তেরঙ্গার প্রদর্শন গোটা জাতির জন্য গর্বের বিষয়। এই কর্মসূচি উৎসর্গ করা হয়েছে আমাদের সাহসী সেনাদের প্রতি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বেই খাদি আন্দোলন নতুন পরিচিতি পেয়েছে দেশ ও আন্তর্জাতিক স্তরে।’ তিনি দেশবাসীর কাছে আবেদন জানান, খাদি বিপণি থেকে খাদি পতাকা কিনে নিজেদের ঘরে উত্তোলনের জন্য, যাতে খাদি শিল্পের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আবেগের যোগ আরও দৃঢ় হয়।
ভুজ ভূমিকম্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দুই হাজার এক সালের সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর ভুজ যে ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা সাহস, সংকল্প ও পুনর্গঠনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আজকের নিরাপদ, পরিকল্পিত ভুজ কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং তখনকার মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বের ফল।’
তিনি আরও জানান, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ার কারণে আজ ভুজ জাতীয় নিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠেছে এবং এই শহর নতুন ভারতের নিরাপত্তা, শক্তি ও সংকল্পের প্রতীক।
ভুজে গড়ে ওঠা স্মৃতি বনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এটি শুধু একটি স্মারক নয়, এটি সেই সকল মানুষের স্মৃতির জীবন্ত প্রতীক, যাঁরা ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছিলেন। দুঃখকে শক্তিতে, স্মৃতিকে সংকল্পে আর বিপর্যয়কে অনুপ্রেরণায় রূপান্তরের এক অনন্য দৃষ্টান্ত এই স্মৃতি বন।’
খাদির অগ্রগতির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, গত এক দশকে খাদি ও গ্রামশিল্প ক্ষেত্রে উৎপাদন, বিপণন, নকশা ও প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। কোটি কোটি শিল্পী আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, এবং শিল্পীদের আয়ের মান উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদি আজ শুধু ঐতিহ্যের প্রতীক নয়, আত্মনির্ভর ভারতের শক্ত ভিতও বটে।
এই বিশাল তেরঙ্গা পতাকাটি তৈরি করা হয়েছে খাদি সুতো ও খাদি বস্ত্রে। পতাকাটির দৈর্ঘ্য দুই শত পঁচিশ ফুট, প্রস্থ একশো পঞ্চাশ ফুট এবং ওজন প্রায় এক হাজার চারশো কিলোগ্রাম। প্রায় তিন হাজার পাঁচশো অতিরিক্ত শ্রমঘণ্টা ব্যয় করে খাদি শিল্পীরা এই পতাকা প্রস্তুত করেছেন। প্রায় চার হাজার পাঁচশো মিটার দীর্ঘ খাদি কাপড় ব্যবহার করে তৈরি এই তেরঙ্গার ক্ষেত্রফল তেত্রিশ হাজার সাতশো পঞ্চাশ বর্গফুট। পতাকার অশোক চক্রের ব্যাস ত্রিশ ফুট এবং এটি তৈরি করতে সত্তর জন খাদি শিল্পীর সময় লেগেছে উনপঞ্চাশ দিন।
কচ্ছের মতো অনন্য প্রাকৃতিক প্রান্তরে এই বিশাল খাদি তেরঙ্গার প্রদর্শন শুধু এক অনুষ্ঠান নয়, এটি হয়ে উঠেছে জাতির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাসের এক শক্তিশালী প্রতীক।
Advertisement



