রতন ভট্টাচার্য: ভারত একসময় ছিল রাজ রাজরার দেশ। কত যে রাজা ছিল বিভিন্ন প্রদেশে তার ইয়ত্তা ছিল না। হিমালয়ের লিচ্ছবী গোষ্ঠী যতদূর জানা যায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মেনে চলত। ওদের জনপদে গ্রীসের মত প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র ছিল।মুঘলরা প্রবর্তন করেছিল বাদশাহী শাসন ওই রাজতন্ত্রের ধাঁচে। বৃটিশরা এনেছিল আধুনিক গণতন্ত্র। রাজতন্ত্রে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে একজন শাসকের হাতে। একনায়কতন্ত্রে তা কেন্দ্রীভূত হয় কয়েকজনের হাতে। কিন্তু ব্রিটিশ গণতন্ত্রের পরোক্ষ গণতন্ত্রের মত ভারতেও সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে জনগণের হাতে।
এটাই প্রজাতন্ত্রের মৌলিক প্রতিশ্রুতি: আমরা সবাই এই রাজ্যের রাজা। এটি কেবল আলঙ্কারিক অর্থে নয়, বাস্তব সত্য। এখানে প্রতিটি নাগরিক, জাতি, ধর্ম বা সম্পদের পার্থক্য নির্বিশেষে, সার্বভৌম ক্ষমতার মুকুট ধারণ করে। ব্যালট আমাদের রাজকীয় আদেশ, সংবিধান আমাদের সিংহাসন, আর সমতা আমাদের মুকুট। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অনন্যতা হলো প্রজাদের রাজায় রূপান্তর করা। বিহারের কৃষক, কেরালার শিক্ষক, আসামের কারিগর, বেঙ্গালুরুর উদ্যোক্তা—সবাই সমান ক্ষমতা প্রয়োগ করেন ভোটকেন্দ্রে। এ এক রাজত্ব যেখানে নেই শ্রেণি-বিভাজন, নেই বিশেষাধিকার।কিন্তু রাজত্ব মানে শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও বটে।
Advertisement
প্রজাতন্ত্র দাবি করে সতর্কতা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি। এখানে আনুগত্য কোনো রাজাকে নয়, গণতন্ত্রের ধারণাকেই। যদি নাগরিকরা রাজা হন, তবে সংবিধান সেই সিংহাসন যেখানে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত। এটি একটি জীবন্ত দলিল, বহু ঐতিহ্য থেকে ধার করা হলেও সম্পূর্ণ ভারতীয়। এটি বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়, অধিকার রক্ষা করে, জবাবদিহি নিশ্চিত করে। কোনো একক শাসক এই সিংহাসনে বসতে পারে না, কারণ এটি সবার।বিচারব্যবস্থা মুকুটের রক্ষক, নিশ্চিত করে যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
Advertisement
আইনসভা হলো রাজাদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর, যেখানে ভারতের বহুত্ববাদ প্রতিফলিত হয়। নির্বাহী বিভাগ জনগণের সেবক, উল্টো নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই এই রাজ্যের অংশীদার, তাদের বৈধতা আসে গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট থেকে। প্রজাতন্ত্র টিকে থাকে শুধু প্রতিষ্ঠান দিয়ে নয়, সম্প্রদায়, আন্দোলন ও গণমাধ্যম দিয়েও। নাগরিক সমাজ প্রহরী ও উদ্ভাবক হিসেবে কাজ করে, মনে করিয়ে দেয় যে রাজত্বে প্রান্তিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিবেশ আন্দোলন থেকে স্বচ্ছতার সংগ্রাম—সবই প্রমাণ করে যে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনে সীমাবদ্ধ নয়, প্রতিদিনের সংগ্রামে বেঁচে থাকে। বৈচিত্র্য: আমাদের মুকুট ।ভারতের বহুত্ববাদই তার শ্রেষ্ঠ রত্ন। হাজারো ভাষা, ঐতিহ্য ও ধর্ম এক সংবিধানের অধীনে সহাবস্থান করে। যেখানে রাজ্যগুলো ভিন্নতার কারণে ভেঙে পড়ে, ভারত সেখানে সমৃদ্ধ হয় কারণ এটি বৈচিত্র্যকে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করে। এখানে রাজত্ব একরূপ নয়, মর্যাদায় সমান। অবশ্যই, মুকুট সর্বদা উজ্জ্বল নয়।
বৈষম্য, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও কর্তৃত্ববাদ নাগরিকদের সার্বভৌমত্বকে হুমকি দেয়। যখন প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়, যখন ভিন্নমত দমন করা হয়, তখন প্রজাতন্ত্রের অনন্যতা পরীক্ষিত হয়। তবুও ভারতের স্থিতিস্থাপকতাই তার পরিচয়। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে গণতন্ত্র টিকে আছে, প্রমাণ করেছে যে সম্মিলিত রাজত্ব ঝড় সামলাতে পারে।
ভারতীয় প্রজাতন্ত্র স্থির নয়; এটি ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। প্রতিটি নির্বাচন, প্রতিটি আন্দোলন, প্রতিটি সংস্কার মনে করিয়ে দেয় যে এখানে সার্বভৌমত্ব অংশগ্রহণমূলক। এর অনন্যতা হলো এই গতিশীল রাজত্ব—যেখানে ক্ষমতা উত্তরাধিকারসূত্রে নয়, প্রয়োগের মাধ্যমে অর্জিত হয়।
এই পৃথিবীতে যেখানে রাজতন্ত্র এখনো বিদ্যমান এবং একনায়কতন্ত্র এখনো বেঁচে আছে, ভারত সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আলোকবর্তিকা হিসেবে। এটি দেখায় যে রাজত্ব কেন্দ্রীভূত হতে হবে না; ভাগাভাগি করা যায়। এটি দেখায় যে সার্বভৌমত্ব উত্তরাধিকার হতে হবে না; প্রয়োগ করা যায়। এটি দেখায় যে গণতন্ত্র কোনো উপহার নয়, বরং দায়িত্ব। ভারতীয় প্রজাতন্ত্র অনন্য কারণ এটি প্রতিটি নাগরিককে রাজা করে তোলে। আর এই রাজ্যে মুকুট সোনার নয়, মর্যাদা, ন্যায় ও স্বাধীনতার।
ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ইতিহাস শুরু হয় ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে, যখন ভারত তার নিজস্ব সংবিধান কার্যকর করে একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভারতের প্রজাতন্ত্র হয়ে ওঠার ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও সংগ্রামী যাত্রার ফল। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, কিন্তু তখনও দেশটি ব্রিটিশ রাজা ষষ্ঠ জর্জের অধীনে একটি ডোমিনিয়ন হিসেবে পরিচালিত হতো। স্বাধীনতার পরপরই দেশভাগ ঘটে, যার ফলে ভারত ও পাকিস্তান দুটি পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
এই দেশভাগের ফলে প্রায় ১ কোটি মানুষ দেশান্তরী হন এবং প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে। স্বাধীনতার পর ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন, পরে চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী এই পদে আসীন হন। জওহরলাল নেহরু হন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল হন প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে একটি সংবিধান রচনার জন্য সংবিধান সভা গঠিত হয়। এই সভা ড. বি. আর. আম্বেদকর-এর নেতৃত্বে ভারতের সংবিধান রচনা করে, যা ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। এই দিনটি থেকেই ভারত একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ।
ভারতের প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থা একটি সংসদীয় গণতন্ত্র, যেখানে রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যকরী প্রধান। সংবিধান অনুযায়ী, ভারত একটি ফেডারেল রাষ্ট্র, যার মধ্যে কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে।ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সাম্য-র প্রতি দেশের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। প্রতিবছর ২৬ জানুয়ারি দিনটি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়, যা ভারতের গণতান্ত্রিক যাত্রার স্মারক।২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের বিশেষত্ব হলো—এটি ভারতের সংবিধান কার্যকর হওয়ার ৭৬তম বার্ষিকী, এবং এই বছরটি পূর্ণ স্বরাজের ঐতিহাসিক শপথের ৯৬ বছর পূর্তি হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
নয়াদিল্লিতে জমকালো কুচকাওয়াজ: ঐতিহ্য অনুযায়ী, দিল্লির কর্তব্য পথে জমকালো কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয় সামরিক কুচকাওয়াজ, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী, এবং বিভিন্ন রাজ্যের ট্যাবলো প্রদর্শন। এই বছরেও আধুনিক প্রযুক্তি, নারী নেতৃত্ব, এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে তুলে ধরা হচ্ছে। প্রতিবছর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি রাষ্ট্রনেতাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এটি ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক। শিক্ষা ও সচেতনতা প্রচারও গুরুত্বপূর্ণ । স্কুল, কলেজ, এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে বিতর্ক, রচনা, এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, যাতে নতুন প্রজন্ম সংবিধানের মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হয় এ বছর প্রজাতন্ত্র দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য, সাংবিধানিক মূল্যবোধ, এবং ঐতিহাসিক সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা শুধু একটি অর্জন নয়, বরং একটি দায়িত্ব। সংবিধান আমাদের ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ শিখিয়েছে। প্রজাতন্ত্র দিবস আমাদের সেই আদর্শকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়।আজকের দিনে আমাদের কর্তব্য হলো দেশের ঐক্য ও বৈচিত্র্যকে সম্মান করা, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। প্রজাতন্ত্র দিবসে আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি— আমরা আমাদের সংবিধানের মূল্যবোধকে রক্ষা করব এবং ভারতের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে আরও উজ্জ্বল করব।এই প্রভাত শুধু একটি দিন নয়, এটি আমাদের আত্মার জাগরণ।
২৬ জানুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— স্বাধীনতার সংগ্রামে রক্তে লেখা প্রতিজ্ঞা, সংবিধানের পাতায় অমর হয়ে থাকা ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের গান। প্রজাতন্ত্র দিবস আমাদের শেখায়— গণতন্ত্র কেবল একটি ব্যবস্থা নয়, এটি আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন। এটি সেই আলো, যা অন্ধকারে পথ দেখায়, এটি সেই শক্তি, যা বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য গড়ে তোলে। আজ আমরা প্রতিজ্ঞা করি— আমরা হবো সংবিধানের রক্ষক, আমরা হবো ন্যায়ের সৈনিক, আমরা হবো সেই প্রজন্ম, যারা ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে। সবাই মিলে বলার দিন— জয় হিন্দ! জয় ভারত!
Advertisement



