বয়স মাত্র ১৫। এখনও ভোট দেওয়ার অধিকার নেই, গাড়ি চালানোর অনুমতি নেই। এমনকি নিজের নামে কোনও আইনি নথিতেও সই করতে পারে না সে। অথচ একটি বিজ্ঞাপনী শুটের জন্য দিনে দেড় থেকে দু’কোটি টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক হাঁকছে বৈভব সূর্যবংশী!
ক্রিকেট মাঠে একের পর এক রেকর্ড ভেঙে যে কিশোর রাতারাতি তারকা হয়ে উঠেছে, তার ব্র্যান্ডমূল্য এখন দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারের কাছাকাছি। প্রশ্ন একটাই—এই বিপুল বাণিজ্যিক দৌড়ের মধ্যে ১৫ বছরের ছেলেটি কতটা সুরক্ষিত?
বৈভবের উত্থানের গতি সত্যিই অবিশ্বাস্য। ২০২৬ আইপিএলে তাঁর পারফরম্যান্সের পরেই বাজারে হু হু করে বদলে যায় তাঁর মূল্য। তার আগে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে ১৭৫ রানের ইনিংস এবং তারও আগে আইপিএলের নজরকাড়া পারফরম্যান্স তাঁকে ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত তরুণ প্রতিভায় পরিণত করেছিল। ২০২৬ আইপিএল-এর এক ভ্যালুয়েশন রিপোর্টে তো তাঁর দর্শক টানার ক্ষমতার তুলনা করা হয়েছে শচীন তেন্ডুলকরের সঙ্গে।
স্পোর্টস মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ ইন্দ্রনীল দাস ব্লাহ জানিয়েছেন, আইপিএলের আগে বৈভবের পারিশ্রমিকের কোনও নির্দিষ্ট মাপকাঠিই ছিল না। এখন পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘আইপিএলের আগে সত্যিই কোনও বেঞ্চমার্ক ছিল না। একেবারে নতুন করে শুরু করে এখন ও দিনে প্রায় দেড় কোটি টাকা পারিশ্রমিক নিচ্ছে।’ তাঁর অনুমান, আগামী দু’বছর বৈভব একই ভাবে পারফর্ম করতে পারলে সেই অঙ্ক বেড়ে দিনে তিন থেকে চার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। তখন তিনি দেশের সবচেয়ে বড় তারকাদের সঙ্গেই এক সারিতে চলে আসবেন।
কিন্তু ক্রীড়া আইন বিশেষজ্ঞ আহনা মেহরোত্রার ব্যাখ্যা, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বৈভব নিজের বিজ্ঞাপনী চুক্তিতে সই করতে পারেন না। বৈভবের বয়স এবং অভিজ্ঞতার অভাবই এখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। মেহরোত্রার মতে, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গা হল সচেতনতার অভাব এবং সেই ধরনের আইনি পরামর্শ নেওয়ার ক্ষমতা না থাকা, যে পরামর্শ সাধারণত আরও উচ্চ পর্যায়ের খেলোয়াড়েরা পেয়ে থাকেন।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপনের চাপ যেন ক্রিকেটকে গ্রাস না করে। তাঁর কথায়, ‘এক জন খেলোয়াড়ের বাণিজ্যিক এবং পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য থাকা দরকার। বিজ্ঞাপনের কাজ যদি অনুশীলন বা পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তা হলে শেষ পর্যন্ত সেটাই খেলোয়াড়ের ক্ষতি করবে।’ এখন বৈভবকে সুরক্ষিত রাখার বড় দায়িত্ব তাঁর পরিবার এবং আশপাশের মানুষের উপরেই।
তবে বৈভবের বাণিজ্যিক গুরুত্ব যত বাড়বে, ততই হয়তো পেশাদার ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজন হবে। দাস ব্লাহের কথায়, ‘স্বল্প থেকে মাঝারি মেয়াদে কোনও এক সময় ও নিজের এজেন্সি তৈরি করতে পারে অথবা পেশাদার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে সেটা হতে এখনও অনেক দেরি আছে’।
এই মুহূর্তে তাই বৈভবের গল্পটা শুধু ক্রিকেটের নয়। এক দিকে ১৫ বছরের বিস্ময়বালক, অন্য দিকে কোটি কোটি টাকার বাজার। ক্রিকেট মাঠে বৈভব যত দ্রুত বড় হয়ে উঠেছে, তাঁর চারপাশের বাণিজ্যিক এবং আইনি কাঠামো ততটা দ্রুত তৈরি হয়েছে কি না—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ শেষ পর্যন্ত ব্র্যান্ডের দৌড় যতই দ্রুত হোক, বৈভব এখনও সেই ১৫ বছরের ছেলেটিই।




