আর্জেন্টিনার অধিনায়ক এবং ফুটবলের জাদুকর, যিনি দেশকে ফুটবল ইতিহাসের এমন এক শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন যেখানে আগে কখনও পৌঁছনো সম্ভব হয়নি, সেই লিওনেল মেসি বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে সতীর্থদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন।
ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা সেই আবেগঘন বার্তায় মেসি এমন কিছু কথা লিখেছেন, যা অনেকের কাছেই বেশ ইঙ্গিতবহ। জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে, আকাশি-সাদা আর্জেন্টিনা জার্সিতে তাঁর দীর্ঘ যাত্রা হয়তো শেষের পথে।
গতবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১-এ হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। নাটকীয় সেই জয়ে মেসির অবদান ছিল অসামান্য। দলের দুই গোলেই অ্যাসিস্ট করে জয়ের অন্যতম প্রধান কারিগর হয়ে ওঠেন তিনি।
ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিরুদ্ধে বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ইনস্টাগ্রামে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ফুটবলার ও কোচিং স্টাফদের নিয়ে একটি দলগত ছবি পোস্ট করেন লিওনেল মেসি। শুধু সাফল্য নয়, দীর্ঘ এই যাত্রার স্মৃতিই যেন তাঁর বার্তার মূল সুর। আবেগে ঠাসা এই বার্তায় মেসি লেখেন—
“এত বছরের সবচেয়ে সুন্দর শুধু বিশ্বকাপ জেতা ছিল না, সুন্দর ছিল পুরো পথ চলাটাই। এই দলের সঙ্গে প্রতিদিনের মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়া, একসঙ্গে লড়াই করা, কঠিন সময়ে আবার উঠে দাঁড়ানো এবং প্রতিটি পদক্ষেপ উপভোগ করা— এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার প্রত্যেক সতীর্থ, কোচিং স্টাফ এবং যাঁরা প্রতিদিন পরিশ্রম করে এই জাতীয় দলকে একটি পরিবারের মতো গড়ে তুলেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ। আগামীকাল যা-ই ঘটুক না কেন, এই দল এমন এক ইতিহাস লিখে ফেলেছে, যা আমরা কোনও দিন ভুলব না এবং যা কেউ কখনও মুছে ফেলতে পারবে না। ভামোস (এগিয়ে চলো), আর্জেন্টিনা!”
আর্জেন্টিনা অধিনায়কের এই বার্তায় দলের মধ্যে গড়ে ওঠা একতা ও পারিবারিক বন্ধনের ছবিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মেসির ভাষায়, এই দল একটি ‘পরিবার’। একই সঙ্গে তিনি সতীর্থদের উপর থেকে চাপও কমানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর বার্তা, স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনালের ফল যাই হোক না কেন, এই দলের কীর্তি ইতিমধ্যেই অমর হয়ে গিয়েছে।
বিশ্ব ফুটবল মহলের বড় অংশের ধারণা, এটাই হতে চলেছে মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। এমনকি এটিই হয়তো তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারেরও শেষ ম্যাচ হতে পারে। তবে ফাইনালের আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। বরং তিনি বর্তমানেই মনোযোগ দিয়েছেন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে পেরে তিনি যে ভীষণ গর্বিত, সেটাই তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, সেই জয় ছিল একটি বিশেষ মুহূর্ত।
২০২৪ স্পেনের ইউরো জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন যিনি, সেই লামিন ইয়ামালকে নিয়েও প্রশ্নের উত্তর দেন মেসি। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের পাশাপাশি বিশ্বকাপ জেতা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার হাতছানি ইয়ামালের সামনে।
৩৯ বছর বয়সি মেসি স্প্যানিশ তারকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “এই মুহূর্তে ও বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন।” বার্সেলোনার তরুণ ফুটবলারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মেসি আরও বলেন, “ওর সাফল্য মানে বার্সেলোনারও সাফল্য। আমি চাই ও আরও এগিয়ে যাক।”
তবে ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইয়ামালকে থামানোর পরিকল্পনার কথাও স্পষ্ট করে দেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। বলেন, “আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব, যাতে ও নিজের সেরাটা খেলতে না পারে। তবে স্পেন শুধু ইয়ামালকে নিয়েই নয়, ওদের পুরো দলটাই অসাধারণ।”
এরপর মেসি বলেন, “ইয়ামাল অসাধারণ মানের ফুটবলার, বিশ্ব ফুটবলের নতুন তারকা। ওর বয়স মাত্র ১৯ বছর। গোটা কেরিয়ার এখনও ওর সামনে পড়ে রয়েছে। আমি ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি। কিন্তু এবার যাতে ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে না পারে, তার জন্য আমরা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেব।”
সাংবাদিক বৈঠক শেষে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে জড়িয়ে ধরেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, স্পেনে উয়েফা প্রো কোচিং লাইসেন্স করার সময় স্কালোনির প্রশিক্ষকদের অন্যতম ছিলেন দে লা ফুয়েন্তে।
এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ফুটবলার রিও ফার্দিনান্দ এবং হলিউড অভিনেতা কেভিন হার্ট। এছাড়াও টেনিস কিংবদন্তি নোভাক জোকোভিচ ও এনবিএ তারকা কেভিন ডুরান্ট, টম ব্র্যাডি- সবাই মিলে ফুটবলারদের নানা প্রশ্ন করেন।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মুখে দলগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পুরস্কারের লড়াইয়েও রয়েছেন মেসি। যদিও গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সম্প্রতি কিলিয়ান এমবাপে তাঁকে ছাপিয়ে গিয়েছেন, তবু মেসির সমস্ত মনোযোগ এখন নিজের খেলা উপভোগ করা এবং আর্জেন্টিনাকে আরও একবার ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ এনে দেওয়ার দিকে।




