• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 19 July, 2026

একটি ফটোশুট, একটি শিশু ও এক তরুণ ফুটবলার: এক আশ্চর্য সময়বৃত্ত

ছোটবেলায় ফুটবল খেলার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ জোগানো সহজ ছিল না, কিন্তু তাঁর বাবা-মা সেটাই করেছেন। ইয়ামাল নিজেই বলেছেন, অর্থের অভাব থাকলে সন্তানের খেলাধূলার স্বপ্ন পূরণ করা কতটা কঠিন। কিন্তু তাঁর বাবা-মা সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন। তার '৩০৪' সেলিব্রেশন, যা তাঁর এলাকার পোস্টকোড, এই শেকড়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসারই প্রকাশ। এটি যেন মনে করিয়ে দেয়, যত দূরেই যাওয়া হোক, নিজের শুরুটাকে ভুলে গেলে চলবে না।

একটি ফটোশুট, একটি শিশু ও এক তরুণ ফুটবলার: এক আশ্চর্য সময়বৃত্ত

Photo: SNS

ফুটবল কখনও কখনও এমন এক গল্প রচনা করে, যা কল্পনারও বাইরে। মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের বাইরেও এই খেলায়
জড়িয়ে থাকে সময়, মানুষ আর নিয়তির অদ্ভুত সংযোগ। লিওনেল মেসি এবং লামিন ইয়ামালের গল্প ঠিক তেমনই— একটি ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এক বিস্ময়কর সময়চক্র, যার শুরু হয়েছিল প্রায় দু’দশক আগে, অথচ যার পূর্ণতা যেন আজকের দিনে এসে দাঁড়িয়েছে।

২০০৭ সালে বার্সেলোনার ‘এফসি বার্সেলোনা’র ড্রেসিংরুমে এক সাধারণ ফটোশুটে যে দৃশ্য ধরা পড়েছিল, তখন কেউ ভাবেনি সেটি একদিন ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠবে। সেদিন ২০ বছর বয়সী মেসি, তখনও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে ওঠেননি, একটি পাঁচ মাসের শিশুকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। ছবিতে দেখা যায়, মেসি শিশুটিকে সাবধানে ধরে আছেন, কখনো তাকে স্নান করাচ্ছেন, কখনো হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন। শিশুটি ছিল লামিন ইয়ামাল। এই মুহূর্তটি ছিল নিছকই একটি প্রচারমূলক কার্যসূচির অংশ, কিন্তু সময় সেটিকে রূপ দিয়েছে এক গভীর অর্থবহ স্মৃতিতে। তখনকার সেই লাজুক তরুণ ফুটবলার হয়তো বুঝতেই পারেননি, তার কোলে থাকা শিশুটি একদিন তার পথেই হাঁটবে, একই ক্লাবের জার্সি গায়ে চাপাবে এবং একদিন হয়তো তারই বিপরীতে দাঁড়িয়ে খেলবে।

বহু বছর পরে, যখন ইয়ামাল আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন, তখন এই ছবিগুলো আবার সামনে আসে। তাঁর পরিবার যখন সেই পুরনো ছবির কথা স্মরণ করায়, তখন ফুটবল বিশ্ব যেন হঠাৎ চমকে ওঠে। কারণ এটি কেবল একটি পুরনো ছবি নয়, বরং সময়ের এক বিস্ময়কর প্রতিফলন— যেখানে অতীত ও ভবিষ্যৎ এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। যেন এক রহস্যময় সময় নিজেই আগেভাগে এই গল্পের বীজ বপন করে রেখেছিল।

মেসি এবং ইয়ামালের মধ্যে পার্থক্য শুধু বয়সে নয়, বরং অভিজ্ঞতা এবং সময়ের ধারাতেও। মেসি যখন ১৯ বছর বয়সে, তখন তিনি ছিলেন প্রতিভাবান, কিন্তু এখনও নিজেকে প্রমাণ করার পথে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল ধীর, পরিশ্রমসাপেক্ষ এবং অনিশ্চয়তায় ভরা। কিন্তু ইয়ামাল ১৯ বছর বয়সেই একেবারে অন্য এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। আধুনিক ফুটবলের কাঠামো, প্রশিক্ষণ, সুযোগ— সবকিছুই বদলেছে, কিন্তু তার সাফল্যকে শুধু এই পরিবর্তনের ফল বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর মধ্যে রয়েছে এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করার মানসিকতা, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ইয়ামালের জীবনের গল্পও এই কাহিনিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। তিনি বড় হয়েছেন স্পেনের মাতারোর রোকাফোন্দা এলাকায়, যেখানে আর্থিক সচ্ছলতা সবসময় ছিল না। তার বাবা মরক্কো থেকে, মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে এসেছিলেন— একটি অভিবাসী পরিবার, যারা নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ছোটবেলায় ফুটবল খেলার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ জোগানো সহজ ছিল না, কিন্তু তাঁর বাবা-মা সেটাই করেছেন। ইয়ামাল নিজেই বলেছেন, অর্থের অভাব থাকলে সন্তানের খেলাধূলার স্বপ্ন পূরণ করা কতটা কঠিন। কিন্তু তাঁর বাবা-মা সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন। তার ‘৩০৪’ সেলিব্রেশন, যা তাঁর এলাকার পোস্টকোড, এই শেকড়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসারই প্রকাশ। এটি যেন মনে করিয়ে দেয়, যত দূরেই যাওয়া হোক, নিজের শুরুটাকে ভুলে গেলে চলবে না।

অন্যদিকে মেসির গল্প এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। আর্জেন্টিনা থেকে স্পেনে এসে বার্সেলোনার অ্যাকাডেমিতে যোগ দেওয়া, শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই, নিজের জায়গা তৈরি করা— সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। কিন্তু তাঁর মধ্যে ছিল এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু একজন সফল খেলোয়াড় নন, বরং এক কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। তাঁর ড্রিবলিং, তাঁর গোল, তাঁর খেলার দৃষ্টি— সবকিছুই ফুটবলকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবুও তাঁর যাত্রা কখনোই নিখুঁত ছিল না। ব্যর্থতা, সমালোচনা, হতাশা— সবকিছুর মধ্য দিয়েই তিনি নিজের পথ তৈরি করেছেন। ৩৯ বছর বয়সেও তাঁর মাঠে থাকা সেই দৃঢ়তারই প্রমাণ।

এই দুই গল্প যখন একসঙ্গে মিশে যায়, তখন তৈরি হয় এক অনন্য দৃশ্য। একদিকে এমন একজন, যিনি প্রায় সবকিছু অর্জন করেছেন; অন্যদিকে এমন একজন, যাঁর সামনে অসীম সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে। তাঁদের সম্ভাব্য মুখোমুখি হওয়া কেবল একটি ম্যাচ নয়, বরং একটি প্রতীকী মুহূর্ত— যেখানে এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মের সঙ্গে ব্যাটন বদল করছে। এটি সেই মুহূর্ত, যখন ইতিহাস বর্তমানের সঙ্গে কথা বলে এবং ভবিষ্যৎ তার নিজের জায়গা খুঁজে নেয়।

এই গল্পের আবেগও কম নয়। মেসির জন্য এটি হতে পারে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ দিকের একটি বড় অধ্যায়, যেখানে তিনি আবার নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে ইয়ামালের জন্য এটি এক বিশাল মঞ্চ, যেখানে তিনি প্রথমবারের মতো বিশ্বকে দেখাতে পারবেন, তিনি কতটা বড় হওয়ার সম্ভাবনা রাখেন। এই দুই অনুভূতির সংঘর্ষই ম্যাচটিকে অন্য মাত্রা দিচ্ছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে। একটি ফটোশুট, একটি শিশু এবং এক তরুণ ফুটবলার— এই তিনটি উপাদান মিলেই তৈরি হয়েছিল এমন একটি গল্প, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন অর্থ পেয়েছে। যদি এটি কোনো চলচ্চিত্রের গল্প হতো, তাহলে হয়তো অনেকেই বলতেন এটি অতিরঞ্জিত। কিন্তু বাস্তব কখনও কখনও কল্পনার চেয়েও বেশি নাটকীয় হয়ে ওঠে।

আজ যখন তাঁরা একই মাঠে নামার সম্ভাবনায় দাঁড়িয়ে, তখন সেই পুরনো ছবিগুলো আর নিছক স্মৃতি নয়। সেগুলো হয়ে উঠেছে এক প্রতীক— সময়ের, ধারাবাহিকতার এবং সমাপতনেরও। ফুটবল যে কেবল একটি খেলা নয়, বরং মানুষের জীবন, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের গল্প— এই ঘটনাই তার প্রমাণ।

মেসির গল্প হয়তো শেষের দিকে এগোচ্ছে, কিন্তু ইয়ামালের গল্প সবে শুরু। একজন যেখানে নিজের অধ্যায় প্রায় সম্পূর্ণ করেছেন, অন্যজন সেখানে নতুন অধ্যায় লিখতে প্রস্তুত। এই দুই সময়ের মিলনই এই ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর দিক— এটি কখনো থেমে থাকে না, বরং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে।

শেষ পর্যন্ত, এই গল্প আমাদের একটি সহজ কিন্তু গভীর সত্য মনে করিয়ে দেয়—জীবনের প্রতিটি ছোট মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে ভবিষ্যতের বড় কোনো অর্থ। ২০০৭ সালের সেই মুহূর্তটি তখন ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু আজ তা হয়ে উঠেছে এক অসাধারণ কাহিনি। আর এই কাহিনিই প্রমাণ করে, সময় কখনও কখনও এমনভাবে নিজের গল্প লেখে, যা আমরা আগে থেকে কল্পনাও করতে পারি না।