• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 20 August, 2026

এগারো উঠতি ফুটবলারকে এক লাখি সান্মানিক ডুরান্ড আয়োজকদের, কারা তাঁরা, কী তাঁদের লক্ষ্য?

এ বারের ডুরান্ড কাপে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা ১১ জন তরুণ ফুটবলারকে ‘এমার্জিং প্লেয়ার’ হিসেবে বেছে নিয়েছে ডুরান্ড ফুটবল টুর্নামেন্ট সোসাইটি

এগারো উঠতি ফুটবলারকে এক লাখি সান্মানিক ডুরান্ড আয়োজকদের, কারা তাঁরা, কী তাঁদের লক্ষ্য?

Image: IANS

ওরা না আছে আইএসএলে খেলা কোনো ক্লাবে, না ওরা খেলে ইন্ডিয়ান ফুটবল লিগে। কিন্তু ওদের মধ্যে বড় ফুটবলার হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যা ওদের নিয়ে যেতে পারে অনেক দূর। শুধু দরকার একটু পাশে দাঁড়ানো, একটু উৎসাহ ও সাহায্য। এটুকু পেলেই ওরা ওদের ফুটবল জীবনের সফল অভিযান শুরু করতে পারে। তাই ওদের পাশে দাঁড়াতেই এগিয়ে এল ডুরান্ড কাপের আয়োজকেরা, যারা মূলত এ দেশের সেনাবাহিনীরই একটা অংশ।

দেশকে রক্ষা করার পাশাপাশি দেশের ফুটবলকে রক্ষা করার কাজেও এরা ব্রতী। তাই এ দেশের প্রাচীনতম ফুটবলের আসর ডুরান্ড কাপকে (Durand Cup) একটি ছোট টুর্নামেন্ট থেকে দেশের ক্লাব ফুটবলের দ্বিতীয় সেরা টুর্নামেন্ট করে তুলতে পেরেছে। ডুরান্ড কাপ যাতে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে, যাতে ভারতীয় ফুটবলে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে, সে জন্যই এই অসাধারণ ও মর্মস্পর্ষী এই উদ্যোগ নিয়েছে তারা।

 

এ বারের ডুরান্ড কাপে (Durand Cup) বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা ১১ জন তরুণ ফুটবলারকে ‘এমার্জিং প্লেয়ার’ হিসেবে বেছে নিয়েছে ডুরান্ড ফুটবল টুর্নামেন্ট সোসাইটি। ছ’টি গ্রুপের মধ্যে পাঁচটি গ্রুপ থেকে দু’জন করে এবং একটি গ্রুপ থেকে একজন— মোট ১১ জনকে দেওয়া হয়েছে এই স্বীকৃতি। প্রত্যেকের জন্য রয়েছে ১ লক্ষ টাকার সান্মানিকও।

এই ১১ জনের গল্প অবশ্য এক নয়। কেউ আর্মড ফোর্সের ফুটবলের শৃঙ্খলার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। কেউ এসেছেন ছোট শহরের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা থেকে। কেউ আবার কোনও পরিকল্পিত অ্যাকাডেমির হাত ধরে উঠে এসেছেন। কারও ফুটবলজীবনের শুরু হয়েছিল ট্রায়াল মাঠে। কিন্তু ডুরান্ড তাঁদের সকলকেই এনে দিয়েছে একই মঞ্চে— যেখানে তাঁদের সামনে রয়েছে আইএসএল, আই-লিগের দল, বিদেশি প্রতিপক্ষ এবং অভিজ্ঞ পেশাদার ফুটবলার।

গ্রুপ এ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন সাউথ ইউনাইটেড এফসি-র মহম্মদ আলতাব হুসেন এবং রিনশিদ ভি। গ্রুপ বি থেকে ভারতীয় সেনা ফুটবল টিমের সাইখোম বরিস সিং ও সমলেশ্বরী স্পোর্টিংয়ের বীর অর্জুন জোশী। গ্রুপ সি থেকে ভারতীয় বায়ূসেনা দলের স্যামুয়েল কে. ভানলালপেকা ও নাওরেম সোমানন্দ সিং।

আরও পড়ুন: ডুরান্ড ফাইনালে আবার ডার্বি? জানা যাবে আজ, ইস্টবেঙ্গলের কষ্টকর জয়ের পর চ্যালেঞ্জ মোহনবাগানের

গ্রুপ ডি থেকে একমাত্র নির্বাচিত এফসি রেংদাইয়ের মিদুল দোলে। গ্রুপ ই-তে ল্যাংসনিং এফসির কিরমেনসখেম মুখিম এবং নংকসেহ এসএস ও শিশির দাওয়ানচা কার্লোস চাল্লাম। গ্রুপ এফ থেকে বোডোল্যান্ড এফসির ঋতুরাজ মোহন ও কার্বি আংলং মর্নিং স্টার এফসির লালপেখলুয়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

নাওরেম সোমানন্দ সিং-এর কাছে এ বারের ডুরান্ড ছিল যেন এক অন্য রকমের পাঠশালা। শ্রীলঙ্কার সশস্ত্র বাহিনীর দল ডিফেন্ডার্স এফসির বিরুদ্ধে বক্সের বাইরে থেকে তাঁর গোল এখনও বিশেষ স্মৃতি হয়ে রয়েছে। তবে শুধু গোল নয়, বড় দল ও প্রতিষ্ঠিত ফুটবলারদের বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর মতে, জামশেদপুর বা দিল্লির মতো পেশাদার দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগই তরুণদের শেখার সেরা জায়গা।

সোমানন্দের সতীর্থ স্যামুয়েল ভানলালপেকার কাছেও বিশেষ স্মৃতি এসসি দিল্লির বিরুদ্ধে গোল। বড় দলের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। দু’জনের লক্ষ্যও এক— আরও উন্নতি করে এক দিন ভারতের জার্সি গায়ে মাঠে নামা।

১৯ বছরের এক তরুণ বীর অর্জুন জোশি। কলকাতায় যাঁর অভিষেক ম্যাচ। প্রতিপক্ষ ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম প্রাচীন ক্লাব মহমেডান এসসি। চাপটা তাই শুধু ম্যাচের ছিল না, ছিল সমলেশ্বরী স্পোর্টিংয়ের মতো নবাগত দলেরও। জোশীর বাঁ পায়ের বাঁকানো ফ্রি-কিক মহমেডানের দেওয়াল টপকে জালে জড়িয়ে যায়। সমলেশ্বরী জেতে ৩-২-এ। আর সেই একটি গোলই বলে দেয়, ডুরান্ড কাপ শুধু প্রতিষ্ঠিত তারকাদের মঞ্চ নয়, নতুনদের নিজেদের পরিচয় তৈরি করারও জায়গা।

আরও পড়ুন: পিতৃহারা হওয়ার পর প্রথম গোল মেসির

বীর অর্জুন জোশির ফুটবলযাত্রা আবার একেবারেই অন্য রকম। আমেরিকা থেকে স্পেন এবং ইংল্যান্ডের অ্যাকাডেমি ঘুরে তাঁর পথ এসে মিশেছে ওড়িশার সম্বলপুরের সমলেশ্বরী স্পোর্টিংয়ে। কলকাতায় ডুরান্ডের মঞ্চে মহমেডানের বিরুদ্ধে তাঁর সেই ফ্রি-কিক তাই শুধু একটি ম্যাচ জেতানো গোল নয়, বহু পথ পেরিয়ে আসা এক তরুণের আত্মপ্রকাশও।

সাউথ ইউনাইটেডের দুই ফুটবলারের গল্প আবার দেখিয়ে দেয়, পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ ও সঠিক সুযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯ বছরের আলতাব হুসেন মণিপুরের ছেলে। বেঙ্গালুরুর সুপার ডিভিশনে ভালো খেলে দু’বার ভারত অনূর্ধ্ব-২০ দলে ডাক পেয়েছিলেন। গত তিন বছর ধরে সাউথ ইউনাইটেডের পরিকল্পিত ফুটবল কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেন তিনি। ডুরান্ডে তাঁর আক্রমণাত্মক ফুটবল নজর কেড়েছে। তাঁর স্বপ্ন এক দিন আইএসএলে খেলা এবং ভারতের হয়ে মাঠে নামা।

রিনশিদ ভি-র গল্প আরও অন্য রকম। কেরলের মালাপ্পুরমের ২০ বছরের এই মিডফিল্ডার আঞ্চলিক ট্রায়ালে নজরে পড়ে যান সাউথ ইউনাইটেডের স্কাউটদের। মাত্র দু’বছরের প্রশিক্ষণ তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে ডুরান্ডের মতো মঞ্চে।

সাইখোম বরিস সিং ভারতীয় আর্মির আক্রমণভাগে নিজের গতি ও সরাসরি ফুটবলের জন্য নজর কেড়েছেন। মিদুল দোলে এফসি রেংদাইয়ের প্রথম ডুরান্ড অভিযানে হয়ে উঠেছিলেন আক্রমণভাগের অস্ত্র। শিলং থেকেও উঠে এসেছে দুই প্রতিভা। ল্যাংসনিংয়ের কিরমেনসখেম মুখিম গ্রুপ পর্বে দু’টি গোল করেছেন। নংকসেহের দাওয়ানচা কার্লোস চাল্লামের ঝুলিতে রয়েছে দু’টি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট। বোডোল্যান্ডের ঋতুরাজ মোহন রক্ষণ ও আক্রমণ— দু’দিকেই অবদান রেখেছেন। অন্য দিকে, কার্বি আংলং মর্নিং স্টারের লালপেখলুয়া প্রান্ত থেকে প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করেছেন একাধিকবার।

এই ১১ জনের মধ্যে কারও যাত্রাপথ এক নয়। কিন্তু ডুরান্ড কাপ তাঁদের এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। ভারতের বড় ক্লাব, পেশাদার দল, বিদেশি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিজেদের মেপে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।আর এখানেই ডুরান্ডের নতুন ভাবনার গুরুত্ব।

আরও পড়ুন: আইপিএলে পুরনো ডেরাতেই থেকে যাচ্ছেন হার্দিক? মুম্বইয়ের পোস্টে জল্পনা তুঙ্গে

শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন নয়, সারা টুর্নামেন্ট জুড়ে তরুণ প্রতিভাদের খুঁজে বের করে তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে আয়োজক সংস্থা। একটি মাত্র সেরা তরুণ বেছে নেওয়ার বদলে প্রতি গ্রুপ থেকে প্রতিভা তুলে আনার ফলে সুযোগ তৈরি হয়েছে সকলের জন্যই।

প্রত্যেকের হাতে এক লক্ষ টাকার সান্মানিক এসেছে ঠিকই। কিন্তু এই স্বীকৃতির আসল মূল্য হয়তো অন্য জায়গায়। আলতাবের কাছে পুরস্কার পরিশ্রমের স্বীকৃতি। রিনশিদের কাছে আত্মবিশ্বাসের নতুন ঠিকানা। সোমানন্দ ও ভানলালপেকার কাছে বড় স্বপ্ন সত্যি করার সিঁড়ি। আর জোশীর কাছে মহমেডানের বিরুদ্ধে সেই বাঁকানো ফ্রি-কিক হয়তো ভবিষ্যতের প্রথম বড় অধ্যায়।

ডুরান্ড কাপ (Durand Cup) এই এগারো জনকে একটি মঞ্চ দিয়েছে। এখান থেকে কে কত দূর যাবেন, তা বলবে সময়। তবে ভারতীয় ফুটবলের পরবর্তী প্রজন্ম যে শুধু পরিচিত অ্যাকাডেমি বা বড় শহরের গণ্ডিতে আটকে নেই, ডুরান্ডের এই ১১জন প্রতিভাবান সেই কথাই ফের মনে করিয়ে দিল।

দেখুন: টানা বৃষ্টিতে Salal Dam-এর Spillway Gate খোলা হল