সাংবাদিক বৈঠকে এসে কথা বলতে শুরু করেছিলেন স্বাভাবিক ভাবেই। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই গলা ধরে এল। চোখ ভরে উঠল জলে। বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ০-১ গোলে হারের ধাক্কা তখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। ফুটবলারদের লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়েই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন তিনি। শেষ পর্যন্ত চোখের জল ফেলতে ফেলতেই সাংবাদিক বৈঠক ছেড়ে চলে যান তিনি।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দীর্ঘ ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের পর ফেরান তোরেসের গোলে বিশ্বকাপ জিতে নেয় স্পেন। আর টানা দ্বিতীয় বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় লিওনেল মেসিদের। শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠে যেমন কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মেসি, তেমনই কিছু ক্ষণ পরে সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না তাঁদের কোচ স্কালোনিও।
কোচ বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি শুধু আমার ফুটবলারদের কথাই ভাবছি। ওরা যা দিয়েছে, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। এই দলটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে। ওদের জন্যই আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে’।
কথা বলতে বলতেই এক সময় থেমে যান স্কালোনি। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর নিজেকে সামলে আবার বলেন, ‘ফুটবল কখনও কখনও খুব নিষ্ঠুর। আমরা সব কিছু উজাড় করে দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাও যথেষ্ট হল না। এই হার মেনে নেওয়া খুব কঠিন’।
Lionel Scaloni broke down in tears and couldn’t finish his press conference.
This is honestly a tough watch. 💔pic.twitter.com/EkEzYwuAVI
— MC (@CrewsMat10) July 19, 2026
স্কালোনি অবশ্য স্পেনের কৃতিত্ব দিতেও ভোলেননি। তাঁর কথায়, ‘স্পেন দারুণ দল। ওদের অভিনন্দন জানাতেই হবে। তারা সুযোগ কাজে লাগিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যোগ্য দাবিদার’।
আর্জেন্টিনা কোচ আরও বলেন, ‘এই পরাজয় আমাদের অবশ্য আমাদের আসল পরিচয় তুলে ধরবে না। এই দল গত কয়েক বছরে যা অর্জন করেছে, তা নিয়ে আমরা গর্বিত। আজ আমরা হেরেছি, কিন্তু আমার ফুটবলারদের নিয়ে আমি আগের চেয়েও বেশি গর্বিত’।
আক্ষেপ করে স্কালোনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ফুটবলারের চোটের কারণে সেরা দল নিয়ে নামার সুযোগ পাননি তাঁরা। তাঁর কথায়, এই হার তাঁকে অন্তর থেকে আঘাত করেছে। বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পজিশনে এমন চোটের সমস্যায় পড়ব, সেটা আমরা একেবারেই আশা করিনি। টুর্নামেন্ট জুড়ে ফুটবলারদের উপর প্রচণ্ড ধকল গিয়েছে। তবু ওরা নিজেদের শেষ শক্তিটুকুও উজাড় করে দিয়েছে। আমি এমন এক জায়গায় আছি, যেখানে পৌঁছনো প্রত্যেক কোচেরই স্বপ্ন। এই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি সব সময় সভাপতিকে (ক্লদিও তাপিয়া) ধন্যবাদ জানাই। এই জায়গাটা সত্যিই অসাধারণ। এমন একটি দল গড়ে তোলা খুবই কঠিন। আর এই হার আমার আত্মাকে গভীরভাবে আঘাত করেছে’।
২০১৮ থেকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্বে থাকা স্কালোনি অবশ্য নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মুখ খুলতে চাননি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, আগামী দিনে কী করবেন, তা নিয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থার (এএফএ) সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করবেন।
কোচ বলেন, ‘সত্যি বলতে, লিওর (মেসি) সঙ্গে এ নিয়ে আমার কোনও কথা হয়নি। আর আমার নিজের ব্যাপারে বললে, আমি সভাপতির সঙ্গে কথা বলব। ভবিষ্যতে কী করতে চাই, সে বিষয়ে আমার একটা ধারণা রয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত আমার চুক্তির মেয়াদ রয়েছে, সেটি আমি পূরণ করব। তবে আমার মনে হচ্ছে, কিছুটা সময় নিয়ে ভাবার দরকার আছে। কারণ, জানি না এর চেয়ে বড় কিছু আর করা সম্ভব কি না। হয়তো বিষয়টি নিয়ে আমাদের বসে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিত’।
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেলেও স্কালোনির বক্তব্যে ছিল না কোনও অভিযোগ বা অজুহাত। বরং বারবার তিনি তুলে ধরেছেন নিজের দলের লড়াই, আত্মত্যাগ এবং ঐক্যের কথা। সাংবাদিক বৈঠক শেষ হওয়ার সময়ও তাঁর চোখে জল স্পষ্ট ছিল। সেই দৃশ্যই যেন বলে দিল, বিশ্বকাপ ট্রফি হারানোর যন্ত্রণা শুধু সমর্থকদের নয়, কোচের মনেও কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।




