• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 20 July, 2026

দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার, চোখের জলে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ মেসির, ফেরান তোরেসের গোলে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় স্পেনের

ম্যাচ শেষের পর টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে শিশুর মতো হাউ হাউ করে কাঁদছেন মেসি। নিউ জার্সির এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ঘটেছিল সেই ঘটনা। তার পর থেকে এই স্টেডিয়াম তাঁর কাছে অভিশপ্ত হয়ে রয়েছে। সেই অভিশাপ এই ম্যাচেও কাটাতে পারলেন না মেসি।

দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার, চোখের জলে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ মেসির, ফেরান তোরেসের গোলে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় স্পেনের

Photo: X

শেষটা এমন হবে, হয়তো কল্পনাও করেননি লিওনেল মেসি। গোটা বিশ্বকাপজুড়ে নেতৃত্ব এবং অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠা আর্জেন্টিনার অধিনায়কের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হল চোখের জলে! স্পেনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে ০-১-এ হেরে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেল আলবিসেলেস্তেদের। সম্ভবত বিশ্বকাপের মঞ্চে এটাই ছিল ৩৯ বছর বয়সি মেসির শেষ ম্যাচ।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একের পর এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছিল আর্জেন্টিনা। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে দুই গোলের জোগান— বারবার দলকে বিপদ থেকে টেনে তুলেছিলেন মেসি। সারা টুর্নামেন্টে ১৯টি গোল করেছিলেন মেসি-আলভারেজরা। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের ইস্পাত-কঠিন রক্ষণ এবং মাঝমাঠের দাপটের সামনে কার্যত নিষ্প্রভ হয়ে পড়েন তিনি ও তাঁর পুরো দল। নিয়মিত সময়ে তো বটেই, অতিরিক্ত সময়ের শেষ ভাগের আগে পর্যন্ত আর্জেন্টিনা একটিও শট নিতে পারেনি। শেষ দশ মিনিটে মাত্র দু’টি শট নেয়। কিন্তু পুরো ১২০ মিনিটের খেলায় তাদের একটিও শট গোলের লক্ষ্যে ছিল না।

অথচ স্পেন সারা ম্যাচে ২০টি শট নেয়, যার মধ্যে ‘অন টার্গেট’ ছিল ১২টি। পুরো স্পেন দল ও গোলের মাঝখানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তেনেজ। ১১টি অবধারিত গোল অবিশ্বাস্য ভাবে সেভ করেন তিনি। তিনি প্রাচীরের মতো ইয়ামালদের সামনে না থাকলে এই ম্যাচে হয়তো আরো বেশি ব্যবধানে জিততে পারত স্পেন। একাধিক দুরন্ত সেভ করে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখলেও শেষরক্ষা করতে পারেননি। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলেই নির্ধারিত হয় বিশ্বকাপের ভাগ্য।

কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের হয়ত অনেকেরই মনে আছে ন’বছর আগে এই ফেরান তোরেসই ভারতে অনূর্ধ ১৭ বিশ্বকাপে খেলেছিলেন এবং কলকাতায় ফাইনালেও খেলেন। সেই বিশ্বকাপ থেকেই এই বিশ্বকাপে আসার পথ তৈরি শুরু করেন ফেরান তোরেস। আর ফাইনালে গোল করে স্পেনকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দিয়ে একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন তিনি। বাইলাইনের ভিতর থেকে দেওয়া নিকো উইলিয়ামসের ব্যাক পাস পেয়ে সোজা গোলে শট নেন তোরেস।

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির কাজ আরো কঠিন হয়ে পড়ে, তাঁর প্রথম একাদশের দুই সেন্টার-ব্যাক চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ায়। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে লিসান্দ্রো মার্তিনেসের পরিবর্তে নামতে হয় নিকোলাস ওতামেন্দিকে। আর ম্যাচের ৭০ মিনিটে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর জায়গায় নামেন ফাকুন্দো মেদিনা।

তখন ম্যাচের স্টিয়ারিং ছিল স্পেনেরই হাতে। ৬৭ মিনিটে লামিনে ইয়ামাল দারুণ একটি সুযোগ তৈরি করে দেন ফেরান তোরেসের জন্য। কিন্তু তাঁর হেডটি আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক মার্তিনেজের খুব কাছ থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর পাও কুবার্সি এবং বদলি ফুটবলার পেদ্রি ও নিকো উইলিয়ামসের শটও দুর্দান্ত দক্ষতায় রুখে দেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক। স্পেনের অবিরাম চাপের শেষ পর্বে, নির্ধারিত সময়ের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে ইয়ামালের উড়ে যাওয়া ফ্রি-কিক অসাধারণ ভঙ্গিতে প্রতিহত করে দলকে ফের বাঁচান মার্তিনেজ।

অতিরিক্ত সময়েও ছবিটা তেমন বদলায়নি। নিকো উইলিয়ামসের শক্তিশালী হেড দুর্দান্ত দক্ষতায় রুখে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেস। অন্য দিকে, মিকেল মেরিনোর আরেকটি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। নিকো উইলিয়ামস এবং ফেরান তোরেস— দু’জনেরই একটি করে গোল যথাক্রমে ফাউল ও অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। তবে সেই সব কিছুর মাঝেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন তোরেস। তাঁর সেই গোলেই আবারও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে উঠে আসে স্পেন।

স্পেনের কড়া নজরদারিতে এ দিন আশ্চর্যজনকভাবে নিষ্প্রভ ছিলেন লিওনেল মেসি। ফাইনালের আগে পর্যন্ত টুর্নামেন্টে আটটি গোল করা আর্জেন্টিনা অধিনায়ককে দেখে এ দিন অবাক হয়ে যায় সারা ফুটবলদুনিয়া। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মেসির সেই জোড়া অ্যাসিস্ট, যা তাদের অসাধারণ জয় এনে দেয়, সেই পারফরম্যান্সকে যদি দশে নয় দেওয়া যায়, তা হলে তাঁর ফাইনালের পারফরম্যান্সকে দশে দুইও দেওয়া যাবে কি না, সেটাই প্রশ্ন। শুধু তাই নয়, গোটা ম্যাচে তিনি একটি কী পাসও দিতে পারেননি। ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিট ছাড়া মেসিকে কার্যত দর্শকের ভূমিকায় দেখা যায়। ওই সময়ে বলে মাত্র একবার পা লাগাতে পেরেছিলেন তিনি। এতটাই কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেছিল স্প্যানিশরা।

মাঠে এক গোল হলেও এ দিন মাঠের বাইরে কৌশলের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের কোচকে প্রায় দশ গোল দিয়ে দেন স্পেনের অভিজ্ঞ ও প্রবীন কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে। স্পেনে উয়েফা প্রো কোচিং লাইসেন্স করার সময় আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির প্রশিক্ষকদের অন্যতম ছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। এই ফাইনালে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ‘বাপ, বাপ হি হোতা হ্যায়’। তবে গুরু-শিষ্যের এই মস্তিষ্কের লড়াইয়ে যে এ ভাবে নাস্তানাবুদ হবেন স্কালোনি, তা সত্যিই ভাবা যায়নি। হয়তো ভাবতে পারেননি তিনি নিজেও। তাই ম্যাচের সাংবাদিক বৈঠকে এসে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তিনি।

চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি মেসিও। ২০১৬-র ২৬ জুনের রাতে কোপা আমেরিকা ফাইনালে টাইব্রেকারে চিলির কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। টাইব্রেকারে নিজের শটটি বাইরে মেরেছিলেন মেসি। শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিতে নেয় চিলি। ম্যাচ শেষের পর টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে শিশুর মতো হাউ হাউ করে কাঁদছেন মেসি। নিউ জার্সির এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ঘটেছিল সেই ঘটনা। তার পর থেকে এই স্টেডিয়াম তাঁর কাছে অভিশপ্ত হয়ে রয়েছে। সেই অভিশাপ এই ম্যাচেও কাটাতে পারলেন না মেসি। আবার চোখের জলে মেটলাইফের মাঠ ছাড়তে হল তাঁকে।

পুরো টুর্নামেন্টে মেসিই ছিলেন আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা। গোল করেছেন, করিয়েছেন, কঠিন মুহূর্তে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ফাইনালে তাঁকে কার্যত নিস্তেজ করে দিতে সক্ষম হয় স্পেন। বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজতেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন মেসি। পরে রানার্স-আপ পদক গ্রহণের সময়ও তাঁর চোখে জল চিকচিক করছিল। সেই ছবি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে।

এই হার নিঃসন্দেহে আর্জেন্টিনার কাছে বড় ধাক্কা। তাতে অবশ্য মেসির কিংবদন্তি মর্যাদায় কোনও দাগ লাগবে না। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্লাব ও দেশের জার্সিতে অসংখ্য সাফল্য এনে দেওয়া এই মহাতারকার বিশ্বকাপ যাত্রা চোখের জলে শেষ হল ঠিকই, কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মেসিকে ভুলবে না বিশ্বকাপের ইতিহাস, মেসিকে ভুলবে না সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা।