রাখঢাক নেই। একেবারে সোজাসাপটা মন্তব্য—ভারতে ফুটবলের সংস্কৃতি নেই! আসন্ন প্রীতি ম্যাচের আগে ভারতীয় ফুটবলের দুর্বল পরিকাঠামো ও তৃণমূল স্তরের সমস্যার দিকে এ ভাবেই আঙুল তুললেন ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো অ্যান্সেলোত্তি। আগামী ৩ অক্টোবর কলকাতায় মুখোমুখি হবে ভারত ও ব্রাজিল। তার আগে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল কোচের এই মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
কলকাতায় আসতে মুখিয়ে অ্যান্সেলোত্তি
২৫ সেপ্টেম্বর থেকে তিনটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলবে ভারত। প্রতিপক্ষ পানামা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। শেষ দু’টি ম্যাচই হবে কলকাতায়। ব্রিসবেন থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যান্সেলোত্তি বলেন, বিভিন্ন দেশের ফুটবল সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সফর তাই তাঁর কাছে রোমাঞ্চকর।
কলকাতায় আসার আগ্রহের কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি। অ্যান্সেলোত্তির কথায়, বিশ্বমানের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা ভারতের খুব বেশি নেই। তবে ভারতীয় দল কী ভাবে খেলে, তা জানা তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে তাঁর এটাই প্রথম সফর এবং কলকাতায় যাওয়ার জন্য তিনি মুখিয়ে রয়েছেন।
তবে প্রশংসার পাশাপাশি ভারতীয় ফুটবলের মূল সমস্যাটিও চিহ্নিত করেছেন ব্রাজিলের কোচ। তাঁর বক্তব্য, সমস্যাটি মূলত ফুটবল সংস্কৃতির। ভারতে ফুটবলের সেই সংস্কৃতি এখনও তৈরি হয়নি। অন্য খেলায় ভারত যথেষ্ট ভালো হলেও নতুন প্রজন্মের ফুটবলার তৈরি করতে হলে তৃণমূল স্তরে আরও অনেক বেশি কাজ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে ক্রমেই পিছিয়ে ভারত
অ্যান্সেলোত্তির মন্তব্য একেবারে ভিত্তিহীন নয় বলেই মনে করছেন অনেকে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারতের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও সেই ছবিই তুলে ধরছে। ২০২৪ সালের জুনে কাতারের কাছে ১-২ গোলে হেরে ২০২৬ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্ব থেকেই ছিটকে যায় ভারত। এশিয়ান কাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বেও সাফল্য আসেনি। ছ’টি ম্যাচে মাত্র পাঁচ পয়েন্ট পাওয়ার পর ২০২৭ এশিয়ান কাপের মূল পর্বে ওঠার পথও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
বিশ্ব ক্রমপর্যায়েও ভারতের পতন অব্যাহত। ২০২৬ সালের ২০ জুলাই প্রকাশিত ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ভারতের অবস্থান ১৩৮। একসময় ৯৪ নম্বরে থাকা জাতীয় দলের এই অবনমন ভারতীয় ফুটবলের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঘরোয়া ফুটবলেও অনিশ্চয়তা
জাতীয় দলের পাশাপাশি ঘরোয়া ফুটবলের ছবিটাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫ সালে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে রিলায়েন্সের বাণিজ্যিক চুক্তি শেষ হওয়ার পর থেকেই ইন্ডিয়ান সুপার লিগের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নতুন মরশুমের সূচি এবং সম্প্রচার সংক্রান্ত বিষয় এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তার মধ্যেই জামশেদপুর এফসি-র সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘরোয়া ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও প্রশ্ন তুলেছে।
তবে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তৃণমূল স্তরে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের তুলনায় ভারতীয় তরুণ ফুটবলাররা অনেক কম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। বহু রাজ্যে নিয়মিত যুব লিগ নেই। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কোচের অভাবও প্রকট।
দেশে ফুটবল নিয়ে আবেগের অভাব নেই। গ্যালারিতে সমর্থকদের উন্মাদনা, বড় ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা—সবই রয়েছে। কিন্তু সেই আবেগকে ধারাবাহিকভাবে দক্ষ ফুটবলার তৈরির প্রক্রিয়ায় পরিণত করার মতো পরিকাঠামো এবং পরিকল্পনার ঘাটতি এখনও স্পষ্ট। আর ভারত সফরের আগে সেই দুর্বল জায়গাটিতেই সরাসরি আঙুল রাখলেন বিশ্বকাপজয়ী কোচ অ্যান্সেলোত্তি।




