ঐতিহ্য, আচার ও ভক্তির মেলবন্ধনে উত্তর-পূর্ব কলকাতার অনন্য রথযাত্রা; ১০৮ ঘড়া জলে স্নান, জোড়া নিমকাঠের বিগ্রহ, রশি টানতে হাজারো মানুষের সমাগম। বাংলার আকাশে রথযাত্রার উৎসব মানেই ভক্তি, ঐতিহ্য আর মিলন মেলার আবহ। ওড়িশার পুরীর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তেও সমান উৎসাহ-উদ্দীপনায় পালিত হচ্ছে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা।

কলকাতা থেকে হুগলি, হাওড়া, বাঁকুড়া, বর্ধমান, পুরুলিয়া, কোচবিহার কিংবা শিলিগুড়ি— সর্বত্রই রথের রশিতে টান দিতে ভোর থেকেই ভিড় জমিয়েছেন অসংখ্য ভক্ত। সেই আবহেই উত্তর-পূর্ব কলকাতার কেষ্টপুর রবীন্দ্রপল্লির ‘জগন্নাথ বাড়ি’র রথযাত্রা এবারও হয়ে উঠেছে অন্যতম আকর্ষণ।

কলকাতায় রথযাত্রার ইতিহাসে ইসকনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭২ সাল থেকে এলগিন রোডের ইসকন মন্দিরের উদ্যোগে রথযাত্রা শহরের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। তবে বনেদি বাড়ির ঐতিহ্যের পাশাপাশি গত কয়েক বছরে কেষ্টপুরের ‘জগন্নাথ বাড়ি’র রথযাত্রাও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে।

জগন্নাথ বাড়ির কর্তা কৌশিক চন্দ্র জানান, নতুন বাড়ি নির্মাণের সময় তাঁর স্ত্রীর ইচ্ছাতেই বাড়ির নাম রাখা হয় ‘জগন্নাথ বাড়ি’। এরপর সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ। সেই থেকেই প্রতি বছর জাঁকজমক করে রথযাত্রার আয়োজন হয়ে আসছে। এই রথযাত্রার অন্যতম বিশেষত্ব হল— তিন বিগ্রহের পাশাপাশি সুদর্শনচক্রেরও পূজা করা হয়।

রথযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয় স্নানযাত্রার দিন থেকেই। জোড়া নিমকাঠে নির্মিত জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার কাঠের বিগ্রহকে ১০৮ ঘড়া জল দিয়ে স্নান করানো হয়। এরপর ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী প্রভুর ‘অনসর’ বা অসুস্থতার সময় বিশেষ সেবাযত্ন করা হয়। পনেরো দিন পর চক্ষুদান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রথযাত্রার মূল পর্বের সূচনা হয়।
রথের দিন সকাল থেকেই ভক্তদের ঢল নামে জগন্নাথ বাড়িতে। প্রসাদ বিতরণ, ভোগ ও নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সন্ধ্যা নামতেই রথের রশিতে টান দিতে ভিড় করেন হাজার হাজার মানুষ। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও হরিনামে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। স্থানীয় বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে প্রভু জগন্নাথ আবার ফিরে আসেন জগন্নাথ বাড়িতে।

অন্যান্য বহু রথযাত্রায় ‘মাসির বাড়ি’ যাওয়ার রীতি থাকলেও কেষ্টপুরের জগন্নাথ বাড়িতে এখনও সেই প্রথা চালু হয়নি। উদ্যোক্তাদের জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে মাসির বাড়ির ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। আপাতত উল্টো রথ পর্যন্ত সমস্ত ধর্মীয় আচার ও উৎসব জগন্নাথ বাড়িকেই কেন্দ্র করে পালিত হয়।
ঐতিহ্য, ভক্তি এবং সর্বজনীন অংশগ্রহণের অনন্য মেলবন্ধনে কেষ্টপুর রবীন্দ্রপল্লির জগন্নাথ বাড়ির রথযাত্রা বর্তমানে কলকাতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও সেই উৎসবের সাক্ষী থাকল হাজার হাজার মানুষের অকৃত্রিম ভক্তি ও উচ্ছ্বাস।




