• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 2 October, 2026

‘শিশুর সুরক্ষায় কোনও সীমারেখা নয়’—ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি উদ্যোগে এক মঞ্চে প্রশাসন-পুলিশ-আইন ও সমাজের প্রতিনিধিরা

শিশুর চোখে নেই কোনও দফতরের সীমানা, নেই প্রশাসনিক বিভাজন। তাই তাদের নিরাপত্তা, অধিকার, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেও প্রয়োজন

‘শিশুর সুরক্ষায় কোনও সীমারেখা নয়’—ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি উদ্যোগে এক মঞ্চে প্রশাসন-পুলিশ-আইন ও সমাজের প্রতিনিধিরা

শিশুর চোখে নেই কোনও দফতরের সীমানা, নেই প্রশাসনিক বিভাজন। তাই তাদের নিরাপত্তা, অধিকার, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেও প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ। এই মানবিক বার্তাকেই সামনে রেখে বারাসতে অনুষ্ঠিত হল জেলা স্তরের গুরুত্বপূর্ণ কনভার্জেন্স মিটিং।

শিশু অধিকার রক্ষা, শিশুদের যত্ন, পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনের সময় সহজে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি , উত্তর ২৪ পরগনা এবং চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড ইউ র যৌথ উদ্যোগে বারাসতের রবীন্দ্র ভবনে আয়োজিত হয় এই জেলা-স্তরের সমন্বয় বৈঠক। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টে পর্যন্ত চলা এই অনুষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সরকারি দফতর, প্রতিষ্ঠান ও পরিষেবা ব্যবস্থার প্রতিনিধিরা এক ছাতার নীচে মিলিত হন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উত্তর ২৪ পরগনার জেলা ও দায়রা বিচারক তথা ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটিচেয়ারম্যান শ্রী সুকুমার রায়, DLSA-র সচিব মোঃ নুরজামান খান, পশ্চিমবঙ্গ স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির প্রতিনিধি শ্রীমতী স্বাতী মৌলিক, উত্তর ২৪ পরগনা জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের প্রিন্সিপাল ম্যাজিস্ট্রেট শ্রীমতী নীলাঞ্জনা সাহা, CRY-এর আধিকারিক এবং জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিটের (DCPU) প্রতিনিধিরা।

পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকদের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন থানার পুলিশকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, আইসিডিস ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, আশাকর্মী, হাসপাতালের কর্মী, বিভিন্ন স্কুলের পড়ুয়া এবং আইন বিভাগের ছাত্রছাত্রীরাও বৈঠকে অংশ নেন। ফলে শিশু সুরক্ষার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে মতবিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি হয়।

বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেলা ও দায়রা বিচারক তথা ডিএলএস- এর র চেয়ারম্যান শ্রী সুকুমার রায় স্পষ্ট করে দেন, শিশুদের নিরাপত্তা কোনও একটি দফতরের একার দায়িত্ব হতে পারে না। প্রতিটি দফতর ও সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার। সেই কারণে পারস্পরিক সহযোগিতা ও কার্যকর সমন্বয়ের উপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।

পশ্চিমবঙ্গ স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির প্রতিনিধি শ্রীমতী স্বাতী মৌলিক বলেন, যে কোনও শিশুর প্রয়োজনের মুহূর্তে বিনামূল্যে আইনি পরিষেবা পৌঁছে দিতে হবে। শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য নিরাপদ, সুরক্ষিত ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার উপরও তিনি জোর দেন।

বৈঠকে বিশেষভাবে উঠে আসে শিশুবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়টি। ডিএলএস- এর র সচিব মোঃ নুরজামান খান শিশুদের পাশাপাশি অপরাধের শিকার প্রত্যেক শিশুর প্রতি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। জেলার প্রত্যন্ত ও সীমান্তবর্তী এলাকার মধ্যে হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি, গোপালনগর ও বাগদা-র মতো এলাকায় শিশুবিবাহ প্রতিরোধে আরও শক্তিশালী ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনও একটি দফতর একা কাজ করে শিশুবিবাহ প্রতিরোধ বা সামগ্রিক শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। পুলিশ, প্রশাসন, স্বাস্থ্য দফতর, ICDS, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিশু সুরক্ষা সংস্থা এবং আইনি পরিষেবা প্রতিষ্ঠান—প্রত্যেককে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

“শিশুরা দফতরের সীমানা বোঝে না; তাদের সুরক্ষার জন্য একসঙ্গে কাজ করার দায়িত্ব আমাদের।”
বৈঠকে আরও আলোচনায় উঠে আসে শিশু অধিকার, শিশুবিবাহ প্রতিরোধ, অপরাধের শিকার শিশুদের সহায়তা, বিনামূল্যে আইনি পরিষেবা, পুনর্বাসন এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ও শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনও শিশু বিপদের মধ্যে রয়েছে কি না, তার প্রয়োজন কী এবং দ্রুত কীভাবে তার পাশে দাঁড়ানো যায়—এই ক্ষেত্রে পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি ও আশাকর্মী, হাসপাতালকর্মীসহ ফ্রন্টলাইন কর্মীদের ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

শিশুর সুরক্ষা শুধু আইনের বিষয় নয়—এটি সমাজের মানবিক দায়িত্বও। সেই ভাবনাকে সামনে রেখেই বৈঠকের শেষে সকল অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে শিশু-কেন্দ্রিক, সমন্বিত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়। লক্ষ্য একটাই—প্রতিটি শিশুর জন্য এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে ভয় নয়, নিরাপত্তা; অবহেলা নয়, যত্ন; আর অনিশ্চয়তা নয়, সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ হবে তাদের অধিকার।