পুজোর পর কলকাতা ও হাওড়া পুরভোট। তার আগে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচন। অর্থাৎ, রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর একের পর এক নির্বাচনী পরীক্ষার সামনে রাজনৈতিক দলগুলি। আর সেই পরীক্ষায় বিজেপি যখন ধীরে ধীরে নিজেদের কৌশল সাজিয়ে নিচ্ছে, তখন তৃণমূলের সামনে তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সঙ্কট, দলের প্রতীক কার, প্রার্থী কে, এমনকি শেষ পর্যন্ত কোন শিবির নির্বাচনে ‘তৃণমূল’ নামে লড়বে, সেই প্রশ্নও এখনও পুরোপুরি মেটেনি।
কলকাতা ও হাওড়া পুরভোটে বিজেপির পরিকল্পনা আপাতত বেশ স্পষ্ট। বিধানসভা নির্বাচনের পথেই হাঁটতে চাইছে দল। ভোটের আগে কাউকে মেয়র পদপ্রার্থী ঘোষণা নয়। ফলাফল প্রকাশের পর নির্বাচিত কাউন্সিলরদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই মেয়র বেছে নেওয়া হবে। বিজেপির শীর্ষ স্তরে এমনটাই আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
এই সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রীতি। কোনও রাজ্যে দল ক্ষমতায় থাকলে সাধারণত বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বেই পরবর্তী বিধানসভা ভোটে লড়ে বিজেপি। কিন্তু নতুন করে ক্ষমতা দখলের আগে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করা দলের বাধ্যতামূলক রীতি নয়। পশ্চিমবঙ্গেও বিধানসভা ভোটের প্রচারে শুভেন্দু অধিকারীকে আনুষ্ঠানিক ভাবে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী করা হয়নি। ভোটে জয় আসার পর তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী
করা হয়েছে।
পুরভোটেও সেই মডেলই অনুসরণ করতে চাইছে বঙ্গ বিজেপি। কলকাতা বা হাওড়া কোনও পুরসভাই এখনও বিজেপির হাতে নেই। ফলে আগে থেকেই মেয়র মুখ সামনে আনার প্রয়োজন দেখছে না দলের নেতৃত্বের বড় অংশ। বরং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সংগঠন শক্তিশালী করা এবং নিচুতলার কর্মীদের সামনে এনে ভোটে লড়াই করাই লক্ষ্য।
প্রার্থী বাছাইয়েও সেই বার্তাই রয়েছে। দুই পুরসভার প্রার্থী তালিকায় ‘চমক’ দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, এলাকায় পরিচিত এবং দীর্ঘদিন ধরে দলের হয়ে কাজ করা নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিধানসভা ভোটে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সাফল্যকে এবার পুর স্তরের সংগঠনে পরিণত করাই বিজেপির কাছে
বড় চ্যালেঞ্জ।
কারণ কলকাতা ও হাওড়া শুধু দুটি পুরসভা নয়, বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ শহুরে পরীক্ষাকেন্দ্র। বিধানসভায় সরকার গঠনের পরে এই ভোটেই প্রথম বার বৃহৎ শহুরে পরিসরে শাসক হিসেবে বিজেপিকে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। ফলে দলের কাছে মেয়র কে হবেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন— কতগুলি ওয়ার্ডে বিজেপি বোর্ড গঠনের অবস্থায় পৌঁছতে পারে।
কিন্তু বিজেপির পুর প্রস্তুতির পাশাপাশি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার আগের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচন। নির্বাচন কমিশন ৬ অক্টোবর এই দুই কেন্দ্রে ভোটের দিন
ঘোষণা করেছে। ফলে পুরভোটের আগে এই নির্বাচন কার্যত রাজ্যের রাজনৈতিক আবহের
প্রথম বড় পরীক্ষা।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা তৃণমূলের সামনে। ‘আসল’ তৃণমূল কে— এই প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। দুই শিবিরই নিজেদের দাবি জানিয়েছে। ফলে উপনির্বাচনের মনোনয়ন সামনে এসে পড়লেও দলীয় প্রতীক নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
কালীঘাটপন্থী শিবিরের নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, তাঁরা প্রার্থী দেবেন। তাঁর বক্তব্য, কমিশনের কাছে দু’পক্ষের আবেদন জমা রয়েছে এবং আইন অনুযায়ী দলীয় প্রতীক দেওয়ার ক্ষমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই রয়েছে। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের শিবির দ্রুত কমিশনের নিষ্পত্তির দাবি জানাচ্ছে। ফলে অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, একই রাজনৈতিক নাম, কিন্তু দুই শিবির; একই প্রতীকের দাবি, কিন্তু দুই পক্ষ। নির্বাচনী ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি কার্যত নজিরবিহীন।
প্রশ্ন হল, শেষ পর্যন্ত দুই শিবিরই কি প্রার্থী দিতে পারবে? নাকি কমিশনের সিদ্ধান্তে একটি পক্ষই দল ও প্রতীকের স্বীকৃতি পাবে? মনোনয়ন পর্ব যত এগোবে, এই প্রশ্ন ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নন্দীগ্রামে পরিস্থিতি আরও রাজনৈতিক। সেখানে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিজের জেলা। ফলে এই উপনির্বাচন শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্রের লড়াই হয়ে থাকছে না। বিজেপির সরকার গঠনের পর শুভেন্দুর রাজনৈতিক প্রভাব এবং সাংগঠনিক শক্তিরও পরীক্ষা হবে। তৃণমূলের কাছে নন্দীগ্রাম তাই মর্যাদার লড়াই, বিজেপির কাছে শক্তির প্রদর্শন।
রেজিনগরেও লড়াই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের দুই শিবিরের সাংগঠনিক সমীকরণ, কংগ্রেসের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং বামেদের প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি, সব মিলিয়ে আসনটি বহুস্তরীয় লড়াইয়ের দিকে যাচ্ছে। সিপিএম দু’টি কেন্দ্রেই প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নন্দীগ্রামে সিপিআইয়েরও দাবি রয়েছে। কংগ্রেসও নিজেদের সংগঠন ও স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে এগোচ্ছে।
তৃণমূলের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর জায়গাটি এখানেই। ভোটের আগে প্রতীক ও প্রার্থী নিয়ে যে অনিশ্চয়তা, ভোটের ফল প্রকাশের পরে সেটিই আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হতে পারে। যদি দুই শিবিরের মধ্যে কোনও একটি নির্বাচনী ভাবে স্পষ্ট ভাবে এগিয়ে যায়, অন্য পক্ষের সাংগঠনিক অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আর যদি দুই পক্ষই আলাদা ভাবে ভোটের ময়দানে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করে, তা হলে বিভাজন আরও প্রাতিষ্ঠানিক হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। অর্থাৎ, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ফল শুধু কে জিতল আর কে হারল, সেই হিসাব দেবে না। একই সঙ্গে দেখিয়ে দেবে তৃণমূলের বিভাজন কতটা বাস্তব, কোন শিবিরের মাঠে কতটা শক্তি এবং সাধারণ ভোটারের কাছে ‘তৃণমূল’ নামটির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা কোন দিকে যাচ্ছে।
এই জায়গাতেই বিজেপির সামনে তৈরি হচ্ছে বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা। নন্দীগ্রাম-রেজিনগরের ফলাফল পুরভোটের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক হাওয়া সম্পর্কে প্রথম বড় ইঙ্গিত দিতে পারে। আর তার পরে কলকাতা ও হাওড়ার লড়াই। বিজেপি তাই একসঙ্গে দুই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে— প্রথমে উপনির্বাচনে রাজনৈতিক বার্তা, তার পরে পুরভোটে সংগঠনের শক্তি।
তৃণমূলের সামনে অবশ্য পথটি ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। প্রতীক নিয়ে সিদ্ধান্ত নেই, প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তা, দুই শিবিরের সাংগঠনিক টানাপড়েন— সব মিলিয়ে দ্রুত এই জট কাটার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। আর উপনির্বাচনের ফল যদি সেই বিভাজনকে ভোটের অঙ্কে প্রকাশ করে, তা হলে কলকাতা ও হাওড়ার পুরভোটের আগে তৃণমূলের সঙ্কট আরও ঘনীভূত হওয়াই স্বাভাবিক।
বিজেপি সেই সুযোগটাই নিতে চাইছে। মেয়রের মুখ নয়— আগে ওয়ার্ড, আগে সংগঠন, আগে ভোট। আর তৃণমূলের সামনে আপাতত প্রশ্ন— আগে দল, না আগে প্রতীক? বাংলার পরবর্তী নির্বাচনী পর্বে এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো অনেক রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেবে।




