• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 14 August, 2026

বিলুপ্তির পথে বাংলার প্রাচীন টোল, অস্তিত্ব রক্ষায় পণ্ডিতরা শিক্ষামন্ত্রীর দ্বারস্থ

বাংলার শিক্ষা-পরম্পরায় সংস্কৃত ভাষার মর্যাদা ক্রমশ কমেছে। একইসঙ্গে বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে বাংলার প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা টোল বা চতুষ্পাঠী।

বিলুপ্তির পথে বাংলার প্রাচীন টোল, অস্তিত্ব রক্ষায় পণ্ডিতরা শিক্ষামন্ত্রীর দ্বারস্থ

PIC- SNS

বাংলার শিক্ষা-পরম্পরায় সংস্কৃত ভাষার মর্যাদা ক্রমশ কমেছে। একইসঙ্গে বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে বাংলার প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা টোল বা চতুষ্পাঠী। দুরবস্থার মধ্যে রয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানগুলির পণ্ডিত ও অধ্যাপকরাও। তাঁদের দাবি, গত দুই দশকে রাজ্যের পরপর দুই সরকারই এই প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা ও তার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের সমস্যার দিকে কার্যত নজর দেয়নি।

ভারত নামের সঙ্গে যেমন সনাতন ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে, তেমনই জড়িয়ে রয়েছে সংস্কৃত ভাষা। একসময় এই ভাষা ভারতীয় জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধার অনেকটাই ক্ষীণ হয়েছে। অথচ বাংলার চতুষ্পাঠী বা টোল শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীদের নাম। আজও টোলগুলিতে ছাত্রদের সংস্কৃত ব্যাকরণ, শাস্ত্র ও সনাতনী সংস্কারের শিক্ষা দেওয়া হয়।

তবে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির সংখ্যা ক্রমশ কমে এসেছে। ২০০৭ সালে যেখানে প্রায় ৯০০টি টোল ছিল, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২৩৫-এ। এই পরিস্থিতিতে ঠাকুর ওঙ্কারনাথ সীতারাম প্রতিষ্ঠিত মহামিলন মঠে কিংকর শোভন মহারাজের উদ্যোগে আয়োজিত এক সম্মেলনে যোগ দেন নিখিলবঙ্গ সংস্কৃতসেবী সমিতির শতাধিক পণ্ডিত ও অধ্যাপক।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দক্ষিণবঙ্গ শাখার সভাপতি  স্বামী নির্গুণানন্দ জানান, ‘চতুষ্পাঠী পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর চতুষ্পাঠী থেকেই সংস্কৃত কলেজ গড়ে তুলেছিলেন। বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার এক প্রাচীন পরম্পরা বহন করে এই প্রতিষ্ঠানগুলি। এখানে নানা ধরনের ব্যাকরণ ও শাস্ত্রের পাঠ দেওয়া হয়, যার এমন বিস্তৃত বিন্যাস অন্য অনেক প্রদেশে দেখা যায় না। বিদেশি আক্রমণের আগের সময় থেকে চলে আসা এই প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় শিক্ষাপদ্ধতিকে গত কয়েক বছর ধরে নীরবে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। পণ্ডিতমশাইরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে।’

সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে টোল ও তার সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপকদের সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে নতুন সরকার গঠনের পর টোলের পণ্ডিত ও অধ্যাপকরা একজোট হয়ে রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে একটি ডেপুটেশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

স্বামী নির্গুণানন্দ আরও বলেন, ‘চতুষ্পাঠীকে সমাজে কার্যত অপাংক্তেয় করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের দাবি, এই প্রাচীন সনাতনী পরম্পরাকে বাংলায় রক্ষা করা হোক এবং এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হোক। প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতেই আজকের এই সম্মেলন। সেই লক্ষ্যেই একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে এবং শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হবে। এমনকি কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর কাছেও ডেপুটেশন দেওয়া হবে। যাতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার একসঙ্গে এগিয়ে আসেন, সেই আবেদন করা হবে।’

পণ্ডিত ও অধ্যাপকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পরীক্ষা না হওয়া, প্রশাসনিক গাফিলতি, চতুষ্পাঠীগুলির পরিকাঠামোর অবনতি এবং শিক্ষকদের অপ্রতুল বেতন— সব মিলিয়ে সংস্কৃত শিক্ষার এই প্রাচীন ধারাকে অস্তিত্বের সংকটে ঠেলে দিয়েছে। তাঁদের আশা, সংস্কৃত শিক্ষা ও গবেষণার প্রসারে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ঘোষিত নীতিগুলি দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।