• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 25 August, 2026

সাত বছর পর ভারতে পা রাখছেন চিনের প্রেসিডেন্ট, ব্রিকস সম্মেলনে ৪০০ জনের প্রতিনিধি নিয়ে চমক জিনপিংয়ের

গত বছর সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (SCO) সম্মেলনের ফাঁকে চিনে গিয়ে শি জিনপিংকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং। সেই আমন্ত্রণেই সাড়া দিচ্ছেন চিনা প্রেসিডেন্ট, এমনটাই মনে করা হচ্ছে।

সাত বছর পর ভারতে পা রাখছেন চিনের প্রেসিডেন্ট, ব্রিকস সম্মেলনে ৪০০ জনের প্রতিনিধি নিয়ে চমক জিনপিংয়ের

PM Modi exchanges a handshake with Chinese President Xi Jinping at the SCO Summit (ANI)

সাত বছরের সুদীর্ঘ অবকাশ। অবশেষে অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। আগামী মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে আসছেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতীয় প্রশাসনের একাধিক আধিকারিকের বক্তব্যের নির্যাস, জিনপিংয়ের সফরসঙ্গী হতে পারেন প্রায় ৪০০ জনের এক বিশাল প্রতিনিধিদল। সংখ্যাটা তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০১৯ সালে তাঁর শেষ ভারত সফরে এই বহর ছিল দুশোরও কম।

তবে এখনই সব কিছু নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার উপায় নেই। চূড়ান্ত সফরসূচি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের রূপরেখা এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলেই সূত্রের দাবি। চিনা বিদেশ মন্ত্রকও এখনও পর্যন্ত এই সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে মুখ খোলেনি, শুধু জানিয়েছে যে ব্রিকস সহযোগিতাকে তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় এবং এবারের সভামুখ্য হিসেবে ভারতের এই আয়োজনে তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

কড়া নিরাপত্তা আর হোটেল বন্দোবস্ত

ব্রিকস সম্মেলন বসছে আগামী ১২ এবং ১৩ সেপ্টেম্বর, নয়াদিল্লিতে। জানা গিয়েছে, শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফরকে ঘিরে ইতিমধ্যেই হোটেল বুকিং এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন চিনা আধিকারিকরা। এত বড় প্রতিনিধিদলের নিরাপত্তা সামলানো নিঃসন্দেহে ভারতীয় প্রশাসনের কাছেও এক বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ব্রিকস সম্মেলনে ব্রাজিলে যাননি শি চিনফিং। ফলে এবারের সম্ভাব্য উপস্থিতি নিছক একটি বহুপাক্ষিক মঞ্চে যোগদান নয়, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। গালওয়ান সংঘর্ষের (Galwan clash) পর থেকে ধাপে ধাপে নানা ঘটনায় ভারত-চিন সম্পর্কে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে এই সফরকে।

বরফ গলার ইঙ্গিত

শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফরের ঠিক আগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল সোমবার বেজিংয়ে সাক্ষাৎ করেছেন চিনের উপরাষ্ট্রপতি হান জেংয়ের সঙ্গে। এরপর চিনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে সীমান্ত প্রশ্নে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকেও বসেছেন তিনি। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা মজবুত করাই ছিল আলোচনার মূল বিষয়।

চিনের সঙ্গে ভারতের সীমান্তের বিস্তৃতি ৩৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। সেই সীমান্তের অনেকটাই এখনও অনির্ধারিত এবং বিতর্কিত। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক টানাপড়েনে খানিকটা রাশ টানা গিয়েছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে হওয়া সেনা প্রত্যাহার চুক্তির মাধ্যমে। এবার সেই সূত্র ধরেই দুই দেশ সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় জোর দিচ্ছে। করা হচ্ছে আস্থা বাড়ানোর একাধিক পদক্ষেপ। পাশাপাশি সহজ ক্ষেত্রগুলিতে পাকাপাকিভাবে সীমানা নির্ধারণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে।

পশ্চিমবঙ্গের কাছে গুরুত্বের

ভারত-চিন সম্পর্কের এই ওঠাপড়ায় পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা নেহাত প্রান্তিক নয়। রাজ্যের শিলিগুড়ি করিডর, যা চিকেনস নেক (Chicken’s Neck) নামেও পরিচিত, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের একমাত্র স্থলসংযোগ। মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই সংকীর্ণ ভূখণ্ড বরাবরই ভারতের নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি এলাকা। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উদ্যোগে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলা ঘিরে ত্রিভুজাকার নিরাপত্তা বলয় গড়ার পরিকল্পনাও যথেষ্ট গতি পেয়েছে।

অন্যদিকে বাণিজ্যের প্রশ্নেও পশ্চিমবঙ্গ জড়িয়ে আছে এই সমীকরণে। ৬ বছর বন্ধ থাকার পর  সিকিমের নাথু লা গিরিপথ (Nathu La Pass) দিয়ে গত অগস্ট মাস থেকে ফের শুরু হয়েছে ভারত-চিন সীমান্ত বাণিজ্য, যার সঙ্গে পূর্ব ভারতের ব্যবসায়ী মহলের যোগসূত্র দীর্ঘদিনের। এছাড়া কলকাতা বন্দর দিয়ে চিন থেকে সরাসরি সাপ্তাহিক জাহাজ পরিষেবাও পূর্ব ভারতের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে দিল্লিতে শি জিনপিংয়ের সফর সফল হলে তার আঁচ কূটনীতির গণ্ডি পেরিয়ে পড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও।

নজর গোটা বিশ্বের

গত বছর সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (SCO) সম্মেলনের ফাঁকে চিনে গিয়ে শি জিনপিংকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং। সেই আমন্ত্রণেই সাড়া দিচ্ছেন চিনা প্রেসিডেন্ট, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো নেতাদের উপস্থিতিও এবারের সম্মেলনকে ঘিরে তৈরি করেছে বাড়তি কৌতূহল।

বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, সীমান্তে শান্তি এবং স্থিতিশীলতাই দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত। শি জিনপিং শেষমেশ দিল্লি আসেন কিনা এবং এলে মোদীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক কোন খাতে বয় সেদিকেই এখন তাকিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।