অবশ্য সব ধরনের ইউপিআই (UPI) লেনদেনের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন প্রযোজ্য হবে না। নির্দিষ্ট কিছু ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে নতুন করে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা MDR চালু হবে। ২,০০০ টাকার বেশি মূল্যের কোনও ব্যবসায়িক বা মার্চেন্ট পেমেন্টে ০.৪ শতাংশ হারে এই ফি ধার্য করা হবে। তবে ৭৫,০০০ টাকা বা তার বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত এই ফি নেওয়া যাবে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে—যেমন পরিবারের সদস্য বা বন্ধুকে টাকা পাঠানো—এই ফি-র আওতায় পড়বে না। একইভাবে, ২,০০০ টাকা পর্যন্ত মার্চেন্ট পেমেন্টের ক্ষেত্রেও কোনও MDR দিতে হবে না। কিছু অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবার ক্ষেত্রে অবশ্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রেলওয়ে, টেলিযোগাযোগ, বিমা এবং জ্বালানির মতো পরিষেবায় নির্দিষ্ট সীমার বেশি লেনদেন হলে ৫ টাকা করে ফি ধার্য হবে।
সরকারের বক্তব্য, এই MDR সরাসরি গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হবে না; অর্থাৎ পুরো বিষয়টি পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যেই সামঞ্জস্য করা হবে। সহজ কথায়, আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফি দেওয়ার দায় থাকবে মার্চেন্টের ওপর, গ্রাহকের ওপর নয়।
ইউপিআই (UPI) পরিচালনাকারী সংস্থা ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (NPCI)-র আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, এমনভাবে এই ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে যাতে অধিকাংশ সাধারণ ও নিয়মিত লেনদেন আগের মতোই ফি ছাড়াই চলতে পারে।সুতরাং ‘ফ্রি ইউপিআই-এর অবসান’—এই কথাটি শুনে যতটা বড় পরিবর্তন বলে মনে হতে পারে, বাস্তবে বিষয়টি ততটা নাটকীয় নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব অস্বীকার করারও উপায় নেই। কারণ এই ফি চালুর মধ্য দিয়ে ভারত প্রথমবার তার ডিজিটাল পেমেন্ট পরিকাঠামোর একটি অংশকে নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মূল্যের আওতায় আনছে। এত দিন ইচ্ছাকৃতভাবেই এই পরিকাঠামোকে প্রচলিত পেমেন্ট ব্যবস্থার অর্থনীতি থেকে অনেকটাই বাইরে রাখা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: সরকারি প্রকল্পের বাইরে মহারাষ্ট্রের বিস্মৃত মায়েদের বাস্তব ছবি
ইউপিআইকে (UPI) কখনওই শুধু আর-একটি পেমেন্ট পরিষেবা হিসেবে তৈরি করা হয়নি। এর লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের জন্য একটি সর্বজনীন ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরি করা। সেই লক্ষ্য যে অনেকটাই সফল হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ২০২৫-২৬ সালে ইউপিআই-এর মাধ্যমে ২৪,১৬২ কোটি লেনদেন হয়েছে, যার মোট মূল্য ৩১৪ লক্ষ কোটি টাকা।একজন সবজি বিক্রেতা খুব সহজেই একটি কিউআর কোড রেখে টাকা নিতে পারেন।
কোনও উবার চালককে কার্ড মেশিন রাখতে হয় না। একটি ছোট রেস্তোরাঁকেও কোনও ব্যাঙ্ক বা কার্ড নেটওয়ার্কের সঙ্গে আলাদা করে মার্চেন্ট ফি নিয়ে দর-কষাকষি করতে হয় না। অন্যদিকে, গ্রাহকরাও সঙ্গে নগদ টাকা না রেখেই সরাসরি নিজেদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা দিতে পারেন।এই সরলতাই ইউপিআইকে (UPI) মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করেছে। মাত্র পাঁচ বছরে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।
MDR থেকে যে অর্থ আসবে, তা ব্যাঙ্ক, পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। বর্তমান লেনদেনের পরিমাণ ধরে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এই নতুন আয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এর প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যাঙ্কগুলি পেতে পারে। বাকি অংশ যাবে পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী সংস্থার কাছে।এর ফলে ভারতের ইউপিআই অর্থনীতিকে গড়ে তুলতে সাহায্য করা সংস্থাগুলির সামনে এখন আরও আকর্ষণীয় আয় ও মুনাফার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ইউপিআই (UPI) নিজে একটি উন্মুক্ত পেমেন্ট নেটওয়ার্ক। কিন্তু গ্রাহকদের কাছে যে অ্যাপগুলির মাধ্যমে এই পরিষেবা পৌঁছয়, সেই বাজার মূলত কয়েকটি বড় অ্যাপ ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। বড় প্ল্যাটফর্মগুলি ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক লেনদেন পরিচালনা করে। প্রতিটি লেনদেনে MDR না পেলেও তাদের বিপুল ব্যবসায়িক পরিমাণের কারণে তারা বিশাল সংখ্যক ব্যবহারকারীর মধ্যে নিজেদের পরিচালন ব্যয় ছড়িয়ে দিতে পারে এবং উল্লেখযোগ্য মুনাফা করতে পারে। কিন্তু নতুন কোনও ছোট ফিনটেক সংস্থা বাজারে প্রবেশ করলে তার পক্ষে একই সুবিধা পাওয়া সহজ হবে না। ফলে যে ফি চালু করার উদ্দেশ্য ব্যবসাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা, সেই ফি-র কাঠামোই আবার নতুন সংস্থার বাজারে প্রবেশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরও পড়ুন: ডুবে যাওয়ার আগে ভারতের দ্বীপগুলির কথা তুলে ধরছেন সাংবাদিক
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠেছে—শেষ পর্যন্ত এই ফি-র বোঝা কি গ্রাহকের ওপর গিয়ে পড়বে? আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফি মার্চেন্টের ওপরই ধার্য হচ্ছে এবং এর পরিমাণও খুব বেশি নয়। সরকার ব্যাঙ্কগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে, মার্চেন্টরা যেন এই অতিরিক্ত খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকে না নেন।কিন্তু ভারতের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, কোনও কার্যকর নজরদারি বা প্রতিরোধের ব্যবস্থা না থাকলে এই ধরনের নির্দেশ সব সময় মেনে চলা হয় না। ব্যবসায়ীরা পেমেন্টের অতিরিক্ত খরচ পুষিয়ে নিতে পণ্যের বা পরিষেবার দাম বাড়াতে পারেন এবং কখনও কখনও সেই বাড়তি দামের সঙ্গে নিজেদের লাভের অংশও যোগ করতে পারেন।
উদাহরণস্বরূপ, কোনও ব্যবসায়ী নগদে পেমেন্ট করলে এক দাম এবং ইউপিআই-তে পেমেন্ট করলে অন্য দাম নিতে পারেন। আবার সরাসরি ইউপিআই ফি না নিয়ে ছাড়ের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারেন, অথবা পণ্যের দামে এমন সামান্য পরিবর্তন করতে পারেন, যা দেখে বোঝার উপায় থাকবে না যে তার সঙ্গে পেমেন্টের ফি-র কোনও সম্পর্ক রয়েছে।শেষ পর্যন্ত এই নতুন MDR-এর কতটা খরচ সাধারণ মানুষের ওপর এসে পড়বে, তা নির্ভর করবে এই ধরনের পদ্ধতি কতটা ব্যাপক হয়ে ওঠে তার ওপর।
এখন সরকারের সামনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। ব্যাঙ্ক এবং ফিনটেক সংস্থাগুলির জন্য তৈরি হওয়া এই নতুন আয়ের ব্যবস্থা বাস্তবে ইউপিআই পরিষেবার নিরাপত্তা বাড়াতে কতটা সাহায্য করে, সেটিও দেখতে হবে। জালিয়াতি বা প্রতারণা ঠেকানোর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা এবং ইউপিআই পরিষেবায় ধারাবাহিক নতুনত্ব আনা—এই ক্ষেত্রগুলিতে নতুন আয়ের অর্থ কতটা কাজে লাগছে, তারও মূল্যায়ন জরুরি।
ইউপিআই (UPI) ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। তাই এর অর্থনৈতিক কাঠামোয় কোনও পরিবর্তনই কেবল একটি ছোট ফি চালুর বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন, হাজার হাজার ব্যবসায়ীর স্বার্থ এবং দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। নতুন MDR ব্যবস্থা সেই বৃহত্তর বাস্তবতার মধ্যেই কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।




