• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 17 September, 2026

সংযুক্তা পরাশর: সিআরপিএপ-এর বিশেষ কমান্ডো বাহিনী কোবরার ইনস্পেক্টর জেনারেল

২০০৬ ব্যাচের আসাম-মেঘালয় ক্যাডারের এই আইপিএস কর্মকর্তা কোবরার নেতৃত্বে আসা প্রথম মহিলা

সংযুক্তা পরাশর: সিআরপিএপ-এর বিশেষ কমান্ডো বাহিনী কোবরার ইনস্পেক্টর জেনারেল

Image: FB/sanjukta.parashar

কোনও একটি পদে প্রথম মহিলা হিসেবে নিযুক্ত হওয়া নিছক একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। তার সঙ্গে বদলে যায় একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ধারণা, কাজের সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। সংযুক্তা পরাশরের সিআরপিএপ-এর বিশেষ কমান্ডো বাহিনী কোবরা (CoBRA)-র ইনস্পেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ তাই এই অর্থে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০০৬ ব্যাচের আসাম-মেঘালয় ক্যাডারের এই আইপিএস কর্মকর্তা কোবরার নেতৃত্বে আসা প্রথম মহিলা।

কোবরা সাধারণ কোনও পুলিশ বাহিনী নয়। জঙ্গল ও দুর্গম এলাকায় সশস্ত্র সংঘাত মোকাবিলা, দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন ভূখণ্ডে অভিযান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপারেশন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া— এই বাহিনীর কাজের মধ্যে পড়ে। সিআরপিএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ সাল থেকে কোবরাকে মূলত জঙ্গল ও গেরিলা যুদ্ধের পরিবেশে উগ্রপন্থা ও সশস্ত্র বিদ্রোহ মোকাবিলার জন্য গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে এই বাহিনীর দশটি ব্যাটালিয়ন রয়েছে।

এমন একটি বিশেষ বাহিনীর নেতৃত্বে একজন মহিলা অফিসারের আসা তাই নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংযুক্তা পরাশরের পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধুমাত্র তিনি একজন মহিলা নন, তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাই এই নিয়োগকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। আসামে তাঁর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ড পোস্টিং ছিল। উগ্রপন্থা-প্রবণ এলাকায় কাজ করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযানের অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। পরে তিনি জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ-তেও কাজ করেছেন।

এই অভিজ্ঞতার সমন্বয় কোবরার মতো বাহিনীর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে মূল্যবান। কারণ আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শুধু অস্ত্র হাতে সাহসী হওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন তথ্য বিশ্লেষণ, পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা। সংযুক্তা পরাশরের কর্মজীবনে এই অভিজ্ঞতাগুলির একাধিক দিকই রয়েছে।

তাঁকে ‘আয়রন লেডি অব আসাম’ বলা হয়। এই পরিচিতি এসেছে মূলত আসামে তাঁর ফিল্ড-অভিজ্ঞতা এবং উগ্রপন্থা মোকাবিলায় ভূমিকার সূত্রে। কিন্তু একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে শুধুমাত্র তাঁর কঠোরতার পরিচয়ে বিচার না করে তাঁর পেশাগত দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং দীর্ঘদিনের কাজের ভিত্তিতে দেখা উচিত। সংযুক্তা পরাশরের ক্ষেত্রেও সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আর একটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দ্রপ্রস্থ কলেজ ফর উইমেন-এ রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার পর তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং মার্কিন বিদেশনীতি নিয়ে এমফিল ও পিএইচডি করেন। অর্থাৎ তাঁর শিক্ষাজীবন এবং পেশাজীবন— দুই ক্ষেত্রেই রয়েছে বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি।

আজ দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মহিলাদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু অংশগ্রহণের পাশাপাশি নেতৃত্বের স্তরেও তাঁদের উপস্থিতি জরুরি। কারণ কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ তখনই অর্থবহ হয়, যখন যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্বের সর্বোচ্চ স্তরেও পৌঁছনোর পথ খোলা থাকে। কোবরার মতো একটি কঠিন ও বিশেষ বাহিনীর নেতৃত্বে সংযুক্তা পরাশরের নিয়োগ সেই পথটিকে আরও উজ্জ্বল করে তুলল।

এই ঘটনাকে তাই শুধু ‘একজন মহিলা অফিসারের সাফল্য’ হিসেবে দেখলে তার তাৎপর্য কিছুটা কমিয়ে দেখা হবে। এটি ভারতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যোগ্যতা ও নেতৃত্বের ধারণারও একটি পরিবর্তিত ছবি। আগামী দিনে আরও বহু তরুণী যদি পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে তাঁদের কর্মজীবনের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন, তবে এই ধরনের দৃষ্টান্ত তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।

সংযুক্তা পরাশরের সামনে অবশ্যই কঠিন দায়িত্ব। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ সেই দায়িত্ব পালনের একটি শক্ত ভিত তৈরি করেছে। তাঁর নতুন পদে সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হবে না; তা আরও একটি বার্তা দেবে— দেশের নিরাপত্তার মতো কঠিন ক্ষেত্রেও নেতৃত্বের মাপকাঠি হওয়া উচিত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ ও যোগ্যতা; লিঙ্গপরিচয় নয়। এই পরিবর্তনই হয়তো আজকের ভারতের সবচেয়ে ইতিবাচক ছবিগুলির একটি।