২০২৬ সালের কলকাতা। নন্দনের প্রেক্ষাগৃহে পিনপতন নীরবতার পর হঠাৎই যেন এক তীব্র আলোড়ন। বিশাল রূপোলি পর্দা জুড়ে তখন ঋত্বিক চক্রবর্তী (Ritwik Chakraborry) অভিনীত সব্যসাচী সেন দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর কণ্ঠে প্রত্যয়ী উচ্চারণ— “মানুষের জীবনের যদি কোনও পবিত্র কর্তব্য থেকে থাকে, সেটা হচ্ছে কমিউনিস্ট হওয়া!” মুহূর্তের মধ্যে গর্জে ওঠে গোটা প্রেক্ষাগৃহ, হাততালির জোয়ারে ফেটে পড়ে চারপাশ।
এই যে নিঃশর্ত করতালি, এর সিংহভাগ অনায়াসেই প্রাপ্য পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের (Srijit Mukhopadhyay)। কারণ, ২০০২ সালে নাট্যকার ব্রাত্য বসুর কলমে জন্ম নেওয়া ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ (Winkal Twinkal) শুধু একটি নাটক ছিল না, তা ছিল একুশ শতকের সূচনাপর্বে দাঁড়িয়ে বাংলা থিয়েটারের সবচেয়ে আলোড়নকারী রাজনৈতিক দলিল। সেই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল সম্পদকে সেলুলয়েডের ফ্রেমে বন্দি করা যে কতটা দুঃসাহসিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, তা সিনেমাবোদ্ধা মাত্রই জানেন। চিত্রনাট্যের চলনে কিছু সিনেম্যাটিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, মঞ্চের সেই টানটান রাজনীতিকে সিনেমার অন্দরে অনুবাদ করার এই সাহসী পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে গভীর কুর্নিশ দাবি করে।

ওয়াশিংটন আরভিং-এর সেই সুপরিচিত চরিত্র রিপ ভ্যান উইঙ্কল (Winkal Twinkal) যেমন দীর্ঘ ঘুম ভেঙে উঠে চেনা পরিচিত পৃথিবীকে আর চিনতে পারেনি, সব্যসাচী সেনও যেন সেই নিয়তিরই শিকার। জরুরি অবস্থার সময় পুলিশের তাড়া খেয়ে আত্মগোপন করা এক আদর্শবাদী যুবক যখন দীর্ঘ ছাব্বিশ বছরের এক গভীর ঘুমের শেষে চোখ মেলেন, ততদিনে ক্যালেন্ডারের পাতায় গলে গিয়েছে একটা আস্ত প্রজন্ম। সত্তরের রক্তাক্ত আন্দোলনের উত্তাপ পেরিয়ে পৃথিবী তখন এসে দাঁড়িয়েছে এক আপাত ঝকঝকে কিন্তু শিকড়হীন ‘পোস্ট-আইডিওলজি’ বা মতাদর্শহীন ভোগবাদী যুগে।
আরও পড়ুন: ‘অরুণ’ আলোয় অজানা উত্তম
ছাব্বিশ বছর সময়ে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি আর মানুষের বিশ্বাস সব বদলে গেছে। কলকাতার দেওয়ালে অচেনা স্লোগান, মানুষের হাতে মোবাইল ফোন আর চারপাশের বাতাসে বাজার অর্থনীতির সর্বগ্রাসী দাপট। কিন্তু আশ্চর্য এই— সব্যসাচীর ভেতরের বিশ্বাস আর আদর্শ আজও মৃত্যুহীন, অমলিন। আর ঠিক এই তীব্র দ্বন্দ্বের জায়গাতেই জ্বলে ওঠেন অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী।

এই অচেনা, বেখাপ্পা ও আপোসের সময়ে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে বোঝাপড়া করার যে ট্র্যাজেডি— নিজেকে অদ্ভুতভাবে ‘মিসফিট’ ও অনাবশ্যক মনে হওয়ার যে নিঃশব্দ হাহাকার— তা ঋত্বিক তাঁর সূক্ষ্ম অভিব্যক্তিতে মূর্ত করে তুলেছেন। আশা আর নিরাশার দোলাচল, রাগ আর গভীর একাকিত্বের আলো-আঁধারি খেলা করে তাঁর চোখ ও মুখের পেশিতে। সবচেয়ে বড় স্বস্তি, মঞ্চে সব্যসাচী চরিত্রে দেবশঙ্কর হালদারের যে ঐতিহাসিক ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ উপস্থিতি ছিল, পর্দায় ঋত্বিককে দেখতে গিয়ে দর্শক সেই পূর্বস্মৃতির ছায়া দ্বারা তাড়িত হন না। ঋত্বিক সম্পূর্ণ নিজস্ব আন্ডারপ্লে ও সাবলীল অভিব্যক্তিতে চরিত্রটিকে সেলুলয়েডের উপযুক্ত রক্তমাংসের রূপ দিয়েছেন।
তবে পরিচালকের চমৎকার মুন্সিয়ানা প্রকাশ পেয়েছে রাজলক্ষ্মী চরিত্রটির উপস্থাপনায়। ২০০২-এর বয়সের ভারে ক্লান্ত অথচ দৃঢ় রাজলক্ষ্মীর ভূমিকায় অনসূয়া মজুমদার এবং ১৯৭৬-এর রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার মতো ফুটে থাকা তরুণী বাম রাজনৈতিক কর্মী রাজলক্ষ্মীর ভূমিকায় সোহিনী সরকারকে সৃজিত একই ফ্রেমে মিলিয়ে দিয়েছেন ম্যাজিক্যাল এক বয়ানে। অতীত ও বর্তমানের এই সহাবস্থান টাইম অ্যান্ড স্পেসের এক অদ্ভুত হ্যালুসিনেশন তৈরি করে। একই ঘরের দেওয়ালে প্রজেকশন ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে যখন সব্যসাচীর অতীতের স্মৃতি ভেসে ওঠে, তখন দ্বিমাত্রিক পর্দা যেন স্মৃতি ও বাস্তবতার এক ত্রিমাত্রিক মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস হয়ে ওঠে।
এর বিপরীতে বড় বেশি খটকা লাগে ইন্দ্র চরিত্রটিতে। সত্তরের আদর্শবাদী বাবার সামনে একুশ শতকের ক্ষমতালোভী, নীতিহীন ও সুবিধাবাদী নব্য শাসকদলের ক্যাডার হিসেবে ইন্দ্রর যে চরিত্রায়ণ, তাতে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় তাঁর নিজজ্ব “শহুরে বুদ্ধিজীবী” ব্যাগেজ ঝেড়ে ফেলার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তৎসত্ত্বেও তিনি পরিশীলিত ও ফ্ল্যাট। মঞ্চে একই চরিত্রে রজতাভ দত্তর অভিনয়ে যে এক ধরনের লুম্পেনসুলভ নির্লজ্জতা, তীব্র ধার আর ক্ষমতার আদিম লোভের ব্লান্ট এক্সপ্রেশন ছিল— পরমব্রতর মধ্যে সেই কদর্য বাস্তবতা ঠিক খুঁজে পাওয়া যায় না। চরিত্রটির যে বিপজ্জনক রাজনৈতিক ঔদ্ধত্য থাকা দরকার ছিল, তা পর্দার পরিশীলনে অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।
মূল নাটকে আরেকটি অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল রাজেন। সত্তরের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ের নকশালপন্থী তরুণ, পুলিশের নির্মম অত্যাচারে যার পা চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। নাটকে রাজেন চরিত্রে শ্যামল চক্রবর্তীর অভিনয় ছিল কার্যত এক কিংবদন্তিতম দৃষ্টান্ত। স্বাভাবিকভাবেই সিনেমাপ্রেমীদের মনে গভীর সংশয় ছিল— সেলুলয়েডে রাজেন হিসেবে কাকে ভাববেন পরিচালক? কিন্তু পর্দায় যখন সত্রাজিৎ সরকারের রাজেন আবির্ভূত হন, সংশয় কেটে গিয়ে জন্ম নেয় মুগ্ধতা। মঞ্চের সেই তীব্র শারীরিকতা ও অন্তর্ভেদী যন্ত্রণাকে সিনেমার সূক্ষ্মতায় রূপ দেওয়ার কঠিন পরীক্ষায় সত্রাজিৎ অসামান্য দক্ষতায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

বিশেষত, সব্যসাচী ও রাজেনের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যটি— যেখানে ফেলে আসা আদর্শ, বর্তমানের রূঢ় বাস্তবতা এবং গভীর ক্ষোভের লেনদেন ঘটে— তা বিষয়বস্তুর দিক থেকে প্রচণ্ড ভারী হওয়া সত্ত্বেও পর্দায় অনবদ্য ও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। দুই শক্তিশালী অভিনেতার সংলাপের তীব্র রসায়ন প্রেক্ষাগৃহে বারবার স্বতঃস্ফূর্ত করতালির জন্ম দেয়। পাশাপাশি শিক্ষিত এবং সুবিধাবাদী নেতার চরিত্রে দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতি দৃশ্যগুলোকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলেছে।তবে চিত্রনাট্য ও মেটাফোর নির্মাণের ক্ষেত্রে কিছু জায়গায় প্রশ্ন থেকেই যায়। নাগরদোলায় বসে মতাদর্শের পর্যালোচনার দৃশ্যটি রূপক হিসেবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও, লেনিন ও স্তালিনের সামনে দাঁড়িয়ে সব্যসাচীর ললিপপ খাওয়ার পরাবাস্তব মুহূর্তটিকে কী বলা চলে?
আরও পড়ুন: বিশু পাগলেরা ফিরে ফিরে আসে
আজীবন মতাদর্শে অবিচল থাকা এক খাঁটি বামপন্থী সব্যসাচীর দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তত, এই ললিপপ খাওয়ার দৃশ্যটি কি পরিচালকের এক ধরনের আরোপিত ‘বিচ্যুতি’ নয়? এটি আখ্যানের নিজস্ব গভীরতা ও গাম্ভীর্যকে এক লহমায় অনেকটাই লঘু করে দেয়। ঠিক যেমন ২০০২ সালের পটভূমিতে ২০২৬ সাল সূলভ স্টুডিও য় বসে সব্যসাচীর সাক্ষাৎকার নেবার দৃশ্য। দৃশ্যটিতে কি কোন আন্ডারটোন স্যাটায়ার ব্যবহার করে ‘দু মিডিয়া’কেই উপহাস করতে চেয়েছেন পরিচালক? কিছুটা অসঙ্গতি চোখে পড়ে সঙ্গীত নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। ২০০২ সালে দাঁড়িয়ে রাজলক্ষ্মী যখন দীর্ঘদিনের অবচেতন স্বামীকে নতুন দিনের গান হিসেবে ক্যাসেট প্লেয়ারে শ্রেয়া ঘোষালের গান শোনান, তখন দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। ওই নির্দিষ্ট সময়ে যেখানে সুমন, মৌসুমী ভৌমিক ও তাঁদের অনুসারী শিল্পীরা বাংলা গানের ভাষা বদলে দিচ্ছিলেন, সেখানে একজন আদর্শবাদী দম্পতির
দৃশ্যায়নে শ্রেয়া ঘোষালের মেলোডি কি শুধুই ছবির বাণিজ্যিক সফলতার স্বার্থে ?পাশাপাশি বলতেই হবে, “না থাকা প্রিয়” গানটি এই ছবির অহঙ্কার। ঠিক যেমন সলিল চৌধুরীর গানে রক্ত দৌড়ে আসে সত্তরের দিনগুলোর দৃশ্যায়নে। রীতিমত মুগ্ধ করেছে ছবির ভিজ্যুয়াল টোন ও সিনেমাটোগ্রাফি। চিত্রগ্রাহক ইন্দ্রনাথ মারিকের ক্যামেরার কাজ ছবির অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড। বিশেষত ১৯৭৬ সালের উত্তাল দিনগুলোকে ফ্রেমবন্দি করার ক্ষেত্রে সেপিয়া টোনের পাশাপাশি বিপ্লব ও সন্ত্রাসের প্রতীক হিসেবে রক্তের মতো গাঢ় লাল রঙের যে কনট্রাস্ট ব্যবহার করা হয়েছে, তা দর্শককে সরাসরি সেই রক্তাক্ত দশকের শ্বাসরোধকারী উত্তাপের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। আবার ২০০২-এর সময়কালকে তুলে ধরা হয়েছে এক রুক্ষ, বিবর্ণ ও যান্ত্রিক আলো-ছায়ার বিন্যাসে।

ছবির (Winkal Twinkal) শেষ দৃশ্যে যখন সব্যসাচীর দিকে নিজের ছেলের পিস্তলের নল উদ্যত হয়, তখন বাতাসে গমগম করে বেজে ওঠে ‘কারার ওই লৌহকপাট’। কিন্তু সব্যসাচী মরে যান না, সময়ের আবর্ত পেরিয়ে তিনি হারিয়ে যান এবং রূপক হয়ে ফিরে আসেন বর্তমানের বুকে। এই অন্তিম বাঁকেই পরিচালক স্পষ্ট করে দেন তাঁর আসল বার্তা— বাজার অর্থনীতি আর ভোগবাদ যতই জয়ঢাক বাজাক না কেন, খাঁটি মতাদর্শের আসলে কোনো বিনাশ নেই। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ (Winkal Twinkal)-এর চলচ্চিত্র রূপান্তর মূলত এক নির্মম আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় আজকের সময়কে।
যেখানে একদা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা প্রজন্মকে আজ ‘অপ্রাসঙ্গিক’ তকমা দিয়ে দেউলিয়া বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে সব্যসাচী বা রাজেনের উপস্থিতি চ্যালেঞ্জ ছোঁড়ে রাজেনের মতো রাজনৈতিক সুবিধাবাদী আপাদমস্তক রাজনৈতিক নেতাদের। মুখের উপর তুষার রায়ের কবিতা আউড়ে বলে, “বিপ্লব যবে শুরু হয়েছিল তুমি ছিলে পুরো ভাগে/ ধর পাকড়ের মাহেন্দ্রক্ষণে তুমিই ভেগেছ আগে”! মনে করিয়ে দেয়— ইতিহাসকে এত সহজে মুছে ফেলা যায় না। মঞ্চ থেকে সেলুলয়েডে এসে এই আখ্যান তাই কোনো নস্টালজিক অতীত রোমন্থন নয়, বরং আপোসহীন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক তীব্র রাজনৈতিক আত্মজিজ্ঞাসা।
দেখুন: ৭৬তম জন্মদিনে মোদির জন্য ভাদনগরে আরতি, হাজির অমিত শাহ




