• facebook
  • twitter
Saturday, 24 January, 2026

কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে বিভ্রান্ত করতে আইএসআই-এর নতুন কৌশল

প্রতারণাকেই নীতি বানিয়েছে লস্কর, সতর্ক ভারতীয় গোয়েন্দারা

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ধাক্কায় কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ার পর ফের মাথা তুলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে লস্কর-ই-তইবা। গত কয়েক মাস ধরে গোয়েন্দা সংস্থাগুলির হাতে যে তথ্য উঠে আসছে, তাতে স্পষ্ট, এই জঙ্গি সংগঠন এখন সরাসরি হামলার পাশাপাশি ‘প্রতারণা’কেই কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের মূল লক্ষ্য একটাই, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে বিভ্রান্ত করা, ভুল পথে চালিত করা এবং নজর ঘুরিয়ে দেওয়া।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরেই লস্কর-ই-তইবা এবং জইশ-ই-মুহাম্মদের মতো সংগঠনগুলির মধ্যে হতাশা, দিশাহীনতা ও যুবসমাজে প্রভাব কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগের মতো ‘আকর্ষণ’ তৈরি করতে না পারায় তারা এখন কৌশল বদলাচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে নারী শাখা তৈরি করা হবে, আবার কখনও প্রচার চালানো হচ্ছে শিশুদের নিয়োগ করে ছোট বয়স থেকেই ‘প্রশিক্ষণ’ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা। উদ্দেশ্য একটাই— ভয়, বিভ্রান্তি আর আতঙ্কের আবহ তৈরি করা।

Advertisement

সাম্প্রতিক সময়ে লস্কর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে সমুদ্রপথে হামলার প্রশিক্ষণের উপর। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পাকিস্তানের মার্কাজ-ই-মুসলিম লিগকে, যা জামাত-উদ-দাওয়ার রাজনৈতিক শাখা। জামাত-উদ-দাওয়া আবার লস্কর-ই-তইবার অর্থনৈতিক জোগানদার সংগঠন হিসেবে পরিচিত। যে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল মুম্বইয়ের ২৬/১১ হামলার ভয়াবহ অধ্যায়।

Advertisement

একজন ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো আধিকারিকের বক্তব্য, ‘লস্কর-ই-তইবা যে এই ধরনের কার্যকলাপে যুক্ত, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে তারা যে মাত্রায় এই কাজ করা হচ্ছে বলে দাবি করছে, বাস্তবে ততটা নয়। এগুলো আসলে আইএসআই-এর মাইন্ড গেমপ্ল্যান— ভারতীয় গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করার কৌশল।’ তাঁর কথায়, ‘ভিডিও ছড়ানো, বড় বড় ঘোষণা করা— এগুলো সবই মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির কৌশল। বিভ্রান্তি তৈরি করাই আসল উদ্দেশ্য।’

গোয়েন্দাদের মতে, লস্কর সমুদ্রপথে হামলা চালাতে সক্ষম— মুম্বইয়ের ঘটনায় তার প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এত বড় পরিসরে সেই ধরনের অভিযান চালানোর মতো সংগঠিত শক্তি তাদের নেই। আইএসআই অর্থ ও রসদ জুগিয়ে গেলেও কাজ হচ্ছে গোপনে, ছোট পরিসরে। কারণ তারা জানে, বড় আকারে সক্রিয় হলে ফের ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর কড়া আঘাত নেমে আসবে।

বর্তমানে তারা দুটি বিষয়ে জোর দিচ্ছে— এক, নিয়োগ ও দুই, অনুপ্রবেশ। বর্তমানে সীমান্তে কড়া নিরাপত্তার কারণে অনুপ্রবেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নিয়োগের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। যুবসমাজকে সরাসরি জঙ্গিবাদে টানতে না পেরে ভুয়ো ব্যানার, ভুয়ো সংগঠনের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, সমুদ্রপথে প্রশিক্ষণের নামে পাকিস্তান জুড়ে পোস্টার দেওয়া হয়েছিল ‘জল উদ্ধার’ ও ‘সাঁতার প্রশিক্ষণ’-এর বিজ্ঞাপন দিয়ে। ভুয়ো সংগঠনের নামে এই পোস্টার দেখে বহু যুবক সেখানে পৌঁছয়। পরে ধীরে ধীরে বোঝে আসল উদ্দেশ্য। কেউ থেকে যায়, কেউ আবার ফিরে আসে।

এর পাশাপাশি লস্কর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ভুয়ো ভিডিও তৈরি করছে। বাস্তবে যেখানে ১০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, সেখানে ভিডিওতে দেখানো হচ্ছে ১০০ জন। উদ্দেশ্য একটাই, নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরা, ভীতির সঞ্চার করা এবং যুবসমাজকে আকৃষ্ট করা। এক শীর্ষ আধিকারিকের স্পষ্ট বক্তব্য, ‘আমরা জানি লস্করের অনেক কথাই বাড়াবাড়ি প্রচার। তবুও কোনও কিছুই হালকাভাবে নেওয়া হবে না। প্রতিটি তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

সব মিলিয়ে, লস্কর-ই-তইবার বর্তমান কৌশল স্পষ্ট— বাস্তব শক্তির চেয়ে বেশি ‘প্রচার’, বাস্তব প্রস্তুতির চেয়ে বেশি ‘ভয় তৈরি’। কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি এই প্রতারণার খেলায় পা দিচ্ছে না। নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাই এখন তাদের প্রধান হাতিয়ার।

Advertisement