• facebook
  • twitter
Tuesday, 10 March, 2026

ভোটার বিতর্কে শেষ দিনে ধরনা মঞ্চে ক্যানভাসে প্রতিবাদ মমতার

‘ভ্যানিশ কুমার’ লিখে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে কটাক্ষ

ক্যানভাসে প্রতিবাদ মমতার

ধর্মতলার ধরনা মঞ্চে প্রতিবাদের অভিনব অস্ত্র লক্ষ্য করা গেল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। বিবেচনাধীন ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিতর্ক ঘিরে সরব হয়ে তিনি এ দিন হাতে তুলে নেন রং-তুলি। ক্যানভাসে আঁকলেন ছবি। সেখানে বড় করে লেখা ছিল ‘এসআইআর’। তার পাশে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে কটাক্ষ করে তিনি লিখলেন ‘ভ্যানিশ কুমার’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এই ছবির মধ্য দিয়ে তিনি একটি প্রতীকী বার্তা দিতে চেয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘এই ছবিটা প্রতীকী। আমাদের শিল্পীরাও আঁকছেন। এসআইআরে যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ যাঁদের নাম তালিকা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে, সেই সব ডেডবডি ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবেই দু’টি মালা রাখা হয়েছে। যাঁরা মারা গিয়েছেন তাঁদের উদ্দেশে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে মালা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অন্য কোনও অর্থ খোঁজার দরকার নেই।’

ধর্মতলার ধরনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি কেন্দ্রীয় শাসক দলকে তীব্র আক্রমণ করেন। মমতা বলেন, ‘ভিতুর দল, কাপুরুষের দল। মানুষের সমর্থন নেই বলেই মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে। মানুষ পাশে নেই বলেই এই সব চেষ্টা চলছে।’ ধরনা মঞ্চে এ দিন মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি বড় মিছিল পৌঁছয়। তাঁদের স্বাগত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মতুয়া, রাজবংশী, হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান— সকল বৈধ ভোটারের জন্য আমরা ভোটাধিকার চাই। যে কোনও নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া চলবে না।’

Advertisement

ভোটার তালিকা সংক্রান্ত মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গেলেও বিষয়টি শেষ হয়ে যাবে না। সুপ্রিম কোর্টের হাতে এখনও মামলা রয়েছে। আমার পিটিশনও বিচারাধীন। যদি কারও নাম বাদ যায়, তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন।’ তিনি জানান, আগামী ২৫ তারিখ মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হতে পারে।

Advertisement

এ দিন কেন্দ্রের অর্থনৈতিক নীতিকেও নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গ্যাসের দাম লাগাতার বাড়ছে। আগে গ্যাসের দাম ছিল অনেক কম। এখন ছোট সিলিন্ডার ১১০০ টাকা, বড় সিলিন্ডার ২১০০ টাকা। সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবছে না।’ তাঁর অভিযোগ, জনগণের সমস্যার সমাধান না করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।

মমতা আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের বিপুল ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তিনি দাবি করেন, সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য তাঁর লড়াই চলবে। তিনি অভিযোগ করেন, ভোটের আগে মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে কেনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘কাউকে কাউকে টাকা দিয়ে কিনে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। লোকে যখন জেনে যায় কেউ টাকা নিয়েছে, সেটি কিন্তু চাপা থাকে না। মানুষের কাছে তখন চিরকালের মতো গদ্দার হয়ে পরিচিত থাকতে হয়। কেন এই বদনাম নেবেন? সম্মানের সঙ্গে বাঁচুন। আমাদেরও যদি কাউকে কেনার চেষ্টা করে, আমরা কিন্তু নজর রাখব। সেটির সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন।’ এদিন রাজ্যের কৃষকদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকার ইতিমধ্যেই ন্যায্যমূল্যে আলু কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। পাশাপাশি ধান সংগ্রহ ও বিনামূল্যে চাল দেওয়ার কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

পাঁচ দিন ধরে চলা ধরনা প্রসঙ্গে মঙ্গলবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাব মেনে আপাতত ধরনা তুলে নেওয়ার ঘোষণা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘অনেকটাই বিচার পাওয়া গিয়েছে। সেই কারণেই আপাতত ধরনা তুলে নেওয়া যেতে পারে।’ উপস্থিত কর্মী-সমর্থকেরাও এতে সম্মতি জানান। ধরনা তুলে নেওয়ার ঘোষণা করার পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি প্রাক্তন রাজ্যপালের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাবেন। তাঁর কথায়, ‘যাঁর সঙ্গে অবিচার হয়েছে বলে আমরা মনে করি, তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করা আমাদের কর্তব্য।’

প্রসঙ্গত, এ দিন ধর্নামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেন, আদালত নির্বাচন কমিশনকে ভর্ৎসনা করেছে। ভোটারদের আবেদন জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। তাঁর মতে, ‘এটি গণতন্ত্রের জয়।’

এদিন ধর্মতলার মঞ্চে বিভিন্ন সমাজের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। ব্রাহ্মণ সমাজ, বিহারি সমাজ এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা মুখ্যমন্ত্রীর আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। এশিয়াডের সোনাজয়ী ক্রীড়াবিদ স্বপ্না বর্মণও মঞ্চে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য এই আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, অতীতের সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের স্মৃতি তাঁর মনে রয়েছে। সেই আন্দোলনের মঞ্চ থেকেই তৃণমূলের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, ‘ইতিহাস বার বার ফিরে আসে। মানুষের অধিকারের লড়াই কখনও শেষ হয় না।’ শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি কবিতা পাঠ করেন কবি সুবোধ সরকার। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য রাস্তায় নেমে লড়াই করার সাহসই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আলাদা করে।’

Advertisement