• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 3 July, 2026

সরকারের সমালোচনা করলেই কি ঘরছাড়া হতে হবে? প্রতিবাদের অধিকারে স্বীকতি দিয়ে প্রশাসনকে তুলোধনা হাইকোর্টের

সরকারবিরোধী প্রতিবাদ করা সাংবিধানিক অধিকার, স্পষ্ট জানিয়ে মুম্বই পুলিশকে তুলোধনা বম্বে হাইকোর্ট। জানুন গোটা মামলা ও রায়ের তাৎপর্য।

সরকারের সমালোচনা করলেই কি ঘরছাড়া হতে হবে? প্রতিবাদের অধিকারে স্বীকতি দিয়ে প্রশাসনকে তুলোধনা হাইকোর্টের

Right To Protest (Magnific)

সরকারের কোনও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা বা তার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া কি অপরাধ? এই প্রশ্নেই এবার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় রায় দিল বম্বে হাইকোর্ট (Bombay High Court)। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, প্রতিবাদ করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার (Constitutional Right)। আর সেই অধিকার প্রয়োগ করার জন্য কাউকে তার নিজের শহর থেকে বিতাড়িত করা বা এক্সটার্নমেন্ট (Externment) করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। মুম্বই পুলিশের একটি বিতর্কিত নির্দেশ খারিজ করে দিয়ে বিচারপতি মাধব জামদার এই মন্তব্য করেছেন।

ঠিক কী ঘটেছিল?

সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়ার (SDPI) রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহমেদ আবদুল ওয়াহিদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর এক বছরের জন্য এক্সটার্নমেন্ট নির্দেশ জারি করেছিল মুম্বই পুলিশের চেম্বুর জোনের ডেপুটি কমিশনার। পরে চলতি বছরের মার্চ মাসে সেই নির্দেশ বহাল রাখে কোঙ্কন বিভাগীয় কমিশনারও।

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC), বাবরি মসজিদ ও জ্ঞানবাপী মসজিদ ইস্যুতে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর (FIR) দায়ের হয়েছিল। যার প্রায় প্রতিটিই ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ১৮৮ ধারায়, অর্থাৎ পুলিশের অনুমতি ছাড়া বিক্ষোভ বা জমায়েত করার অভিযোগে। সেই সূত্র ধরেই তাঁকে শহর ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পুলিশ জনগণের সেবক

এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন ওই নেতা। শুনানির সময় রীতিমতো ক্ষুব্ধ ও তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি মাধব জামদার। তাঁর পর্যবেক্ষণ, পুলিশের গোটা প্রক্রিয়াটিই ত্রুটিপূর্ণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিচারপতির কথায়, প্রতিবাদ করা নাগরিকের অধিকার। সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্লোগান দিলেই কেন এক্সটার্নমেন্টের নির্দেশ জারি করতে হবে?

বিচারপতি পুলিশকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, পুলিশ জনগণের সেবক, কোনও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্তার আজ্ঞাবহ নয়। সাম্প্রতিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রসঙ্গ টেনেও তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারি ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নাগরিকরা কেন প্রতিবাদ করতে পারবেন না?

কেন এই রায় তাৎপর্যপূর্ণ?

মহারাষ্ট্রের মামলা হলেও, বম্বে হাইকোর্টের এই রায়ের প্রভাব ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যাপক। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন বেশ উত্তপ্ত। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের হেনস্থা কিংবা প্রশাসনিক বাড়াবাড়ি নিয়ে একাধিক অভিযোগ ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) চৌকাঠে পৌঁছেছে।

আইনজ্ঞদের একাংশের মতে, বম্বে হাইকোর্টের এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারবিভাগীয় নজির (Judicial Precedent) হয়ে থাকবে। যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সরকারবিরোধী স্লোগান বা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কোনওভাবেই প্রশাসনিক কড়া পদক্ষেপ বা ঘরছাড়া হওয়ার কারণ হতে পারে না। স্বভাবতই ভবিষ্যতে এ রাজ্যের কোনও নাগরিক বা বিরোধী নেতা অনুরূপ হেনস্থার শিকার হলে, এই রায়কে হাতিয়ার করেই তাঁরা আইনি লড়াইয়ে নামতে পারেন।

সংবিধানের ১৪ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের সুরক্ষা

হাইকোর্টের রায়ে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এক্সটার্নমেন্টের মতো পদক্ষেপ সংবিধানের ১৪ (সমতার অধিকার) ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) অনুযায়ী প্রাপ্ত বাকস্বাধীনতা (Freedom of Speech) ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারকে সরাসরি লঙ্ঘন করে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশ যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত, তা আরও একবার এই রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো।