• facebook
  • twitter
Friday, 9 January, 2026

উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা

ছত্তিশগড়, উত্তর প্রদেশ, আসাম-সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে খ্রিস্টানদের উপর চলল ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা

সুকান্ত পাল: ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর অর্থাৎ বড়দিন হিসাবে পরিচিত এই দিনটি ভারতের রাষ্ট্রীয় সামাজিক জীবনে একটি কালো দিন হিসাবে চিহ্নিত করে দিল উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। পৃথিবীর সবাই জানে এই দিনে মহামানব যীশুখ্রিস্টের মর্তে আবির্ভাবের দিন।। এই দিনটি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কাছে একটি পবিত্র দিন। সমগ্র পৃথিবীর খ্রিস্টান সম্প্রদায় এই দিনটিতে তাদের আরাধ্য প্রভু যীশুখ্রিস্টের আরাধনায় মগ্ন হন।

বর্তমানে পৃথিবীর সব দেশের মানুষই যেহেতু গ্রেগারিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণ করে বছরের হিসাব করেন সেহেতু এই দিনটি বিভিন্ন দেশে খ্রিস্টানদের সঙ্গে সবাই বড়দিন ছুটির দিন হিসেবে পালন করেন এবং আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। অথচ আমরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম ভারতের বর্তমান বিজেপিশাসিত আমলে এক ভয়ঙ্কর অসহিষ্ণুতার চিত্র।

Advertisement

শান্তি, সৌভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের বার্তা বহনকারী বড়দিনের উৎসবে এক অসহিষ্ণুতার ভয়াবহ চিত্র দেখে সাধারণ মানুষ শিউরে উঠলেন। ছত্তিশগড়, উত্তর প্রদেশ, আসাম-সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে খ্রিস্টানদের উপর চলল ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর পরিকল্পিত হামলা এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উৎসবে বাধা দান ভারতের তথাকথিত এবং বহু চর্চিত ধর্মনিরপেক্ষতার কাঠামোর উপর এক গভীর আঘাত নামিয়ে নিয়ে এলো।

Advertisement

ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুরের বিভিন্ন স্থানে বড়দিনে উৎসব চলাকালীন বিভিন্ন হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা অনুষ্ঠান স্থলের মঞ্চ সাজসজ্জা সব ভেঙেচুরে নষ্ট করে দেয়। এমনকি ক্রিসমাস ট্রি উপড়ে ফেলে। শুধু তাই নয়, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী মানুষজনদের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য হুমকি দেয় এবং তাদের অনুষ্ঠানের জায়গা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্যও করে।

আসামের নলবাড়ী জেলার পানিগাঁও গ্রামে একটি খ্রিস্টান স্কুলে বড়দিনের উৎসবে হামলা করা হয়। এই হামলায় নেতৃত্ব দেয় বজরং দল এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা অনুষ্ঠানের সমস্ত সাজসজ্জায় অগ্নিসংযোগ করে এক ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই অবস্থাটা সারা ভারত জুড়ে কম বেশি সর্বত্রই ঘটেছে। সব থেকে মারাত্মক হল এই দিন ছুটি থাকা সত্ত্বেও সেই ছুটি বাতিল করা হয়।

এই ছুটি বাতিল প্রকৃতপক্ষে সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের প্রতীকী ভাবে বর্জনের পথকে প্রশস্ত করে। বলা হয় দুর্জনের ছলের বা অজুহাতের অভাব হয় না। সেই অজুহাত হল ‘সুশাসন দিবস’। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর হওয়াতে এই দিনটিকে ‘সুশাসন দিবস’ হিসেবে পালন করার জন্য সরকার নির্দেশিকা জারি করে। শুধু তাই নয়, এই ‘সুশাসন দিবসের’ কর্মসূচিতে প্রত্যেক কর্মচারীকে অংশগ্রহণের জন্য নির্দেশ জারি করা হয়।
সব থেকে আশ্চর্য এবং ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো একদিকে বলা হচ্ছে সুশাসন দিবস এবং অন্যদিকে সেই সুশাসনের (?) সুযোগ নিয়ে সংখ্যাগুরু হিন্দুত্ববাদীরা সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের পবিত্র বড়দিনের উৎসবের আঙিনায় হামলা, হুমকি, অগ্নিসংযোগ করে এক নিদারুণ অসহিষ্ণুতার পরিচয় রাখল। এটা যদি সুশাসন হয় তবে এই পৃথিবীতে দুঃশাসন কাকে বলে তা আমাদের জানা নেই।

এ এক অদ্ভুত এবং পরিকল্পিত দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। খবরে প্রকাশ যে কমবেশি এরকম হামলা সমগ্র দেশ জুড়ে প্রায় আড়াইশোর উপর হয়েছে। অথচ ‘আচ্ছে দিন’-এর ধারক বাহক ও কাণ্ডারীরা কিন্তু এর বিরুদ্ধে একটিও বাক্য ব্যয় করেছেন বলে এখনো অন্তত এই কলমচির নজরে পড়েনি।এর ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি নিরীহ প্রশ্ন মনে উঁকি দেয়। একটি দেশে সংখ্যাগুরুরাই হচ্ছে সংখ্যালঘুদের আশা ভরসা এবং আশ্রয়স্থল। সংখ্যাগুরুদেব দায়িত্ব থাকে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার, তাদের সংস্কৃতি ও ধর্মকে নিরাপত্তা বিধান করার।

কিন্তু এখানে তার বিপরীত চিত্র বারবার আমরা দেখতে পাচ্ছি। এরফলে ভারতের বহু চর্চিত ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি কি অত্যন্ত লঘু ও হাস্যকর হয়ে পড়ছে না? কোনও জাতি গোষ্ঠীর অধিকার নেই একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে অন্য ধর্মের প্রতি, অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর এবং তাদের ধর্মীয় ক্রিয়া-কলাপে হস্তক্ষেপ করার। আক্রমণ তো দূরের কথা। এই আক্রমণ সম্পূর্ণ ভাবে যেমন মানববিরোধী তেমনি রাষ্ট্র বিরোধী কার্যকলাপও বটে। এবং আইনের চোখে তা সম্পূর্ণ অপরাধ। অথচ এইসব অপরাধীদের কোনদিন বিচার হয় না।

রাষ্ট্রের প্রশ্রয়ে তারা কেন নিরাপত্তা বলয়ে নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করবে? বড়দিনের উৎসবে সংখ্যাগরিষ্ঠ উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের এই হামলার ব্যাখ্যা কি? প্রশ্ন জাগে, সংখ্যাগুরুবাদীরা আধিপত্যের অধিকারে কি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাংস্কৃতিক সহশীলতা, ধর্মীয় সহনশীলতাকে, মানুষের সাধারণ স্বাধীনতাকে প্রত্যক্ষভাবে আঘাত ও আহত করছে না? শাসক-আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাসাজশে পক্ষপাত মূলক এবং নীরবে ভিন্ন ধর্মীয়দের বিলোপ করে একেবারে মুছে দেওয়ার এ এক ভিন্ন চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।

এর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সংখ্যাগুরুর বিবেকবান দায়িত্বশীল চিন্তাবিদ সবাইকে সোচ্চার হয়ে উঠতেই হবে। তা না হলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সহবাসের সংস্কৃতির বিনাশ হতে আর বেশিদিন লাগবে না। সত্যি কথা বলতে দেশ এখন এক ভীষণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের সম্মুখীন। দেশের প্রকৃত ইতিহাস গণতান্ত্রিক সহনশীলতার ঐতিহ্য। সেই ধর্মনিরপেক্ষতার এক সুদীর্ঘ মহান ঐতিহ্যকে ভুলিয়ে দিতে চায় এই উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। ভারতবর্ষের বহুত্ববাদিতার মধ্যে যে সম্প্রীতির সম্পর্ক, বহু চিন্তার মিশ্রণ, সে সবকিছুকেই গুলিয়ে দিতে চাইছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। তাই আজ ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষতা এক গভীর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না।

Advertisement