• facebook
  • twitter
Friday, 9 January, 2026

ভাষা, ধর্ম ও পরিচয়ের রাজনীতি

বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার রাজনীতি শুধু তাঁদের নয়, গোটা সমাজের জন্যই বিপজ্জনক

নির্বাচনের মরসুম এলেই পশ্চিমবঙ্গে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রশ্ন নতুন করে রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বাঙালিত্ব, বাংলা ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির উত্তরাধিকার— সবই তখন হঠাৎ ‘বিপন্ন’ বলে চিহ্নিত হয়। কিন্তু এই বিপন্নতার বয়ান যতটা আবেগঘন, ততটাই বিপজ্জনক। কারণ ভাষা ও সংস্কৃতি এখানে আর স্বাভাবিক সামাজিক স্রোত নয়, বরং সচেতনভাবে নির্মিত এক বিভাজনমূলক রাজনৈতিক অস্ত্র।

এই পরিচয় রাজনীতির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি দেখা যাচ্ছে বাংলাভাষী মুসলমানদের ক্ষেত্রে। বিজেপির প্রচারে ক্রমশ একটি ন্যারেটিভ ছড়ানো হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে বাংলাভাষী মুসলমান মানেই যেন ‘বাংলাদেশি’। এই সরলীকরণ শুধু তথ্যগতভাবে ভুল নয়, নৈতিক ও সাংবিধানিক দিক থেকেও গভীর অন্যায়। পশ্চিমবঙ্গেই কয়েক কোটি বাংলাভাষী মুসলমান ভারতীয় নাগরিক।

Advertisement

শুধু তাই নয়, আসাম, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড, বিহার থেকে শুরু করে দিল্লি, মহারাষ্ট্র— ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছেন কয়েক কোটি বাংলাভাষী ভারতীয় মুসলমান, যাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকার কথা নয়। তাঁদের ভাষা বা ধর্মকে একসঙ্গে জুড়ে ‘বিদেশি’ তকমা দেওয়া মানে গোটা একটি জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।

Advertisement

ভাষা এখানে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অস্ত্র হয়ে উঠছে। কে কী ভাষায় কথা বলছে, তার নাম কী, উচ্চারণ কেমন— এই সবের উপর ভিত্তি করে দেশপ্রেম বা বৈধতা নির্ধারণের প্রবণতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে ভয়ংকর। বাংলা ভাষা কোনও জাতিগত বা ধর্মীয় পরীক্ষার বিষয় নয়। অথচ আজ বাংলাভাষী মুসলমানদের ক্ষেত্রে ভাষা ও ধর্ম— দু’টিকেই একসঙ্গে অপরাধের চিহ্ন বানানো হচ্ছে।

এই ন্যারেটিভের সামাজিক পরিণতিও মারাত্মক। ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে হেনস্থা, মারধর, আটক— এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলি একটি রাজনৈতিক বয়ানের বাস্তব ফল। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কর্মরত বাংলাভাষী মুসলমান শ্রমিকরা আজ দ্বিগুণ ঝুঁকিতে— এক দিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্য দিকে পরিচয়জনিত আতঙ্ক। এই আতঙ্ক রাষ্ট্র নিজেই তৈরি করছে, যা কোনও সভ্য গণতন্ত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের দখলদারি চলছে। দুর্গাপুজো থেকে রবীন্দ্রজয়ন্তী— সবই রাজনৈতিক প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে উঠছে। কিন্তু বাংলা সংস্কৃতি কখনও একমাত্রিক ছিল না। এই সংস্কৃতির ভিতরেই আছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল, লালন ও জীবনানন্দ, হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ সবাই। সেই বহুত্বকেই অস্বীকার করে যখন সংস্কৃতিকে একরঙা করে তোলার চেষ্টা হয়, তখন তা সংস্কৃতির অপমান।

আর বাংলা ভাষার প্রকৃত সংকট? তা বহিরাগত নয়। সরকারি দপ্তরে ইংরেজির আধিপত্য, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বাংলার ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে যাওয়া, বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে মাতৃভাষার ব্যবহার নিয়ে অনীহা—এই প্রশ্নগুলির কোনও উত্তর নেই। তার বদলে সহজ পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে— আবেগ উসকে দেওয়া, ভয় তৈরি করা, শত্রু চিহ্নিত করা। ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, বাংলা ভাষার আন্দোলন কখনও কাউকে বাদ দেওয়ার আন্দোলন ছিল না।

ভাষা ছিল মর্যাদা ও অধিকারের প্রতীক, সন্দেহের নয়। আজ সেই ইতিহাসের ঠিক উল্টো পথে হাঁটা হচ্ছে। ভাষা ও ধর্মকে একসূত্রে বেঁধে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে সংবিধানের মৌলিক আত্মাকেই আঘাত করা।
ভাষা বাঁচে ব্যবহারে, সংস্কৃতি বাঁচে বহুত্বে, আর গণতন্ত্র বাঁচে নাগরিকের সমান মর্যাদায়। বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার রাজনীতি শুধু তাঁদের নয়, গোটা সমাজের জন্যই বিপজ্জনক। পশ্চিমবঙ্গের সামনে আজ আসল প্রশ্ন— ভাষা কি সংযোগের মাধ্যম থাকবে, না কি ঘৃণা ও বিভাজনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে বাংলার গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।

Advertisement