• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 7 July, 2026

শিবসেনা-এনসিপির পথে তৃণমূলও? তৃণমূল ভাঙনে শুরু সাংবিধানিক লড়াই

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের সংঘাতটি  জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দরজায় যাওয়ামাত্রই, রাজনৈতিক   লড়াইয়ের  পাশাপাশি শুরু হবে দীর্ঘ আইনি ও সাংবিধা

শিবসেনা-এনসিপির পথে তৃণমূলও? তৃণমূল ভাঙনে শুরু সাংবিধানিক লড়াই

Photo Source-ANI

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের সংঘাতটি  জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দরজায় যাওয়ামাত্রই, রাজনৈতিক   লড়াইয়ের  পাশাপাশি শুরু হবে দীর্ঘ আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। শুধু দাবি করলেই কোনও পক্ষকে ‘আসল’ দল হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না কমিশন। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই চলে শুনানি, নথি যাচাই এবং সাংগঠনিক শক্তির মূল্যায়ন। অতীতে শিবসেনা এবং এনসিপির ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল, তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও তারই পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের পরিস্থিতির কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও রয়েছে, যা এই মামলাকে অন্য মাত্রা দিতে পারে। প্রাথমিক নথিপত্র জমা পড়ার পর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপ, অর্থাৎ হিয়ারিং। এই পর্যায়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়া দুই পক্ষকে আলাদা করে শুনানির জন্য ডাকে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। প্রয়োজন হলে একাধিক দফায় শুনানি হতে পারে। দুই পক্ষই তাঁদের আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে কমিশনের সামনে হাজির হওয়ার সুযোগ পান। সেখানে তাঁরা নিজেদের দাবি, সাংগঠনিক ভিত্তি, দলের গঠনতন্ত্র, সদস্যসংখ্যা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি তুলে ধরেন। প্রত্যেক পক্ষের লক্ষ্য থাকে একটাই— কমিশনের কাছে প্রমাণ করা যে তারাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস এবং দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রকৃত উত্তরাধিকারী।
শুনানি শেষ হওয়ার পর শুরু হয় তৃতীয় তথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কমিশন সমস্ত নথি, প্রমাণ এবং দুই পক্ষের বক্তব্য খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, কোন পক্ষকে দলের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে, দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক ব্যবহারের অধিকার কার হাতে থাকবে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয় নির্বাচন কমিশন। বিতর্কিত দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক— উভয়ই সাময়িক ভাবে ‘ফ্রিজ’ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, কোনও পক্ষই সেই নাম বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারে না। পরিবর্তে কমিশন দুই শিবিরকে পৃথক অস্থায়ী নাম এবং আলাদা নির্বাচনী প্রতীক দেয়। চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত সেই অস্থায়ী পরিচয় নিয়েই রাজনৈতিক ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালাতে হয় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে।
ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন পরিস্থিতির নজির রয়েছে। ২০২৩ সালে শিবসেনা ভেঙে একদিকে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা এবং অন্যদিকে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি) তৈরি হয়েছিল। একই সময়ে শরদ পওয়ারের নেতৃত্বাধীন এনসিপি ভেঙে অজিত পওয়ারের পৃথক শিবির গড়ে ওঠে। দুই ক্ষেত্রেই বিরোধ মেটাতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিল উভয় পক্ষ। কমিশন তখন দলের নাম ও প্রতীক সাময়িক ভাবে স্থগিত রেখে পৃথক প্রতীক বরাদ্দ করেছিল। পরে দীর্ঘ শুনানি ও নথি যাচাইয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
তবে শিবসেনা এবং এনসিপির মামলার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল। শিবসেনার ক্ষেত্রে কমিশনের সামনে অন্যতম প্রশ্ন ছিল দলের সাংগঠনিক কাঠামোর স্বচ্ছতা। অভিযোগ উঠেছিল, দীর্ঘ দিন ধরে নিয়মিত সাংগঠনিক নির্বাচন হয়নি, গঠনতন্ত্র কার্যকর ভাবে অনুসরণ করা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রেও অসঙ্গতি ছিল। ফলে শুধুমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, সাংগঠনিক বৈধতাও সেখানে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।অন্যদিকে এনসিপির ক্ষেত্রে সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে তেমন কোনও বিতর্ক ছিল না। ফলে কমিশন মূলত কোন পক্ষের সঙ্গে অধিকাংশ সাংসদ, বিধায়ক এবং সাংগঠনিক পদাধিকারীরা রয়েছেন, সেই সংখ্যাগত সমর্থনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও যদি পূর্ণাঙ্গ দলভাঙনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি এবং সাংগঠনিক সমর্থনের প্রশ্নই কমিশনের বিচারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।তবে এখানেই তৃণমূলের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। সূত্রের দাবি, বর্তমান বিরোধে আবেদনকারী শিবির মূলত পরিষদীয় দলের অবস্থানকে সামনে রেখেই কমিশনের কাছে আবেদন করেছে। যদিও জেলা পরিষদ, স্থানীয় সংগঠন এবং অন্যান্য সাংগঠনিক স্তরের সমর্থনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে কমিশনের সামনে প্রশ্ন উঠতে পারে— এই বিরোধ কি শুধুমাত্র আইনসভা- কেন্দ্রিক, নাকি তা দলের বৃহত্তর সাংগঠনিক কাঠামোতেও বিস্তৃত?আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। শিবসেনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিধানসভার স্পিকারের ভূমিকাও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। সেই সময় দুটি পৃথক মামলা হয়েছিল— একটি স্পিকারের সিদ্ধান্তকে ঘিরে এবং অন্যটি নির্বাচন কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে। কমিশনের সিদ্ধান্তের পরেও সেই আইনি লড়াই দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও কমিশনের চূড়ান্ত রায়ের পর কোনও পক্ষ যদি অসন্তুষ্ট হয়, তা হলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ থাকবে। শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ই হতে পারে এই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি।