• facebook
  • twitter
Friday, 20 February, 2026

হিংস্রতা যখন উপভোগের বিষয়

সমাজ সংস্কৃতিতে কিছু একটা পচছে। যদি এই ভাবেই চলতে থাকে, তবে হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নেই যখন ‘কিছু’ নয়, পুরো সমাজ, সংস্কৃতিটাই পচে যাবে।

শোভনলাল চক্রবর্তী

সাম্প্রতিক কালে আমাদের চার পাশে পরস্পরের প্রতি চরম বিদ্বেষ, হিংস্রতা, খুন যা এককালে ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তা আজ প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। বর্তমান সমাজের সবচেয়ে গভীর সঙ্কট হল মানুষ এগুলিকে স্বাভাবিক ঘটনার পর্যায়ে ফেলে তা উপভোগ করছে। সমাজে হিংসা, প্রতিহিংসা, খুন, ধর্ষণ, অসহিষ্ণুতা, স্বেচ্ছাচারী মনোভাব, উচ্ছৃঙ্খলতা দেখানোয় দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমগুলির প্রতিযোগিতা চলছে এবং সকাল সন্ধ্যা আমরা গোগ্রাসে তা গিলছি। সমাজে প্রতিবাদীদের কণ্ঠ চিরদিনের মতো বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সমাজের এই অবক্ষয়ের দিনে শিক্ষিত আলোকপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত মানুষের একাংশের কাঁধে বিরাট দায়িত্ব এসে পড়ে। সমাজ যখন আজ হিংসায় জরাজীর্ণ, মানুষের মেরুদণ্ড যখন ভেঙে পড়ার দশা, তাঁদের এই ‘গা-সওয়া’ মানসিকতা থেকে বার করে এনে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যবিত্তদের সেই অগ্রণী অংশের। তাঁদের দায়িত্ব মানুষের মধ্যে সচেতনতা ফিরিয়ে আনার, মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী করে তোলার। ঘৃণা থেকেই আসে উগ্র ক্রোধ, আর ক্রোধ জন্ম দেয় হিংস্রতার।

Advertisement

সমাজ সংস্কৃতিতে কিছু একটা পচছে। যদি এই ভাবেই চলতে থাকে, তবে হয়তো সেই দিন আর বেশি দূরে নেই যখন ‘কিছু’ নয়, পুরো সমাজ, সংস্কৃতিটাই পচে যাবে। সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাওয়ার আগে চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত সমাজমনস্ক মানুষকে এখনই এ সম্পর্কে সদর্থক পদক্ষেপ করতে হবে। জন্ম থেকেই কোনও ব্যক্তি হিংস্র হয়ে ওঠে না। চার পাশের বিভিন্ন ঘটনা, সামাজিক অবক্ষয় মানুষকে ক্রুদ্ধ করে তোলে এবং তারই প্রতিফলন হয় সেই ব্যক্তির হিংস্র আচরণে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্রের পরোক্ষ প্ররোচনা। এক সম্প্রদায়ের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের ঘৃণাভাষণ, বিভিন্ন সম্প্রদায়কে একে-অপরের সঙ্গে লড়িয়ে দেওয়া চলতেই থাকে শাসক দলের কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখতে। সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এমন হিংস্রতা, পৈশাচিকতা স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে সমকালীন সাহিত্য, সিনেমা, নাটক, ছবি ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।

Advertisement

সমাজমাধ্যমে, আমাদের চার পাশে অহরহ এমন অনেক হিংস্র, ভয়ঙ্কর মন্তব্য দেখা যায় যেগুলো হয়তো করেছেন নেহাতই ছা-পোষা, আপাতনিরীহ কোনও ব্যক্তি যিনি কস্মিন্‌কালেও আঘাতের উদ্দেশ্যে হাতে ছুরি-কাটারি ধরেননি। হয়তো তিনি কোনও শিশুর পিতা, সন্তানকে দু’বেলা স্নেহে ভরিয়ে তোলেন। যখন দাঙ্গা হয়, তার সব অভিযুক্ত দাগি আসামি হন না। বরং অনেক সাধারণ মানুষ জড়িয়ে পড়েন ক্রমাগত ঘৃণাভাষণের কারণে। ক্রমাগত বিদ্বেষ, বিভাজন, ঘৃণা ছড়ানোর কারণে উত্তরপ্রদেশে আখলাক হত্যা ঘটে, মুর্শিদাবাদে হরগোবিন্দ দাস, চন্দন দাসের হত্যা হয়, বাংলাদেশে দীপু দাসকে পিটিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

এ রকম আরও অনেক নাম আছে, যাঁদের স্রেফ সন্দেহের বশে পিটিয়ে মারা হয়েছে। সমাজে, দেশে ঘটে চলা ক্রমবর্ধমান হিংসা, বীভৎসতার ঘটনা খুবই দুঃখজনক ও চিন্তার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি উদ্বেগের কারণ হল মানুষের উদ্বেগহীনতা। এক বিশাল অংশের মানুষ হিংস্রতা দেখে লজ্জিত বা দুঃখিত তো নন-ই, বরং তাঁরা উপভোগ করেন। কেউ কেউ ওই নির্মমতার ঘটনা ভিডিয়ো করেন, যা কয়েক বছর আগেও ভাবা যেত না। হিংস্রতার উপর নির্ভর করেই কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে অ্যানিমাল, ছাওয়া, ধুরন্ধর-এর মতো সিনেমা।
ঘৃণাভাষণ, বিদ্বেষ-বিভাজনের রাজনীতি যদি বন্ধ না হয়, তা হলে নৃশংসতা চলতেই থাকবে। তাতে রাজনীতিবিদদের হয়তো সুবিধা হবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে তা ঘোর অন্ধকারের সূচনা। সাম্প্রতিক অতীতে মেট্রো স্টেশনেই এক স্কুলপড়ুয়া ছুরি দিয়ে কুপিয়ে খুন করছে আর এক স্কুলপড়ুয়াকে! একবার ভাবুন তো কী ভয়ানক ঘটনা। এই নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, ঠিক কী কারণে এক স্কুলপড়ুয়া সঙ্গে ছুরি রাখতে পারে? কেন ১৭ বছরের এক পড়ুয়া সমবয়সিকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে খুন করতে পারে? মনোরোগ চিকিৎসক থেকে সমাজতত্ত্ববিদদের বড় অংশ যদিও বলছেন, এ কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়। এটা সার্বিক সামাজিক অসহিষ্ণুতার ফল। এমন ঘটনার পিছনে কারণ যা-ই হোক, এটা আদতে অল্পবয়সিদের মধ্যে বাড়তে থাকা আগ্রাসন ও বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতার দিককেই ইঙ্গিত করছে। সেই সঙ্গে তাঁরা ছোটদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিক নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা করে স্কুল স্তর থেকে পদক্ষেপ করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। আসলে আমরা আরও বেশি করে অশান্ত হয়ে পড়ছি। তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া দিতেই হবে ভেবে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অনেক কিছুই ঘটিয়ে ফেলছি আমরা। এই পরিস্থিতিতে ছোটদের কী শিক্ষা দিচ্ছি, সেটা ভাবা প্রয়োজন। রাগ সংবরণের কোনও শিক্ষাই এখন তারা পাচ্ছে না। সেই সঙ্গে বড়রা আমাদের বুঝবে না, এই ভয় আরও বেশি করে ঘিরে ধরছে শিশু-কিশোর মনকে।

বয়ঃসন্ধিকালে এই ভুল বোঝার ভয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। এরই ফল হয়তো এমন সব ঘটনা। এর গভীরে পৌঁছে পুরোটা দেখা উচিত। যে ছেলেটি এই কাণ্ড করেছে, তার পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক সমস্ত ব্যাপার জানা জরুরি। এ ছাড়া সমাধান ভাবা যাবে না।পুরোটাই অত্যন্ত ভয়ের ও আতঙ্কের। সব দিক থেকেই আমরা অত্যন্ত অধৈর্য হয়ে গিয়েছি। সহিষ্ণু ভাবটা বড্ড কমে যাচ্ছে। এই সব ঘটনা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে যে, বাড়তে থাকা স্ক্রিনটাইমে নতুন প্রজন্ম ঠিক কী শিখছে? প্রায় সর্বক্ষণ দেখতে থাকা হিংসার কনটেন্ট কি তাদের হিংসার দিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে? শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার।

এই সব ঘটনা অত্যন্ত ভয়ের ব্যাপার। যে কোনও অভিভাবককে ব্যাপারটি চিন্তায় ফেলতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে সন্তানের উপরে অভিভাবকেরা বিধিনিষেধের পথে যেতে পারেন। কিন্তু তাতে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে শিশু-কিশোর মন, বন্ধু আর বন্ধু থাকছে না, বিপদের কারণ হয়ে উঠছে। প্রয়োজনে বন্ধু নিজের বন্ধুকে লোপাটও করে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে খারাপ হয়ে যাওয়া পরিবেশে ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে।
অনেকে বন্ধুত্বের দিবস পালন নিয়ে নানা কথা বলেন। কিন্তু দিবস পালনের দরকার আছে। কী করে সমাজে সম্পর্কের বন্ধনবোধ বাড়তে পারে, সেটাই এখন সব পক্ষের মূল ভাবনা হওয়া উচিত।আসলে আজ আধুনিকতার মিথ্যা খোলস খসে পড়েছে। হিংসায় মেতে ওঠা পৃথিবীর কাছে সত্যের দর্পণ ধরা জরুরি, যে দর্পণে চোখ রাখলে প্রকৃত আধুনিকতার সন্ধান মিলতে পারে। সিনেমায় হিংসার চর্চা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই নৈতিক অধঃপতন কি এক দিনে হয়েছে? উত্তর, না। বরং সত্যের অপব্যাখ্যায় নীতিগত অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করেছে।

অনুকরণের জগৎ আমাদের মনের ভিত গড়ে তোলে। ফলে গোড়াতেই যদি ভুলের অনুকরণ শুরু হয়ে যায়, তা হলে পরবর্তী কালে সেখান থেকে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেন আজ সিনেমা বা থিয়েটারে হিংসার চর্চা বেড়ে গিয়েছে, তার অনুসন্ধান জরুরি। এ ব্যাপারে দর্শনের অধ্যাপক ইয়ানলুকা ডে মুটিসিয়ো যথার্থই লিখেছেন— ‘উগ্র হিংস্রতার ছবি একনাগাড়ে দেখলে সংবেদনশীলতার সাড় কমে। মানুষ নাশকতাকে উপভোগ করতে শেখে। অপরের যন্ত্রণায় যে সহমর্মিতার উদ্রেক হওয়ার কথা, সেটি ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যায়।’ সহানুভূতি এবং সমানুভূতির সূক্ষ্ম অথচ গুরুতর শিক্ষাকে পরিমাপ করতে বিদ্যালয় স্তরে ফর্মেটিভ মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সেই সত্তাকে জাগ্রত করার জন্য যে সকল পন্থা অবলম্বন করা দরকার, তা কি আজও নেওয়া হয়েছে? নিয়মিত খেলাধুলা করানো বা সংস্কৃতির আঙিনায় পৌঁছে দেওয়ার সার্বিক প্রচেষ্টা কি আদৌ গৃহীত হয়েছে? ‘মুষ্টিমেয়র উন্নয়ন দেশের উন্নয়ন নয়’, এ কথা বহু আগে মহাত্মা গান্ধী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলে গিয়েছেন। সে কথা কি বাস্তবে মানা হচ্ছে? কেবল সিনেমা বা থিয়েটার নয়, শিল্প সাহিত্যের প্রতিটি আঙ্গিকে এবং জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হিংসার চর্চা ক্রমে বেড়েই চলেছে। শৈশবের নীতিকথামূলক গল্প পাঠ, কিংবা পারিবারিক সৌজন্য-শিক্ষার অভাব ভীষণ ভাবে চোখে পড়ছে। নিজের কাজকে সহজ করার জন্য শিশুর হাতেও মোবাইল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দুরভিসন্ধি, প্রেম-অপ্রেম, হিংসার নিয়ত চর্চা চলছে ছোটদের কার্টুনেও। আমরা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে অনীহা দেখাচ্ছি না তো? আগামী প্রজন্মকে ইচ্ছে করে বিভ্রান্ত করছি না তো? জীবনে উদারতার, সহমর্মিতার শিক্ষাটুকু আজও আমরা গ্রহণ করতে পারছি কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

দুর্ঘটনা কবলিত মানুষকে উদ্ধারের বদলে ভাইরাল করে দেওয়ার নেশা মানুষকে গ্রাস করছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে গেলে অতীতের শিল্প সাহিত্য বা মহান চরিত্রের অনুকরণ ও অনুসরণ চর্চা সবচেয়ে জরুরি বিষয়। মহান মানুষদের জন্ম বা মৃত্যুর দিনগুলি কেবল ছুটির দিন নয়। বরং তাঁদের কর্মকাণ্ডের চর্চা হোক। সোনা-হিরে-জহরত নয়, অভিভাবক তাঁর অমূল্য সম্পদ হিসেবে যত দিন না সন্তানকে বিবেচনা করবেন, তত দিন এই হিংসা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে না। সমাজে সংস্কৃতিতে ঘটে চলা পচন ঠেকাতে আজ সকলের একজোট হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

Advertisement