• facebook
  • twitter
Thursday, 19 February, 2026

আস্থার সংকট

গণতন্ত্রে ‘বুলডোজার’ নয়, সংলাপই শেষ কথা। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচিত সরকারের মধ্যে সংঘাত যত বাড়বে, ততই সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক সাংবাদিক বৈঠক রাজনৈতিক অভিঘাতের দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনকে ‘তুঘলকি কমিশন’, ‘সো-কল্ড টর্চার কমিশন’, এমনকি ‘ক্যাপচার কমিশন’ বলে অভিহিত করেছেন। অভিযোগের ভাষা যেমন তীব্র, তেমনই তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর এ ধরনের সরাসরি আক্রমণ নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়– এটি আসলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে জন্ম নেওয়া সংশয়ের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হল, এই সংশয় কি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল, না কি এর পেছনে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তি রয়েছে?

Advertisement

মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান অভিযোগ এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে। তাঁর বক্তব্য, বিহারে যে নথি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে, বাংলায় তা বাতিল করা হচ্ছে কেন? ফ্যামিলি রেজিস্টার বা বংশতালিকা যদি এক রাজ্যে গ্রহণযোগ্য হয়, অন্য রাজ্যে তা অগ্রাহ্য হওয়ার যুক্তি কী? একই দেশের একই নির্বাচনী বিধি— কিন্তু প্রয়োগে বৈষম্য— এই প্রশ্নটাই আজ মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

Advertisement

গণতন্ত্রে নির্বাচন কেবল ভোটদানের একটি দিন নয়– এটি দীর্ঘ প্রস্তুতি, তালিকা সংশোধন এবং নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতির সমষ্টি। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানে কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, নাগরিকত্বের মৌলিক অধিকারের উপর আঘাত। অভিযোগ উঠেছে, তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের দাবি, প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এতে বহু প্রকৃত ভোটার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে অভিযোগ সামনে এসেছে তা হল, এই প্রক্রিয়ার ফলে চরম মানসিক চাপে সাধারণ মানুষ এবং বিএলও-দের মধ্যে বহু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যদিও এই সংখ্যার নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন, তবুও যদি প্রশাসনিক চাপ ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়ে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যবিধির পরিপন্থী। নির্বাচন কমিশনের কাজ ভোটারদের আস্থা বাড়ানো, আতঙ্ক সৃষ্টির নয়।

মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেছেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ যদি বাস্তবে প্রতিফলিত না হয়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়— সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রশ্নও বটে। একই সঙ্গে ইআরও ও এইআরও-দের সাসপেনশনের সিদ্ধান্ত, ঘনঘন হোয়াটসঅ্যাপ নির্দেশিকা পাঠিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি— এইসব অভিযোগ কমিশনের প্রশাসনিক শৈলী নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও মনে রাখা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন সংবিধানপ্রদত্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তার উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করাও সমানভাবে বিপজ্জনক। তবু এটাও সত্য, গণতন্ত্রে নিরপেক্ষতার ধারণা শুধু আইনি কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়, তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও জরুরি। যদি একাধিক বিরোধী দল একই ধরনের অভিযোগ তোলে যে, কমিশন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সুবিধার্থে কাজ করছে— তবে সেই ধারণা ভাঙার দায় কমিশনেরই বেশি। স্বচ্ছতা, নথি যাচাইয়ের একক মানদণ্ড, প্রকাশ্য ব্যাখ্যা— এই পথেই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন বরাবরই স্পর্শকাতর। অতীতে হরিয়ানা বা মহারাষ্ট্রেও ভোটের আগে একই ধরনের সংশোধনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল—এমন দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে প্রশ্ন জাগে, নির্বাচনের ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে ব্যাপক এসআইআর করানোর প্রয়োজনীয়তা কতটা? সময়সীমা যদি অযৌক্তিকভাবে কম হয়, তবে প্রশাসনিক ত্রুটি ও বিভ্রান্তির সম্ভাবনা বাড়ে।

ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি তার বহুত্ববাদে। ভোটার তালিকা থেকে কোনও বৈধ নাগরিকের নাম বাদ পড়া যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অযথা রাজনৈতিক সন্দেহের কেন্দ্রে ঠেলে দেওয়াও সমান ক্ষতিকর। আজ প্রয়োজন তথ্যনির্ভর স্বচ্ছতা। কমিশন যদি মনে করে তার সিদ্ধান্ত সঠিক, তবে তা বিশদভাবে জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করুক।

গণতন্ত্রে ‘বুলডোজার’ নয়, সংলাপই শেষ কথা। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচিত সরকারের মধ্যে সংঘাত যত বাড়বে, ততই সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে। নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রত্যাশা— নিরপেক্ষতার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন দৃশ্যমান হয়। আর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা— প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল না করে, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ বেছে নেওয়া।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই– নির্বাচন কি ক্ষমতার কৌশল, না নাগরিক অধিকারের উৎসব? উত্তর নির্ভর করছে, কমিশন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব— উভয়েই কত দ্রুত আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারেন তার উপর।

Advertisement