• facebook
  • twitter
Monday, 19 January, 2026

বিদ্বেষের উদ্‌যাপন এবং গৌরবায়ন

কেরলের ঘটনায়, নিধনের আগে নির্যাতন নাকি এমনই মাত্রায় ছিল যে অটপ্সি-কারী চিকিৎসক স্তম্ভিত হয়ে জানিয়েছেন, এমন শারীরিক অত্যাচার অভাবনীয়, অদৃষ্টপূর্ব।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

শোভনলাল চক্রবর্তী

বিধের মাঝে মহান মিলন নিয়ে এত কাল গর্বিত ছিল যে ভারতীয় সমাজ, তার কী এমন হল যে ভাষা ধর্ম পোশাক খাবার তথা মত ও পথের বহুত্বকে সহ্য করা দূরস্থান, তার অস্তিত্বটুকু পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না চোখের সামনে? এর একটা কারণ নিশ্চয়ই রাজনীতি, বিশেষত শাসকের সংখ্যাগুরুবাদী রাজনৈতিক বয়ান: আসমুদ্রহিমাচল ভারতকে এমন ভাবে তা ছেয়ে ফেলেছে যে, যে কোনও প্রান্তিক বা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে চড়াও হতে এতটুকু বাধছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, গণপ্রহার বা গণহিংসার অধিকাংশ ঘটনার পিছনে অভিযুক্ত বা অপরাধীরা শাসক দলের সঙ্গে যুক্ত অথবা তার মতাদর্শের সমর্থক— হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের লোকেদের চার্চ ভাঙচুর, বা গোমাংস বহন-পরিবহণের জন্য নিরীহ মুসলমান কর্মীকে নিগ্রহ একই হিংসার দুই পিঠ। ক্ষমতাসীনের রাজনৈতিক বয়ানের জোর খাটিয়েই চলছে দলিতের অবমাননা, নারীধর্ষণ। শাসকের রাজনীতি কাজ করছে কখনও গণহিংসার নিয়ামক, কখনও অনুঘটক হিসেবে: নয়তো যে মানুষ কখনও আলাদা ভাষায় কথা বলা সহমানুষকে ‘বিপদ’ বা ‘শত্রু’ বলে ভাবেনি জীবনে, সে কেনই বা তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করবে; কোন যুক্তিতে ভাববে যে এই ভারতে ভিন্ন ধর্ম জীবনচর্যা বা যৌন পরিচয়ের মানুষের শ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকু পর্যন্ত নেই?

Advertisement

গণহিংসার তাৎক্ষণিকতায় যুক্তিবিচার মুছে যায় তা যেমন সত্য, তারও বড় সত্য: আজকের ভারতে গণহিংসার ইশারা-উস্কানি থেকে পৃষ্ঠপোষকতা, পুরোটাই চলছে শাসকের নীরব ও সরব অঙ্গুলিহেলনে। আরও দুর্ভাগ্যের, আইন-শৃঙ্খলার নিয়ামকরাও অনেক সময়েই সঙ্গী হচ্ছেন তাতে। প্রতিটি ক্ষেত্রে মৃত্যু নয়, হত্যা হচ্ছে গণতন্ত্রের। ‘জগতের শত শত/ অসমাপ্ত কথা যত/ অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল/ অকালের জীবনগুলা/ অখ্যাত কীর্তির ধুলা/ কত ভাব, কত ভয় ভুল।’ এই রবীন্দ্রপঙ্‌ক্তি এখন শুধুই কথার কথা, কত শত অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল নিয়ে গেল এই বিলীয়মান সময়, তার হিসাব আমরা কেউই রাখছি না। কিছু সাম্প্রতিক সংবাদ নতুন করে এই ভাবনা চারিয়ে দিয়ে যায়, বিশেষত যখন শোনা যায় কেবল নিজের ভাষায় কথা বলার ‘দোষ’-এ কত প্রাণকে অকালে ঝরে যেতে হল। ২০২৫ সালের অগণিত এমন ঘটনার মধ্যে ডিসেম্বর-শেষে যুক্ত হল আরও দু’টি প্রাণ: এক জন কেরলে কর্মরত ছত্তিসগড়ের শ্রমিক, এবং আর এক জন ওড়িশায় কর্মরত পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিক। দুই জনের বিরুদ্ধেই পার্শ্ববর্তী জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে তাঁদের নির্যাতন ও নিধন করেন, কারণ ধরে নেওয়া হয় তাঁরা বাংলাদেশি, এবং/সুতরাং মুসলমান ধর্মাবলম্বী, ফলে নিধনযোগ্য।

Advertisement

কেরলের ঘটনায়, নিধনের আগে নির্যাতন নাকি এমনই মাত্রায় ছিল যে অটপ্সি-কারী চিকিৎসক স্তম্ভিত হয়ে জানিয়েছেন, এমন শারীরিক অত্যাচার অভাবনীয়, অদৃষ্টপূর্ব। তিনি রীতিমতো অসুস্থ হয়ে পড়েন ঘটনার অভিঘাতে। এই চিকিৎসকও ভারতীয়, এই আক্রমণকারীরাও ভারতীয়। অপরিচিতকে সম্পূর্ণ অকারণে ছিন্নভিন্ন করে অপরিসীম যন্ত্রণা দিয়ে মৃত্যুপথে পাঠানোর মতো মানুষও কম নেই, আবার অপরিচিতের জন্য সমবেদনা, এমনকি শোক, অনুভব করার মানুষও কম নেই। কোন দল বাড়ছে, কোন দল কমছে? সাম্প্রতিক কালের সংবাদ বলবে, আক্রমণ ও হিংসার কাহিনিই ক্রমবর্ধমান, ও তার পিছনের প্রশ্রয়দাতা বিভীষিকাময় রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত অপরিসীম। সময়ের অবকাশে জিজ্ঞাসা উপস্থিত হয়, এই যে আক্রমণের ভারত ও সমবেদনার ভারত, বর্তমান দেশ, এবং ভবিষ্যৎ দেশ, কোনটিকে বেছে নেবে? সেই নির্বাচন কি এই সব হিংসার ঘটনার উপর এক চুলও নির্ভর করে? হিংসার সংবাদ থেকে কেউ কি কখনও অ-হিংসার প্রতিজ্ঞা নেয়?

ছত্তীসগঢ়ের রামনারায়ণ বাঘেল মারা গেলেন কেরলে, গত বছর ১৭ ডিসেম্বর। তার আট দিন আগে, ৯ ডিসেম্বর মারা গেছেন ত্রিপুরার অ্যাঞ্জেল চাকমা, উত্তরাখণ্ডে। মারা গেছেন বললে সত্যের অপলাপ হয়, দু’টি ক্ষেত্রেই দু’জনকে মেরে ফেলা হয়েছে— গোড়ায় টিটকিরি কেটে, পরে চড়াও হয়ে, প্রচণ্ড প্রহার করে। এই কাজ উগ্র, ক্রুদ্ধ জনতার, যারা রামনারায়ণকে বহিরাগত, অ্যাঞ্জেলকে বিদেশি মনে করেছিল। পরিযায়ী শ্রমিক রামনারায়ণকে মারতে মারতে তারা প্রশ্ন করেছিল তিনি ‘ঘুসপেটিয়া’, বাংলাদেশি কি না; অ্যাঞ্জেলের ক্ষেত্রে ঘটনার সূত্রপাতই ‘চিনা’ বলে বিদ্রুপে, তাঁর প্রতিবাদের প্রত্যাঘাত এসেছে গণপ্রহারে হত্যায়; মরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত যাঁর মুখে শেষ কথা ছিল— ‘আমি এক জন ভারতীয়।’ নিপীড়ক ও ঘাতক সহ-ভারতীয়রা অবশ্য তা শোনেনি, শুনলেও কান দেয়নি।এই তালিকাতেই যোগ করা যায় বিহারে গত মাসেই জনতার গণপ্রহারে মৃত বস্ত্রবিক্রেতা মহম্মদ হুসেনকে। ক’দিন আগে ক্রিসমাসের আবহে মধ্যপ্রদেশ উত্তরপ্রদেশ উত্তরাখণ্ড আসাম তামিলনাড়ু কেরল দিল্লিতে উৎসবমুখর খ্রিস্টানদের আক্রমণ ও হেনস্থার যে ঘটনাগুলি খবরে এল, সেগুলির কোনওটিতেই যে কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি— তাকে কি সৌভাগ্য ধরে নিতে হবে?

দলিত মেয়ের ধর্ষণ, নিম্নবর্গের পুরুষকে জনতার বিচারে অত্যাচারের সাজা— নতুন বছর এলেও প্রতিটি ঘটনা পুরনো সব উদাহরণের মতোই ঘটমান। গণহিংসা ‘ভিজিল্যান্ট জাস্টিস’-এর রূপ ধরে প্রকট করে তুলছে আজকের ভারতীয় সমাজের এই নগ্ন সত্য: যে কেউ, দেশের যে কোনও জায়গায় নিগৃহীত এমনকি নিহতও হতে পারেন— তাঁর চেহারা, বিশ্বাস, জাত, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, পোশাকের জন্য। যে কারও জীবনাশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে— কাকে তিনি ভালবাসছেন, কতটা যুক্তিশীল চিন্তা করছেন বা ক্ষমতার মুখের সামনে কোন সত্য বলছেন, তা। এ তো তবু বৃহৎ জীবনসত্যের ব্যাপার, ধর্মাচরণ, আচার-অনুষ্ঠান, খাওয়া-পরা-জীবিকার মতো অভ্যস্ত কাজগুলির জন্যও যে প্রাণ চলে যেতে পারে প্ররোচনাহীন ভাবে উগ্র ও হিংস্র কিছু সহনাগরিকের হাতেই, ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্‌’-এর প্রচারক ভারতে কে তা ভেবেছিল? হিংসা বস্তুটি ক্রমে এমনই গা-সওয়া হয়ে উঠছে যে, যে-কোনও রকমের বিদ্বেষ কিংবা ব্যর্থতাবোধ নিমেষে হিংসায় পরিণত হওয়া এখন ক্রমশই নতুন ‘স্বাভাবিক’-এ পরিণত।

বুঝতে অসুবিধা নেই, যতই চলবে এই স্বাভাবিকীকরণ, ততই স্পষ্ট হবে কোন দল জিতছে, আর কোন দেশ হারছে, কিংবা না হারলেও নীরবতায় বিলীন হচ্ছে। কিছু দিন আগেও কি ভাবা গিয়েছিল, চিকেন প্যাটি বিক্রি করার ‘অপরাধ’-এ কলকাতার কেন্দ্রস্থলে কোনও ব্যক্তিকে গণপ্রহৃত হতে হবে? এবং তার পর অন্যতম রাজনৈতিক দলের প্রধান বাঙালি নেতা সেই গণপ্রহারের নায়ককে সর্বসমক্ষে পুরস্কারে বরণ করবেন? মানুষের বিদ্বেষ কোনও নতুন অনুভূতি নয়, কিন্তু সেই বিদ্বেষের সাহসী খোলামেলা উদ্‌যাপন এবং গৌরবায়ন— আধুনিক বিশ্বে এ এক নতুন ঘটনা বটে। বিদ্বেষ তো কেবল ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর নয়, বিদ্বেষ যেন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে সতত উৎসারিত। বিগত দেড় মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে শোনা গেল একের পর এক আত্মহননের সংবাদ, যার পিছনে প্রধান কারণ— ভোটার তালিকা সংশোধন-সূত্রে নাগরিকতা হরণের আশঙ্কা ও আতঙ্ক। আশ্চর্য হয়ে দেখতে হয়, সরকারি কাজের ঠেলায় সাধারণ মানুষের এই অসীম ভয় ও বেদনা আত্মহনন অবধি পৌঁছে যায়, তবু সরকারের কোনও হেলদোল থাকে না, তাঁরা নিষ্কম্প নির্ভয়। সরকারি নেতা বা কর্তা এক বারের জন্যও সন্তপ্ত পরিজনের কাছে গিয়ে দাঁড়ান না, কারণ তাঁদের নজরে এ সবই এখন ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’, মানুষের ভোট নিয়ে তাঁদের কারবার, মানুষের জীবন নিয়ে ভাবার সময় নেই।

বাংলাদেশে দীপু দাস নামক এক অখ্যাত সাধারণ মানুষের ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক হত্যা বিশ্বব্যাপী আতঙ্কের শিহরন বইয়ে দিল, কিন্তু সেই রাজনীতির সমর্থক/সহায়ক সে দেশের সরকার ক্ষমাপ্রার্থনার ধার দিয়েও গেল না। ভাবটা যেন, এ সব তো হতেই পারে, আশ্চর্য কী। তেইশ মাসে গাজায় ইজরায়েলের বোমাবর্ষণে প্রায় তেইশ হাজার শিশু নিহত হয়েছে, কিন্তু তাতে ইজ়রায়েলের দুঃখপ্রকাশ দূরস্থান, উল্টে সে দেশের নেতারা সগৌরবে জানিয়েছেন, কোনও শিশু বেঁচে থাকলেই বরং বিপদ। প্রকৃতই, ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, সমষ্টিগত বিদ্বেষের এই যে সাড়ম্বর উদ্‌যাপন, এই আবহে ছোট ছোট জীবনের ব্যথাবেদনা, পরাজয় বা প্রস্থান আজ সম্পূর্ণ মূল্যহীন। নতুন বছর আসবে যাবে আবার আসবে, মানবসমাজে মানবিকতা নামক গুণটি বিসর্জনের ধারাবাহিক পালা সম্ভবত চলতেই থাকবে।

Advertisement