• facebook
  • twitter
Friday, 20 February, 2026

ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

এটি এক অনিশ্চিত বিশ্বপরিস্থিতিতে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও বাস্তব পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের প্রতিফলন।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

মুম্বাইয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সাম্প্রতিক বৈঠক ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ককে আরও এক ধাপ উপরে তুলে দিল। ‘স্পেশাল গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ নামে অভিহিত এই সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য বা প্রতিরক্ষা কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক অনিশ্চিত বিশ্বপরিস্থিতিতে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও বাস্তব পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের প্রতিফলন।

আজকের বিশ্বরাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির অস্থিরতা থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির প্রতিযোগিতা— সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের ভঙ্গুর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দিল্লি ও প্যারিসের ঘনিষ্ঠতা একটি বিকল্প স্থিতির বার্তা দেয়। দুই দেশই প্রকাশ্যে ‘রুলস-বেসড অর্ডার’-এর পক্ষে এবং একই সঙ্গে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে আপসহীন।

Advertisement

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। ফরাসি সংস্থা এয়ারবাসের এইচ১২৫ হেলিকপ্টারের ভারতে সংযোজন লাইন স্থাপন এবং ফরাসি ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্রের ভারতে উৎপাদন— এই ঘোষণাগুলি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির প্রতি আস্থারই প্রতিফলন। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেবল আমদানি নয়, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দেশীয় উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। একই সঙ্গে রাফাল যুদ্ধবিমানের অতিরিক্ত ক্রয় ভারতের বায়ুসেনার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যদিও রাফাল নিয়ে অতীতে বিতর্ক হয়েছে, বাস্তবতা হল— ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোর সঙ্গে ফরাসি প্রযুক্তির একটি গভীর ও স্থায়ী সংযোগ গড়ে উঠেছে।

Advertisement

তবে এই সম্পর্ককে কেবল ‘মিসাইল ও জেট’-এর পরিমাপে বিচার করা ভুল হবে। কৌশলগত খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা সম্পদের সন্ধানে দুই দেশের সমন্বয় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা বিপুল। মুম্বাইয়ে আয়োজিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ এই সহযোগিতার দিকনির্দেশই স্পষ্ট করেছে। ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা নির্ধারণ করে, এ কথা দুই দেশই বুঝতে পেরেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৮ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পর যখন পশ্চিমী বিশ্বের বড় অংশ দিল্লিকে কড়া সমালোচনার মুখে ফেলেছিল, তখন ফ্রান্স তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছিল। সেই সময়ের আস্থার ভিত্তিই আজকের সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে। ফ্রান্স ধারাবাহিকভাবে ভারতের নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক প্রযুক্তি সহযোগী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যনীতির অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন ভারত ও ফ্রান্সকে একে অপরের কাছে আরও প্রয়োজনীয় করে তুলেছে। দুই দেশই চায় এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে একক আধিপত্য নয়, বরং বহুমাত্রিক ভারসাম্য থাকবে। এই লক্ষ্য অর্জনে পারস্পরিক সহযোগিতা একটি বাস্তববাদী পদক্ষেপ।

তবে সম্ভাবনার পরিধি আরও বিস্তৃত। বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দুই দেশের সামর্থ্যের তুলনায় অপ্রতুল। উচ্চপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য শক্তি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ, সমুদ্র অর্থনীতি ও পরিকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। ফ্রান্স উচ্চগতির রেল, পারমাণবিক শক্তি ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে— এই ক্ষেত্রগুলিতে যৌথ প্রকল্প ভারতের উন্নয়ন অভিযাত্রায় গতি আনতে পারে।

একই সঙ্গে সতর্কতাও প্রয়োজন। প্রতিরক্ষা ক্রয় বা প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, মূল্য-আলোচনার স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেশীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষা অপরিহার্য। কৌশলগত অংশীদারিত্ব কখনও যেন নির্ভরশীলতায় রূপ না নেয়— ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ভারত-ফ্রান্স সম্পর্কের শক্তি তার স্থায়িত্বে। গভীর সমুদ্র থেকে সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া— এই উপমা কেবল কাব্যিক নয়; এটি সামরিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক সহযোগিতার বিস্তৃত পরিসরকে নির্দেশ করে। কিন্তু সম্পর্কের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন এই সহযোগিতা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার দিকে বাস্তব ফল দেবে।

মোদী-ম্যাক্রোঁ বৈঠক সেই সম্ভাবনারই দরজা আরও একটু খুলে দিল। এখন দায়িত্ব দুই সরকারের— ঘোষণার ঝলকানি পেরিয়ে তাকে বাস্তবায়িত করার পথে দৃঢ় ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ আন্তর্জাতিক অস্থিরতার এই সময়ে স্থিতিশীল অংশীদারিত্ব শুধু কূটনৈতিক সাফল্য নয়, জাতীয় স্বার্থ রক্ষারও এক অপরিহার্য হাতিয়ার।

Advertisement