নইলে পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?
‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’
বনানী-কুন্তলা ষোড়শী বনের বুক চিরে বেরিয়ে এসে পথ-হারা পথিককে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’
Advertisement
সেদিন দিশে–হারা পথিকের মুখে উত্তর যোগায়নি। সুন্দরের আঘাতে পথিকের মুখে কথা ফোটেনি।
পথিক সেদিন সত্যই পথ হারিয়েছিল।
Advertisement
হে আমার গহন বনের তরুণ-পথিক দল! আজ সেই বনানী-কুন্তলা ভৈরবী-সুতা আবার বনের বুক চিরে বেরিয়ে এসেছে— চোখে তার অসঙ্কোচ দৃষ্টির খড়গ— ধার, ভালে তার কাপালিকের আঁকা রক্ত-তিলক, হাতে তার অভয় তরবারি— সে আবার জিজ্ঞাসা করছে— ‘পথিক ! তুমি পথ হারাইয়াছ?’
উত্তর দাও, হে আমার তরুণ পথ-যাত্রী-দল! ওরে আমার রক্ত-যজ্ঞের পূজারী ভায়েরা! বল তোরাও কি আজ সৌন্দর্যাহত রূপ-বিমূঢ় পথহারা পথিকের মতো মৌন নির্বাক চোখে ঐ ভৈরবী রূপসীর পানে চেয়ে থাকবি? উত্তর দে মায়ের পূজার বলির নির্ভীক শিশু!
বল্ মাভৈ! আমরা পথ হারাই না! আমাদের পথ কখনো হারায় না। বল্ আমাদের এ-পথ চির-চেনা পথ। হাটের পথিকের পায়ে-চলার পথ আমাদের জন্য নয়। সিংহ শার্দূল-শঙ্কিত কণ্টক— কুণ্ঠিত বিপথে আমাদের চলা। ওগো ভৈরবী মেয়ে! এ রক্ত— পথিকের দল, নবকুমারের দল নয়। ভৈরবী রূপসী আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’
এবার বল আমার বন্য তরুণ দল, ‘ওগো, আমরা পথ হারাইয়াছি, বনের পথ হারায় নাই।
অকুণ্ঠিতা অনবগুণ্ঠিতা বন-বালার চোখে কুণ্ঠার ছায়া-পাত হোক, পরাজয়ের লাজ-অবগুণ্ঠন পড়ুক!
নিবিড় অরণ্য। তারই বুকে দোলে, দোলে, মহিরুহ সব দোলে— বনস্পতি দল দোলে-লতা-পাতা সব দোলে! দোলে তারা সবুজ খুনের তেজের বেগে। তারই মাঝে চলে— চলে আমার বন-হিংস্র বীরের দল। তাদরে পথ দেখায় কাপালিকের রক্ত-তিলক পরা ভৈরবী মেয়ে।
অদূরে কাপালিকের রক্ত-পূজার মন্দির। মন্দিরে রক্ত-ভুখারিনীর তৃষ্ণাবিহ্বল জিহ্বা দিয়ে টপটপ ক’রে পড়ছে কাঁচা খুনের ঝারা। দূরে হাজার কণ্ঠের ভৈরব-গান শোনা গেল—
‘তিমির হৃদয়-বিদারণ, জলদগ্নি নিদারুণ।
জয় সঙ্কট সংহর। শঙ্কর। শঙ্কর।’
রক্ত-পাগলি বেটির পায়ের চাপে শিব আর্তনাদ করে উঠল। রক্ত-মশাল করে ভৈরবপন্থীর কণ্ঠ শোনা গেল আরো কাছে—
‘বজ্র-ঘোষবাণী, রুদ্র শূলপাণি,
মৃত্যু-সিন্ধু-সন্তর। শঙ্কর! শঙ্কর!
আবার শিব মোচড় খেয়ে উঠল, কিন্তু শব তার বুকে চেপে।
মন্দির থরথর করে কাঁপতে লাগল। উলসিত বনানী ঝড়ের ফুঁ দিয়ে নাচতে লাগল। কাপালিকের রক্ত-আঁখি দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। আর দেরি নাই, ঐ আসে রক্ত-পূজার বলি। ছেড়ে দে বেটি, ছেড়ে দে শিবকে, কল্যাণকে উঠে দাঁড়াতে দে। ইন্দ্রের বজ্রে ঘন ঘন শঙ্খধ্বনি হতে লাগল।
মেঘডম্বরুতে বোধনের বাজনা বাজতে লাগল।
বিজলি মেয়ের বজ্র-কড়া নাড়ার মতো বাইরে দস্যি মেয়ে কড়কড় করে কড়া নেড়ে হেঁকে উঠল, ‘দোর খোলো, পূজা এসেছে।’
বাইরে ঝড়ের দোলার তালে তালে ভৈরবপন্থীর দল নাচতে লাগল
‘কি আনন্দ কি আনন্দ কি আনন্দ,
দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ,
নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে,
তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ’
ঝনঝন শব্দে মন্দির-দ্বার খুলে গেল। কাপালিক বেরিয়ে এল, নয়নে তার দারুণ হিংসা-বহ্নি, স্কন্ধে তার বিজয়-কৃপাণ। মন্দিরের অঙ্গনে নৃত্য চলতে লাগল— ‘তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ।’ ভৈরবী হাঁকলে, ‘আর দেরি কি ?’
***
বনানী তেমনি দোলে— দোলে— দোলে। একটা কারানি, একটা ব্যথিতার ক্রন্দনের মতো কি যেন দোলে দোলে বনানীর পাগলামিতে।
কখন পূজা শেষ হয়ে গেছে। কখন ঘণ্টা বাজল, কখন বলি দেওয়া হলো, তা কেউ জানলে না। শুধু মন্দিরের শুভ্র বেদী রক্তে ভেসে গেছে। শব-পাগলি রেটির চরণ শিবের বুক থেকে শিথিল হয়ে যেন নামতে চাইছে। বেটির পায়ে একরাশ কাঁচা হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করছে, যেন সদ্য-ছিন্ন রক্ত জবার
জীবন্ত কারানি।
(ক্রমশ)
Advertisement



