স্বপন কুমার মণ্ডল
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করেই মৌলবাদীদের মদতপুষ্ট পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে উঠেছিল ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালির বাতিস্তম্ভ— এটি এমন একটি আলোক উৎস, যা মৌলবাদী ধর্মবিদ্বেষীদের চোখে চিরকালই ছিল অস্বস্তিকর। সেই আলোকবর্তিকাকে নিভিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র যে সময়ের অপেক্ষায় ওত পেতে ছিল, তা আজ আর অস্বীকার করার অবকাশ নেই। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতীয় নির্বাচনের আগে জনপ্রিয় নেতা ওসমান হাদির আকস্মিক হত্যাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তাল পরিস্থিতিই সেই সুযোগ এনে দেয়। ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাতের অন্ধকারে ছায়ানট-এর সাততলা ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে চালানো হয় বর্বরোচিত ধ্বংসলীলা। এটি নিছক একটি ভবনের উপর আক্রমণ নয়, বরং ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের আত্মার উপর সরাসরি আঘাত।
Advertisement
ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে মৌলবাদীদের রাষ্ট্রে রূপান্তর করার পথে সনজিদা খাতুন এবং তাঁর গড়ে তোলা ছায়ানট বরাবরই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। সনজিদা খাতুনের মৃত্যুর পরেও তাঁর সৃষ্টি করা ছায়ানট-এর ছায়াই ছিল ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের শেষ আশ্রয়। সেই আশ্রয় থেকে তাদের উৎখাত করতেই এই আক্রমণ। তিলে তিলে গড়ে তোলা যে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি আজ মৌলবাদীদের শিকারে পরিণত হয়েছে, সেটিই প্রমাণ করে সনজিদা খাতুনের অবদান কতটা অপরিহার্য ও অবিস্মরণীয় ছিল।
Advertisement
যে মানুষ যত বড়, তাঁর আত্মত্যাগও তত গভীর ও মহিমান্বিত। স্বাচ্ছন্দ্যই যেখানে ত্যাগের প্রধান অন্তরায়, সেখানে সনজিদা খাতুনের নিরলস অধ্যবসায় ও সত্যনিষ্ঠ আত্মনিবেদন তাঁর সম্ভ্রান্ত বনেদি পরিবারের অভিজাত জীবনের পটভূমিতে এক অনন্য মহিমা লাভ করে। তাঁর পিতা কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক ও বিশিষ্ট পণ্ডিত। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিই সনজিদার শৈশব ও কৈশোরকে মুক্তমনা ও উদার চেতনায় গড়ে তোলে।
পরিবারের মধ্যেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে উন্মুক্ত পরিসর ছিল, সেখানেই তাঁর মানসিক নির্মাণ। ভাই কাজী আনোয়ার হোসেন ছিলেন স্বনামধন্য লেখক। আর যে সংসারে তিনি পরবর্তীতে প্রবেশ করেন, সেই সংসারও ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত রাবীন্দ্রিক চেতনায় ভরপুর। তাঁর স্বামী ওয়াহিদুল হক—সাংবাদিক, রবীন্দ্রসঙ্গীততত্ত্ববিদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠক, ছিলেন তাঁর আজীবনের সহযাত্রী। প্রায় সমবয়সী এই দুই মানুষ রবীন্দ্রনাথের মুক্তির অনন্ত আকাশকে নিজেদের জীবনের পথচিহ্ন করে নিয়েছিলেন। বাঙালি সত্তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে একাত্ম করার এই সাধনায় তাঁরা আজীবন সক্রিয় থেকেছেন।
ভাষা আন্দোলনের সময় সনজিদার বয়স মাত্র উনিশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্রী হয়েও তিনি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে রাজপথে নেমেছেন, রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। একুশে ফেব্রুয়ারির পরদিন, চারিদিকে ভয়ের আবহে, কামরুন্নেসা স্কুলের গলিতে সভা করে বক্তৃতা দিয়েছেন, কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। সেই গানই পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে তাঁকে গেয়ে শোনাতে হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর অনুরাগই তাঁকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যায়। ঢাকা কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স, বিশ্বভারতী থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর, পরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবনা নিয়ে গবেষণা— এই পথচলা ছিল তাঁর স্বাভাবিক উত্তরণ। তিনি রবীন্দ্রনাথকে শুধু পড়েননি, যাপন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মধ্যেই নিজের সত্তাকে খুঁজে পেয়ে তিনি কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দেওয়ার সাহস পেয়েছেন।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উদযাপন ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রের রবীন্দ্রবিরোধিতার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সেই আয়োজনের কেন্দ্রে ছিলেন সনজিদা খাতুন। সরকারি কলেজের শিক্ষক হয়েও তিনি ভয় উপেক্ষা করে মুক্তমঞ্চে গান গেয়েছেন, কখনও মুখে রুমাল বেঁধে, যাতে পরিচয় গোপন থাকে। এই আপসহীন মানসিকতাই তাঁকে অনন্য করে তোলে।
এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে ছায়ানট। পরে ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংগঠনটি পরিণত হয় বাঙালির সাংস্কৃতিক চর্চার এক শক্তিশালী পীঠস্থানে। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হলে রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখ উদযাপনের সূচনা করে ছায়ানট। সেখান থেকেই বাঙালির বৃহত্তম ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবের যাত্রা শুরু। আনন্দ শোভাযাত্রা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা, এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রসঙ্ঘের স্বীকৃতি— এই দীর্ঘ পথচলার নেপথ্যে সনজিদা খাতুনের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা অবিস্মরণীয়।
সচেতনভাবেই তিনি রাজনীতিকে দূরে রেখে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির আত্মশক্তিকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় শিল্পী-সাহিত্যিকদের সংগঠিত করা, শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করা— সব ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। স্বাধীনতার পরেও তাঁর সংগ্রাম থামেনি। ১৯৭৫-এর পর মৌলবাদী রাজনীতির উত্থানের বিরুদ্ধে তিনি আরও সক্রিয় হয়েছেন সংস্কৃতির পথে।
২০০১ সালে রমনার বটমূলে বোমা বিস্ফোরণের পর তাঁর উচ্চারণ—‘আমরা ত্রস্ত, তবে সন্ত্রস্ত নই’, যা আজও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের সাহসের মন্ত্র। ভয়কে অতিক্রম করে তিনি মানুষ গড়ার কাজে মন দেন। সেই ভাবনা থেকেই নালন্দার জন্ম। ওয়াহিদুল হকের মৃত্যুর পর আজীবন তিনি ছায়ানট-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের গান ছিল তাঁর জীবনের দীপশিখা। মানুষের মধ্যে মানবধর্মের ঐক্য গড়ে তোলাই ছিল তাঁর সাধনা। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন, ‘মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য, সেইটেকেই সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি’। এই মানবধর্মকেই সনজিদা খাতুন তাঁর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে রেখেছিলেন।
আজ যখন ছায়ানট-এর উপর বর্বরোচিত আক্রমণের ঘটনা ঘটে, তখন তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়। এটি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালির অস্তিত্বের উপর আঘাত। সনজিদা খাতুন যে বাতিস্তম্ভ জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন, সেই আলো নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টাই আজ স্পষ্ট। এই আক্রমণের পর বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের অস্তিত্ব সংকটের লড়াই যে আরও তীব্র ও কঠিন হয়ে উঠল, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
Advertisement



