আন্তর্জাতিক নারী দিবসে দেশের বিচারব্যবস্থার শীর্ষ থেকে যে আত্মসমালোচনার সুর শোনা গেল, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন, ভারতের বিচারব্যবস্থায় লিঙ্গসমতা এখনও অসমাপ্ত কাজ। এই স্বীকারোক্তি কেবল প্রতীকী নয়, বরং তা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর এক গভীর অসামঞ্জস্যের দিকে আঙুল তোলে।
পরিসংখ্যান নিজেই এই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করছে। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে ৩৩ জন বিচারপতির মধ্যে মাত্র একজন নারী। দেশের ২৫টি হাইকোর্টে মোট ৭৮১ জন কর্মরত বিচারপতির মধ্যে নারী বিচারপতির সংখ্যা মাত্র ১১৬, অর্থাৎ প্রায় ১৫ শতাংশ। আরও বিস্ময়কর তথ্য হল, এতদিনে হাইকোর্টে মোট ৫,১৬১টি নিয়োগের মধ্যে নারী বিচারপতি হয়েছেন মাত্র ২৯১ জন, যা মোটের মাত্র ৫.৬ শতাংশ। তারও চেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে সুপ্রিম কোর্টে আর কোনও নারী বিচারপতি নিয়োগ করা হয়নি।
Advertisement
এই বাস্তবতা এমন এক দেশে, যেখানে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, ৬৫ কোটি, নারী। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে বিচারব্যবস্থা দেশের অর্ধেক মানুষের জীবন, অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নিয়ে কাজ করে, সেই ব্যবস্থার শীর্ষ স্তরে তাদের প্রতিনিধিত্ব এত সামান্য কেন?প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তাঁর বক্তৃতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, নারী বিচারপতিরা আলাদা কোনও বিচারের মানদণ্ড আনেন না, কিন্তু তাঁরা একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার পরিসর নিয়ে আসেন।
Advertisement
এই কথাটি বিচারব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে। আইন কেবল ধারার ভাষা নয়, তা সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। পারিবারিক হিংসা, যৌন নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, সম্পত্তির অধিকার— এই সব বিষয়ের বিচার করতে গেলে সমাজে নারীর অভিজ্ঞতা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিচারব্যবস্থায় বৈচিত্র্য কেবল প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং ন্যায়বিচারের পরিধিকে আরও বাস্তবসম্মত ও সংবেদনশীল করে তোলার একটি প্রয়োজনীয় শর্ত।
এই প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধান বিচারপতি এনভি রামানার মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, সাংবিধানিক আদালতগুলিতে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের ইচ্ছা বা দৃঢ়তা যথেষ্ট ছিল না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনমন্ত্রীরা নিয়মিতভাবে হাইকোর্টগুলিকে নারী আইনজীবীদের নাম সুপারিশ করতে বললেও বাস্তবে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য শক্তভাবে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তবে তিনি একই সঙ্গে এটাও স্বীকার করেছেন যে, দায় কেবল সরকারের নয়, বিচারব্যবস্থাকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। কারণ জেলা ও নিম্ন আদালতগুলিতে প্রায় ৪০ শতাংশ বিচারকই নারী। অর্থাৎ প্রতিভা বা সক্ষমতার অভাব নেই। কিন্তু এই প্রতিভা উপরের স্তরে পৌঁছাতে পারছে না, এই ব্যবস্থাগত বাধাটিই আসল সমস্যা।
ভারতের বিচারব্যবস্থায় বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। কলেজিয়াম পদ্ধতি নিয়ে সরকার ও আদালতের মধ্যে টানাপোড়েন নতুন নয়। কিন্তু নারী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে এই বিতর্কের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়শই চাপা পড়ে যায়, তা হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে সচেতন অগ্রাধিকার।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত হাইকোর্ট কলেজিয়ামগুলিকে আহ্বান জানিয়েছেন যাতে নারী আইনজীবীদের নিয়োগকে ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়ম হিসেবে দেখা হয়। তিনি এমনকি এটাও বলেছেন যে বয়সের কঠোর সীমা পূরণ না করলেও যোগ্য নারী প্রার্থীদের বিবেচনা করা উচিত। এই বক্তব্য বিচারব্যবস্থার ভেতরে পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত দেয়।
ইতিহাস অবশ্য দেখায় যে পরিবর্তন সম্ভব।
২০২১ সালে তিনজন নারী বিচারপতির একসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ— হিমা কোহলি, বেলা এম ত্রিবেদী এবং বি ভি নাগারত্না— নিঃসন্দেহেএকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল। বিচারপতি নাগারত্না আগামী বছর ভারতের প্রথম নারী প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন সাফল্য দিয়ে কাঠামোগত বৈষম্য দূর করা যায় না।
প্রশ্নটি তাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের। বিচারব্যবস্থা যদি সত্যিই সমাজের আস্থা অর্জন করতে চায়, তবে তাকে সমাজের বৈচিত্র্যকেও প্রতিফলিত করতে হবে। নারীরা যখন আদালতের বেঞ্চে বসেন, তখন তা কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, তা হাজারো তরুণ আইনজীবীর কাছে একটি বার্তা— এই পথ তাদের জন্যও খোলা।
ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রে। বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সেই অন্তর্ভুক্তি বাস্তবে রূপ না পেলে ন্যায়বিচারের ধারণাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের বক্তৃতা যদি কেবল প্রতীকী উচ্চারণে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা করে, তবেই বলা যাবে— আদালতের অর্ধেক আসন সত্যিই পূর্ণ হওয়ার পথে এগোচ্ছে।
Advertisement



