• facebook
  • twitter
Monday, 9 March, 2026

বিশ্বজয়ের উল্লাস

ভারতীয় দল টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানে হারিয়ে শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নই হয়নি, তারা গড়েছে একাধিক নতুন ইতিহাস

আহমেদাবাদের বিশাল নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে রবিবার রাতের দৃশ্য ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দর্শকে পরিপূর্ণ গ্যালারি, পতাকার ঢেউ, আর আবেগে ভাসা একটি রাত্রি— সব মিলিয়ে যেন ক্রিকেট উৎসবের এক মহাকাব্যিক মুহূর্ত। ভারতীয় দল টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানে হারিয়ে শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নই হয়নি, তারা গড়েছে একাধিক নতুন ইতিহাস। এই জয়ে ভারত পরপর দ্বিতীয়বার টি-২০ বিশ্বকাপ জিতল এবং মোট তিনবার বিশ্বসেরা হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করল। একই সঙ্গে নিজেদের মাটিতে টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ের বিরল সাফল্যও এলো।

এই জয় নিছক একটি ট্রফি অর্জনের ঘটনা নয়, এটি ভারতীয় ক্রিকেটের দীর্ঘ যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ কয়েক বছর আগেও একই মাঠে বিশ্বকাপ ফাইনালের বেদনাদায়ক স্মৃতি বহন করতে হয়েছিল ভারতকে। সেই হতাশা, সমালোচনা ও প্রশ্নের ভার নিয়ে যে দলটি এগিয়ে চলেছিল, তারাই আজ আবার বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষে।
এই বিজয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন দুই ক্রিকেটার— সঞ্জু স্যামসন এবং যশপ্রীত বুমরা।

Advertisement

সঞ্জু স্যামসনের ৪৬ বলে ৮৯ রানের দুরন্ত ইনিংস ভারতের ব্যাটিংকে এক উজ্জ্বল উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে দলে সুযোগ না পাওয়া, কিংবা সুযোগ পেয়েও নিয়মিত জায়গা না পাওয়া— এই অভিজ্ঞতা তাঁর ক্রিকেটজীবনের বড় অংশ। কিন্তু বড় মঞ্চে তিনি প্রমাণ করলেন যে, প্রতিভা অপেক্ষা করতে জানে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের অধিকার আদায় করে নেয়।

Advertisement

অন্যদিকে বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব দিলেন জসপ্রীত বুমরা। তাঁর ৪ উইকেট মাত্র ১৫ রানে নিউজিল্যান্ডের সম্ভাবনাকে কার্যত শেষ করে দেয়। গত এক দশকে ভারতের বহু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের পেছনে তাঁর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ছিল বড় ভিত্তি। ফাইনালের মতো চাপের ম্যাচে সেই অভিজ্ঞতা আবারও দলের কাজে লাগল।

অবশ্য এই জয় কেবল দু’জন ক্রিকেটারের কৃতিত্ব নয়, এটি একটি দলগত সাফল্য। শুরুতেই সঞ্জু ও অভিষেক শর্মার দ্রুত ৯৮ রানের উদ্বোধনী জুটি ম্যাচের ভিত তৈরি করে দেয়। টি-২০ ফাইনালের মতো ম্যাচে এমন আক্রমণাত্মক সূচনা প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে ফেলে দেয়। ভারতের ব্যাটসম্যানরা সেই সাহসিকতাই দেখিয়েছেন, যা বড় ম্যাচ জিততে প্রয়োজন।

ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক রোহিত শর্মার জন্য এই জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক বছর আগে একই মাঠে বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজয়ের স্মৃতি তাঁর ক্যারিয়ারে এক বড় আক্ষেপ হয়ে ছিল। কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্যই এই, এখানে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ থাকে। সেই প্রত্যাবর্তনের গল্পই যেন রবিবার রাতে সম্পূর্ণ হলো। তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন ভারতের আগের দুই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি এবং কপিল দেব— যেন ভারতীয় ক্রিকেটের তিন প্রজন্মের এক প্রতীকী মিলন।

নিউজিল্যান্ডের দল অবশ্য সহজ প্রতিপক্ষ নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী। অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনারের নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ড দল ফাইনালে পৌঁছেছিল দৃঢ় পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে। কিন্তু ফাইনালের চাপ সামলাতে তারা ব্যর্থ হয়। শুরুতেই দ্রুত উইকেট হারিয়ে তাদের রানতাড়া কার্যত থমকে যায়।

এই জয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারতীয় ক্রিকেটের গভীরতা। একসময় ভারতের সাফল্য কয়েকজন তারকা ক্রিকেটারের ওপর নির্ভর করত। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটাররা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বড় মঞ্চে পারফর্ম করছে। ফলে দলের শক্তি শুধু অভিজ্ঞতার ওপর নয়, প্রতিভার বিস্তৃত ভাণ্ডারের ওপর দাঁড়িয়ে। তবে এই সাফল্যের মধ্যেও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। ক্রিকেটে জয়-পরাজয় চক্রাকার। আজকের সাফল্য আগামী দিনের নিশ্চয়তা নয়। তাই এই জয়কে উদযাপন করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনাও জরুরি।

তরুণ ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়া, ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা— এই সব বিষয়েই নজর রাখতে হবে।তবু আপাতত ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য এটি আনন্দের সময়। লক্ষাধিক দর্শকের সামনে, নিজের মাটিতে, বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাস— এ এক বিরল মুহূর্ত। এই জয় শুধু একটি ট্রফির নয়, এটি আত্মবিশ্বাসের, প্রত্যাবর্তনের এবং নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। রবিবার রাতের আহমেদাবাদ তাই শুধু একটি ম্যাচের স্মৃতি নয়, এটি ভারতীয় ক্রিকেটের এক নতুন আত্মবিশ্বাসের ঘোষণা।

Advertisement