অর্থনীতিতে কিছু সিদ্ধান্ত আছে যার ভালো এবং মন্দ দুটো দিকই একসঙ্গে দেখা যায়। সুদের হার বাড়ানো তেমনই একটি সিদ্ধান্ত। এতে একদিকে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার গতি কমতে পারে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বাড়ি-গাড়ির ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে যায় এবং ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করে। তাই সুদের হার বাড়ানোকে শুধু মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানোর অঙ্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের বৃদ্ধি, চাকরি, বিদেশি টাকার আসা-যাওয়া এবং টাকার দামের স্থিতিশীলতা।
দীর্ঘ বিরতির পর গত ৭ অক্টোবর ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ করেছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির পর এই প্রথম রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদ বাড়ালো। শুধু তাই নয়, ব্যাঙ্ক তার অবস্থান ‘নিরপেক্ষ’ থেকে বদলে ‘ক্যালিব্রেটেড টাইটেনিং’ বা ধাপে ধাপে কড়াকড়ির দিকে নিয়ে গেছে। এর অর্থ হলো, মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়লে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ভবিষ্যতে আরও কড়া পদক্ষেপ নিতে পারে।
প্রশ্ন হলো, হঠাৎ সুদ বাড়ানোর প্রয়োজন হলো কেন? এর উত্তর খুঁজতে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের তথ্যের দিকে তাকাতে হবে। ওই মাসে দেশে খুচরা মূল্যবৃদ্ধি বা রিটেল ইনফ্লেশন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৮২ শতাংশে। তার মধ্যে শুধু খাবার জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি ছিল ৫.৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে খাবারের দাম গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে।
তবে সব খাবারের দাম একভাবে বাড়েনি। আগস্টে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৪৮.২৭ শতাংশ এবং আদার দাম বেড়েছে ৭৩.৮২ শতাংশ। আবার টম্যাটো ও আলুর দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে। এর অর্থ, মূল্যবৃদ্ধি সব জায়গায় নয়, কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্যের সরবরাহে ঘাটতির
জন্য হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানির দাম। ভারত তার তেলের বড় অংশ বিদেশ থেকে কেনে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রল-ডিজেল নয়, পরিবহন, চাষ এবং কারখানায় উৎপাদনের খরচও বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কেনা প্রতিটি জিনিসের উপর পড়ে।
এই ছবিটা আরও স্পষ্ট হয় পাইকারি মূল্যবৃদ্ধি দেখলে। আগস্টে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধি বেড়ে ৯.৯২ শতাংশে পৌঁছেছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে কয়েক মাস পর তার প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ে।
আরেকটি কারণ হলো মানুষের কেনার চাহিদা বেড়ে যাওয়া। এই বছর ভারতের অর্থনীতি খুব দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জিডিপি বেড়েছে ৭.৮ শতাংশ। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নিজেও এই বছরের বৃদ্ধির হিসাব বাড়িয়ে ৭.১ শতাংশ করেছে। দেশের অর্থনীতি বাড়া অবশ্যই ভালো খবর। মানুষের হাতে টাকা আসছে, কাজ বাড়ছে। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। অর্থনীতি যখন খুব দ্রুত বাড়ে, তখন ব্যাঙ্কগুলোও বেশি করে ঋণ দেয়। মানুষ সহজে ঋণ পেয়ে বাড়ি, গাড়ি, ফ্রিজ, টিভি বেশি করে কিনতে থাকে। বাজারে চাহিদা হু-হু করে বেড়ে যায়। অন্যদিকে, জোগান বা সাপ্লাই সেই গতিতে বাড়ে না। কারখানায় একটি জিনিস তৈরি করতে সময় লাগে, চাষের ফসল হতে সময় লাগে। ফলে বাজারে ক্রেতা বেশি, কিন্তু মাল কম। আর ক্রেতা বেশি, মাল কম হলেই দাম বাড়ে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভয়টা ঠিক এখানেই। এখন তো পেঁয়াজ, তেলের জন্য দাম বাড়ছে, কিন্তু যদি এই বাড়তি চাহিদার জন্য সব জিনিসের দাম একসঙ্গে বাড়তে শুরু করে, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি আর একটি দুটি জিনিসে আটকে থাকবে না, পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়বে। তাই আগে থেকেই চাহিদাটাকে একটু লাগাম পরাতে চাইছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। এখনকার মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ হলো পেঁয়াজ-আদার মতো খাদ্যপণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়া। সুদের হার বাড়িয়ে মানুষের ঋণ নেওয়া কমানো যায়, কিন্তু সুদ বাড়ালে পেঁয়াজের ফলন বাড়বে না, বা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমবে না। তাহলে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কেন সুদ বাড়ালো? এর দুটি লক্ষ্য আছে।
প্রথমত, খাবার ও তেলের দাম বাড়ার প্রভাব যাতে অন্য সব জিনিসে না ছড়িয়ে পড়ে। একে অর্থনীতির ভাষায় বলে মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশা আটকানো। একবার মানুষ ভাবতে শুরু করল যে, সব জিনিসের দাম বাড়বে, তখন সব দোকানদারই দাম বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, ঋণ নিয়ে বাড়ি, গাড়ি কেনার মতো চাহিদাকে একটু নিয়ন্ত্রণে রাখা। সুদ বাড়লে ঋণ ব্যয়বহুল হয়, মানুষ একটু ভেবেচিন্তে খরচ করে।
কিন্তু এর একটি মূল্য আছে। যাদের হোম লোন, গাড়ির লোন আছে, বিশেষ করে যাদের লোন রেপো রেটের সঙ্গে যুক্ত, তাদের মাসিক কিস্তি বেড়ে যাবে। হাতে খরচ করার মতো টাকা কমে যাবে। ছোট ও মাঝারি শিল্প, যারা ব্যাঙ্কের ঋণের উপর চলে, তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। নতুন চাকরি তৈরির গতি কমতে পারে।
এই সুদ বাড়ানোর পিছনে আরেকটি বড় কারণ হলো বিদেশি বিনিয়োগ এবং টাকার দাম। বিষয়টি সহজ করে বোঝা যাক। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী ভারতের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে বেশি লাভের আশা করতে পারে, কিন্তু এখানে ঝুঁকিও বেশি। অন্যদিকে, আমেরিকার সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ অনেক বেশি নিরাপদ। আমেরিকায় সুদ বাড়লে সেই বন্ডে লাভও বাড়ে। তখন অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকি না নিয়ে টাকা আমেরিকায় সরিয়ে নেয়। তার উপর যদি ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমার ভয় থাকে, তাহলে তারা আরও দ্রুত টাকা তুলে নেয়।
এই মুহূর্তে ঠিক সেটাই হচ্ছে। রয়টার্সের ৮ অক্টোবরের রিপোর্ট বলছে, ২০২৬ সালে ভারতের শেয়ার ও বন্ড বাজার থেকে বিদেশি টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। ভারত ও আমেরিকার সুদের ফারাক কমে যাওয়া এবং ডলার শক্তিশালী হওয়া এর একটি কারণ। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদ বাড়িয়ে চেষ্টা করছে যাতে ভারতের বাজারে বিনিয়োগ আকর্ষণীয় থাকে এবং টাকার উপর চাপ কমে। কিন্তু ০.২৫ শতাংশ সুদ বাড়িয়েই বিদেশি টাকা ফিরে আসবে বা টাকা শক্তিশালী হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সুদ বাড়লে কিছু মানুষের লাভও হয়। যাঁরা ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখেন, বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকরা, তাঁরা আমানতে বেশি সুদ পেতে পারেন। সব মিলিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে এখন দুই দিক সামলানোর চ্যালেঞ্জ। একদিকে খাবার ও জ্বালানির দাম থেকে তৈরি হওয়া মূল্যবৃদ্ধিকে আটকাতে হবে, অন্যদিকে সুদ বাড়িয়ে বৃদ্ধির গতি একেবারে থামিয়ে দেওয়া যাবে না। এই ভারসাম্য শুধু রিজার্ভ ব্যাঙ্ক একা রক্ষা করতে পারবে না। খাবারের সরবরাহ ঠিক রাখা, গুদাম ও পরিবহন ব্যবস্থা ভালো করা, বাজারে মজুতদারি আটকানো এবং জ্বালানির দামের প্রভাব সামলাতে সরকারকেও একই সঙ্গে কাজ করতে হবে। অর্থনীতির সাফল্য শুধু জিডিপি কত বাড়লো তা দিয়ে মাপা যায় না। মানুষের আয় দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন।




