• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 25 October, 2026

দুর্গাপুজোর আনন্দের মধ্যে বিপর্যয়

প্রশাসনের দায়ও কম নয়। শুধু পুজো কমিটির আশ্বাসের উপর নির্ভর করলে চলবে না। মণ্ডপের নিরাপত্তা, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ, সর্বোচ্চ দর্শনার্থীর সংখ্যা এবং জরুরি অবস্থায় মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আগেই পরীক্ষা করতে হবে। পুলিশ, দমকল, প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকা চাই।

দুর্গাপুজোর আনন্দের মধ্যে বিপর্যয়

Image: SNS

কলকাতার দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এ শহরের মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সারা বছর ধরে মানুষ এই চার-পাঁচটি দিনের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড়, আলোর রোশনাই, প্রতিমার বৈচিত্র্য— সব মিলিয়ে কলকাতা এক অন্য রূপ ধারণ করে। কিন্তু চোরবাগানের দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু সেই আনন্দের ছবিকে শোকের অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছে। যে উৎসবকে ঘিরে মানুষের এত আবেগ, সেখানে এমন প্রাণহানি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দায়িত্ববোধের সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।

কলকাতার বহু প্রবীণ মানুষের কাছে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে এমন ভয়াবহ মৃত্যুর ঘটনা প্রায় কল্পনার বাইরে। এত মানুষের সমাগম হবে, বৃষ্টি হবে, দর্শনার্থীরা আশ্রয় খুঁজবেন— এ সবই স্বাভাবিক সম্ভাবনা। তা হলে এই পরিস্থিতি সামলানোর যথেষ্ট ব্যবস্থা ছিল না কেন? চোরবাগানের মণ্ডপে সরু প্রবেশপথ, পর্যাপ্ত বেরোনোর রাস্তার অভাব, প্রবল বৃষ্টি এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে ত্রুটি— সব মিলিয়ে বিপদ তৈরি হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। তার সঙ্গে একটি ঘোষণাও মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়িয়ে থাকতে পারে। যে বিপদের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব ছিল, তা ঠেকানোর ব্যবস্থা কেন করা গেল না, সেটিই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।

২০১৫ সালে দেশপ্রিয় পার্কে বিশাল দুর্গাপ্রতিমাকে ঘিরে বিপুল ভিড় জমেছিল। সেই ভিড়ের চাপে ১১ জন আহত হন। প্রাণহানি না ঘটলেও ঘটনাটি সতর্কবার্তা দিয়েছিল। বড় প্রতিমা, অভিনব মণ্ডপ কিংবা বিশেষ আকর্ষণ দর্শনার্থীর সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। সেই অনুযায়ী প্রবেশ ও প্রস্থানের ব্যবস্থা না থাকলে বিপদ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। চোরবাগানের ঘটনা দেখিয়ে দিল, আগের সতর্কবার্তা থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নেওয়া হয়নি।

এই ঘটনায় পুজো কমিটির সম্পাদক ও সহ-সভাপতি-সহ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে গ্রেপ্তার মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে বিশেষ তদন্তকারী দল এই দুর্ঘটনার তদন্ত করছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হবে। শুধু যাঁরা ঘটনাস্থলে ভিড় সামলাচ্ছিলেন, তাঁদের দায়ী করে তদন্ত শেষ করা চলবে না। মণ্ডপের নকশা কে অনুমোদন করেছিলেন? কত মানুষ সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন, তা কে নির্ধারণ করেছিলেন? জরুরি অবস্থায় বেরিয়ে যাওয়ার পথ যথেষ্ট ছিল কি না, তা কে পরীক্ষা করেছিলেন? নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যাঁদের হাতে ছিল, তাঁদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা দরকার।

পুজো কমিটির পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যুক্ত থাকার যে খবর সামনে এসেছে, তাতে তদন্তের স্বচ্ছতা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। কারও সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগ থাকলেই তাঁকে দোষী বলা যায় না। আবার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ যেন তদন্তের আওতার বাইরে না থাকেন। দায়িত্ব যত উঁচু স্তরেই থাকুক, প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জবাবদিহি করতে হবে।

এই প্রসঙ্গে পুজোর স্বেচ্ছাসেবকদের কথাও ভাবতে হবে। ভিড় সামলানো, দর্শনার্থীদের পথ দেখানো এবং বিপদের সময় সাহায্য করার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ভুল সিদ্ধান্তের দায় যদি তাঁদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে ভবিষ্যতে স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করতে উৎসাহ হারাবেন। তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, স্পষ্ট দায়িত্ব এবং বিপদ বুঝলে ভিড়ের প্রবেশ বন্ধ করার ক্ষমতা দিতে হবে। ইচ্ছাকৃত অবহেলা, গুরুতর গাফিলতি এবং অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে পার্থক্য করাও জরুরি।

প্রশাসনের দায়ও কম নয়। শুধু পুজো কমিটির আশ্বাসের উপর নির্ভর করলে চলবে না। মণ্ডপের নিরাপত্তা, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ, সর্বোচ্চ দর্শনার্থীর সংখ্যা এবং জরুরি অবস্থায় মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আগেই পরীক্ষা করতে হবে। পুলিশ, দমকল, প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকা চাই।

দুর্গাপুজোর জাঁকজমক বাড়ানোর প্রতিযোগিতা মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। উনিশটি প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই শিক্ষা যেন কয়েক দিনের শোকের মধ্যে হারিয়ে না যায়। প্রয়োজন ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা। উৎসবের সার্থকতা মানুষের আনন্দে, আতঙ্কে নয়। আগামী দিনে কলকাতার দুর্গাপুজো আবার আনন্দের প্রতীক হয়ে উঠুক, মৃত্যুর স্মারক নয়— এটাই আজ শহরবাসীর প্রত্যাশা।