• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 25 October, 2026

রাষ্ট্রসঙ্ঘের আসন্ন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে ভারতের চাওয়া পাওয়া

এই প্রসঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার আন্তর্জাতিক তহবিলের কার্যকর ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। যে জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, অথচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের কাছে সহায়তা দ্রুত পৌঁছনো নিশ্চিত করতে হবে এবং সেটা করতে এই মঞ্চকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের আসন্ন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে ভারতের চাওয়া পাওয়া

File Photo

আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তলিয়া শহরে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১। বিশ্ব উষ্ণায়ন মোকাবিলায় এই সম্মেলনের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নতুন প্রতিশ্রুতির উপর নয়, বরং পুরনো প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে তার উপরেও। ভারতের কাছে এই সম্মেলন তাই একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর মঞ্চ, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি দাওয়া তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

ভারতের অবস্থানের কেন্দ্রে মূলতঃ তিনটি দাবি— জলবায়ু পরিবর্তন রোধে অর্থায়ন বৃদ্ধি, উন্নত প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং অভিযোজনের বা অ্যাডাপ্টেশনের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা। উন্নতিশীল দেশগুলির জন্য এই জিনিসগুলো আদায় করার ক্ষেত্রে ভারত ঠিক কী ভূমিকা নিতে পারে আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে সেটাই দেখার। ভারতের বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তনের দায় সব দেশের সমান নয়। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে উন্নত দেশগুলি বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়েছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন অভিঘাত বহন করছে বহু উন্নয়নশীল দেশ, যাদের মাথাপিছু নির্গমন তুলনামূলকভাবে কম এবং যাদের উন্নয়নের চাহিদা এখনও বিপুল। তাই ‘সাধারণ কিন্তু পৃথকীকৃত দায়িত্ব এবং নিজ নিজ সামর্থ্য’—অর্থাৎ কমন বাট ডিফারেন্সিয়াল রেসপন্সিবিলিটিজ এন্ড রেস্পেক্টিভ কেপেবিলিটিজ অর্থাৎ সিবিডিআর-আরসি নীতির বাস্তব প্রয়োগের জন্য ভারত জোরালো দাবি তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ভারত উন্নত দেশগুলির কাছ থেকে স্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য ও সহজে ব্যবহারযোগ্য আর্থিক সহায়তা চাইবে। শুধু ঋণ নয়, অনুদান এবং স্বল্পসুদের অর্থায়নের ব্যবস্থা বাড়ানো জরুরি, যাতে জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবিলার খরচ উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। প্যারিস চুক্তির ৯.১ অনুচ্ছেদে উন্নত দেশগুলির আর্থিক সহায়তার দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই দায় কীভাবে বাস্তবে পূরণ হবে, তার স্পষ্ট রূপরেখা ভারত চাইতে পারে। পাশাপাশি সৌরশক্তি, ব্যাটারি, সবুজ হাইড্রোজেন এবং জলবায়ু-সহনশীল পরিকাঠামো নির্মাণে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বাধা দূর করাও জরুরি।

কপ-৩১ এ জাস্ট ট্রাঞ্জিশন বা ন্যায্য রূপান্তরের প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পাবে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে পরিচ্ছন্ন শক্তির দিকে যাওয়া প্রয়োজন, কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যেন জীবিকা হারিয়ে আরও অসহায় না হন। ভারতের মতো দেশে বিদ্যুৎ, শিল্প, পরিবহন ও কর্মসংস্থানের চাহিদা একসঙ্গে বিবেচনা না করে দ্রুত জ্বালানি পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।

ভারতের উচিত এমন একটি ন্যায্য রূপান্তর কাঠামোর দাবি করা, যেখানে প্রতিটি দেশের নিজস্ব উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়ার অধিকার থাকবে। কয়লাখনি ও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, নতুন শিল্পে বিনিয়োগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। ভারতের সমর্থন থাকা উচিত এমন একটি কার্যকর জাস্ট ট্রানজিশন মেকানিজমের প্রতি, যা উন্নয়নশীল দেশগুলিকে অর্থ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা দেবে; কিন্তু তাদের উপর একতরফা বা অভিন্ন নীতি চাপিয়ে দেবে না। একই সঙ্গে ন্যায্য রূপান্তর যেন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার অজুহাত না হয়, সেটা দেখাও ভীষণ জরুরি।

ভারতের জলবায়ু-কূটনীতিতে সুন্দরবনের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা দরকার। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এই বদ্বীপ অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার বিস্তার, নদীভাঙন এবং কৃষিজমির ক্ষতির মতো একাধিক বিপদের সম্মুখীন। আমফান, বুলবুল ও আয়লার মতো ঘূর্ণিঝড় দেখিয়েছে, জলবায়ু বিপর্যয় কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি মানুষের বাসস্থান, জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও নিঃসন্দেহে একটা বড় সংকটের সৃষ্টি করে।

কপ-৩১-এর আলোচনায় সুন্দরবনের নাম সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে থাকবে, এমন নিশ্চয়তার কথা এখনই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু ভারতের উচিত এই অঞ্চলকে জলবায়ু অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা। ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার, নদী ও বাঁধের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা, নিরাপদ আশ্রয়, লবণসহিষ্ণু কৃষি এবং বিকল্প জীবিকার জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন দাবি করা অবশ্যই দরকার এবং সেটা এই মঞ্চেই সবচেয়ে যথাযথ হবে। সুন্দরবনের মানুষের অভিজ্ঞতা দেখাতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্থানীয় জ্ঞান ও মানুষের অংশগ্রহণ কতটা জরুরি।

এই প্রসঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার আন্তর্জাতিক তহবিলের কার্যকর ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। যে জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, অথচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের কাছে সহায়তা দ্রুত পৌঁছনো নিশ্চিত করতে হবে এবং সেটা করতে এই মঞ্চকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।

কপ-৩১-এ ভারতের সাফল্য শুধু কতগুলি দাবি জানানো হল, তার উপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে সেই দাবিগুলোকে কতটা কার্যকরী আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় রূপান্তরিত করা গেল তার উপর। একদিকে ভারতকে পরিচ্ছন্ন শক্তির প্রসার, নির্গমন হ্রাস এবং নিজস্ব জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে; অন্যদিকে উন্নত দেশগুলির আর্থিক ও প্রযুক্তিগত দায়বদ্ধতার প্রশ্নেও দৃঢ় থাকতে হবে।

ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকা তাই হবে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে কৃত্রিম বিরোধ তৈরি না করে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধানের পথ দেখানো। আর সেই কূটনীতির সাফল্য মাপা হবে সুন্দরবনের মতো বিপন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ হল, কৃষক ও শ্রমিক কতটা সুরক্ষা পেলেন এবং জলবায়ু সহায়তা বাস্তবে কতটা পৌঁছল— তার ভিত্তিতে। আন্তলিয়ায় ভারতের কণ্ঠস্বর যদি এই বাস্তবতাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবেই জলবায়ু ন্যায়বিচারের পথে এক ধাপ এগোনো সম্ভব হবে।