• facebook
  • twitter
Tuesday, 31 March, 2026

স্মৃতির বিনাশ ও প্রতিরোধের জন্ম: যুদ্ধে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভূমিকা

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যুদ্ধের ধ্বংসলীলাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যে নৈতিক ও আইনি কাঠামো গড়ে তুলেছে, তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন (বা হেগ সনদ)।

সুদীপ ঘোষ

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে, কোনও জাতিকে পরাস্ত করতে কেবল তার সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করাই যথেষ্ট নয়। একটি জাতির আত্মাকে বিপর্যস্ত করতে হলে তার সামষ্টিক স্মৃতি, জাতীয় প্রতীক এবং প্রস্তরলিপিতে খোদিত ইতিহাসকে ধ্বংস করতে হয়। অথচ, গবেষণায় দেখা যায়, এ ধরনের সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞ শেষ পর্যন্ত আক্রমণকারীর জন্যই সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভ্রান্তি ও আত্মঘাতী পদক্ষেপে পরিণত হয়। ২০২৬ সালের বসন্তে ইরান-বিরোধী মার্কিন-ইজরায়েলি সামরিক অভিযান যখন পারস্যের আকাশে অগ্নিবর্ষণ করছে, তখন ধ্বংসের পরিসংখ্যান কেবল মানুষের প্রাণহানি বা ভৌত পরিকাঠামোর পতনেই সীমাবদ্ধ নেই; এই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ছে একটি প্রাচীন সভ্যতার দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি। আর সেই স্মৃতির উপর আঘাতই ধীরে ধীরে এই সংঘাতের প্রকৃত চরিত্রকে উন্মোচিত করছে। তেহরানের গোলেস্তান প্রাসাদের ক্ষতবিক্ষত দেওয়াল কিংবা ইসফাহানের নকশ-ই-জাহান চত্বরের নিঃশব্দ আতঙ্ক— এগুলো কেবল স্থাপত্যের কাঠামোগত ক্ষতি নয়, বরং এক জাতির আত্মপরিচয়ের উপর চরম আঘাত। আলি কাপু প্রাসাদের অলঙ্কৃত ছাদে যখন বিস্ফোরণের কম্পন পৌঁছায়, তখন তা কেবল জড় পাথরকে নয়, সমগ্র ইতিহাসকে প্রকম্পিত করে। কারণ, সভ্যতা কখনোই কেবল বর্তমানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না; এটি অতীতের সঙ্গে এক নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ, যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি খোদাই করা নকশা একেকটি স্মৃতির ভাষ্যকার।

Advertisement

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যুদ্ধের ধ্বংসলীলাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যে নৈতিক ও আইনি কাঠামো গড়ে তুলেছে, তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন (বা হেগ সনদ)। এই আন্তর্জাতিক চুক্তির মূল ভিত্তি হলো এই উপলব্ধি যে, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা যেমন মানবতাবিরোধী অপরাধ, তেমনি একটি জাতির সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে মুছে ফেলার চেষ্টাও সমতুল্য এক সহিংসতা। কিন্তু বাস্তব ভূ-রাজনীতি প্রায়শই এই বোধকে অস্বীকার করে। যুদ্ধের উন্মত্ততা যখন যৌক্তিকতাকে ছাপিয়ে যায়, তখন আন্তর্জাতিক আইন পরিণত হয় নিছক কাগুজে দলিলে, আর ইতিহাস পরিণত হয় ধ্বংসের উপাদানে।

Advertisement

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের পেছনে আক্রমণকারীদের যে কৌশলগত যুক্তি কাজ করে, তা আপাতদৃষ্টিতে সরল: একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে হলে তার জাতীয় প্রতীকগুলোকে ভেঙে ফেলতে হবে, তার গৌরবকে অবমাননা করতে হবে এবং তার অতীতকে মুছে দিতে হবে। কিন্তু এখানেই ইতিহাস তার সবচেয়ে কঠিন পাল্টা-প্রশ্নটি উত্থাপন করে— একটি জাতির স্মৃতিকে ধ্বংস করে কি সত্যিই তাকে চিরতরে পরাজিত করা সম্ভব? নাকি সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই তার প্রতিরোধ স্পৃহা আরও সুদৃঢ় হয়ে ওঠে?

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের কভেন্ট্রি ক্যাথেড্রাল ধ্বংস হওয়ার পর ব্রিটিশদের মনোবল ভেঙে পড়েনি; বরং সেই ধ্বংসস্তূপই হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের অদম্য প্রতীক। বসনিয়া যুদ্ধে ঐতিহাসিক মোস্তার সেতু ধ্বংস হওয়ার পরও সেই সেতু মানুষের মনস্তত্ত্বে আরও দৃঢ়ভাবে পুনর্নির্মিত হয়েছে। একইভাবে, সিরিয়ার পালমিরা প্রাচীন নগরী যখন উগ্রপন্থীদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তখন সেই ধ্বংসযজ্ঞ রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে এক নতুন বৈধতা এনে দেয়— ‘আমরাই রক্ষা করব আমাদের ঐতিহ্য’— এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে।এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তগুলো একটি গভীর সমাজতাত্ত্বিক সত্যের দিকে নির্দেশ করে: জাতীয় পরিচয় কোনো বিমূর্ত বা কাগুজে ধারণা নয়; এটি আবেগ, স্মৃতি এবং সম্মিলিত ইতিহাসের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক নির্মাণ। যখন সেই নির্মাণের ওপর বহিঃশত্রুর আঘাত আসে, তখন একটি জাতির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা সামাজিক বিভাজনগুলো ম্লান হয়ে যায় এবং মানুষ এক নতুন ঐক্যের সন্ধান পায়। যে শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই শাসনই তখন জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়।

ইরানের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও অভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার প্রতিফলন দৃশ্যমান। প্রাথমিকভাবে যে সামরিক সংঘাতকে কেউ কেউ শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর আঘাত সেই ধারণাকে দ্রুত পরিবর্তিত করছে। যুদ্ধটি এখন আর কেবল একটি সরকারের বিরুদ্ধে নয়; এটি ক্রমশ সমগ্র ইরানি জাতির অস্তিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে অনুভূত হচ্ছে। জেরুজালেমের মতো বহুধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতেও যখন এই সংঘাতের প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায়, তখন তা কেবল ভৌগোলিক সীমারেখাকেই অতিক্রম করে না, বরং সভ্যতার গভীরতম স্তরগুলোকেও আলোড়িত করে।

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক কৌশলগত প্রশ্ন উঠে আসে— যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি কেবল ভূখণ্ড দখল, নাকি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সম্মতি আদায়? আধুনিক সামরিক চিন্তাধারা ক্রমশ এই উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে স্থানীয় জনগণের সমর্থন ও সম্মতির ওপর। আর সেই সমর্থন অর্জনের পূর্বশর্ত হলো সম্মান— বিশেষত একটি জাতির দীর্ঘস্থায়ী ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।

সুতরাং, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা কেবল একটি নৈতিক স্খলন নয়; এটি এক গভীর কৌশলগত অজ্ঞতা। এটি শত্রুকে দুর্বল করার পরিবর্তে তাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তোলে, একটি খণ্ডিত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং যুদ্ধের মূল লক্ষ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যে আগুন দিয়ে একটি জাতির স্মৃতি পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়, সেই আগুনই শেষ পর্যন্ত সেই জাতির আত্মপরিচয়কে আরও প্রোজ্জ্বল করে তোলে।

সম্ভবত এই কারণেই ইতিহাস বারবার আমাদের সতর্ক করে— একটি উপাসনালয়, একটি রাজপ্রাসাদ বা একটি প্রাচীন নগরী ধ্বংস করার অর্থ কেবল ইট-পাথর চূর্ণ করা নয়; এটি একটি জাতির আত্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। আর আত্মার বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে কখনোই সহজে জয়লাভ করা যায় না। বরং সেই যুদ্ধই হয়ে ওঠে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, সবচেয়ে অনিশ্চিত এবং শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রূপে আত্মঘাতী।

Advertisement