• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 3 June, 2026

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

বুধবার বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু তাঁকে বিরোধী দলনেতার জন্য নির্ধারিত কক্ষের চাবি তুলে দেন

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার রাজনৈতিক সমীকরণে এল নতুন মোড়। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের অন্দরে দলের একাধিক সিদ্ধান্ত ও কাজ নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল তার ফলস্বরূপই এদিন এই নতুন বিরোধী দল স্বীকৃতি পেয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। বুধবার বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু তাঁকে বিরোধী দলনেতার জন্য নির্ধারিত কক্ষের চাবি তুলে দেন। এর মাধ্যমে বিধানসভায় ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক নিয়ে বিরোধী শিবিরের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। যদিও এই নতুন বিরোধী দলের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চাইছেন বলে দাবি করেছেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বিধায়ক তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫৮ জন বিধায়ক লিখিতভাবে সমর্থন জানিয়েছেন এবং আরও দু’জনের সম্মতি রয়েছে, ফলে সমর্থকের সংখ্যা ৬০-এ পৌঁছতে পারে। তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের সমর্থন থাকায় তাঁরাই এখন প্রকৃত পরিষদীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

নতুন বিরোধী দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ঋতব্রত জানান, বিধানসভায় তাঁরা দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধীর ভূমিকা পালন করবেন। সরকারের জনমুখী ও ইতিবাচক পদক্ষেপকে সমর্থন করা হবে, তবে জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে সরব হবেন। তাঁর কথায়, ‘শাসক দলের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই হবে, তবে তা হবে গণতান্ত্রিক ও যুক্তিনির্ভর।’

পরিষদীয় দলের নতুন কাঠামোও ঘোষণা করা হয়েছে। মুখ্য সচেতক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আখরুজ্জামান। ডেপুটি লিডার করা হয়েছে জাভেদ আহমেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, শিউলি সাহা এবং সন্দীপন সাহাকে। এই সংক্রান্ত চিঠিও স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া এই চিঠিতে বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কদের দাবি ছিল, তাঁদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। এদিন ঋতব্রত জানিয়ে দেন পরিষদীয় দলের প্রধান পরামর্শদাতা এবং দলনেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখেই তাঁরা চলতে চান।

কিন্তু তৃণমূলের পরিষদীয় দলনেতা বা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় নয়, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম মনোনীত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, তাঁদের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও রাজনৈতিক যোগাযোগ নেই। তাঁর দাবি, নতুন নেতৃত্ব সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্বাসী এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে দলগত মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিতর্কের জেরেই এর সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছেন বিধায়করা। এ নিয়ে আখরুজ্জামান জানান, ‘আমাদের দু’বার কালীঘাটে ডাকা হয়েছিল, আমরা গিয়েছিলাম। কিন্তু বিরোধী দলনেতা স্থির করার ক্ষেত্রে আমাদের একটা কথাও মানা হয়নি। উল্টে যেভাবে রেজোলিউশনের নামে স‌ই জাল করা হয়েছে, সেটা অত্যন্ত লজ্জার।’

এর পাশাপাশি শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব সংক্রান্ত চিঠিতে একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, কয়েকটি স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। সেই অভিযোগ সামনে আনেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। পরে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে সিআইডি এবং একাধিক বিধায়কের সঙ্গে কথা বলে। আর এই ঘটনার নেপথ্যে তৃণমূলের ২ বিধায়কের হাত থাকার বিষয়টি জানতে পেরে দল থেকে ঋতব্রত ও সন্দীপনকে বহিষ্কার করা হয়।

অন্যদিকে, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মঙ্গলবার বিধানসভার স্পিকারকে আবার চিঠি দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক। তিনি বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা করার সাম্প্রতিক ইতিহাস টেনে শোভনদেবকেই স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। তার মধ্যে বুধবার ঋতব্রতর বিরোধী দলনেতা হওয়ার ঘটনা ও নতুন বিরোধী দল নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়েছে। ফলে বিধানসভায় বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব নিয়ে যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল, তা এখন রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।