• facebook
  • twitter
Monday, 9 February, 2026

বিশ্বের মানচিত্রে আগুনের দাগ

একবিংশ শতকে মার্কিন হস্তক্ষেপ, ইরান সংকট এবং বিপন্ন পৃথিবীর ইতিবৃত্ত

একটি সাম্রাজ্য যখন নিজেকে ইতিহাসের শেষ ও চূড়ান্ত সত্য বলে মানতে শুরু করে, তখন তার সিদ্ধান্ত আর কেবল আত্মরক্ষার প্রয়োজন থেকে জন্ম নেয় না। সেই আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে অহংকারে পরিণত হয়— যেখানে অন্যের রাষ্ট্র হয়ে ওঠে পরীক্ষার ক্ষেত্র, অন্যের সমাজ পরিণত হয় নীতির প্রয়োগভূমিতে এবং অন্যের ভবিষ্যৎ রূপ নেয় ক্ষমতার দাবার ঘুঁটিতে। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পঁচিশ বছর জুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা এই দম্ভেরই এক দীর্ঘ, জটিল ও রক্তাক্ত দলিল—যেখানে সামরিক শক্তির ঘোষণা উচ্চস্বরে উচ্চারিত হয়েছে অথচ মানবতা, ন্যায় ও সহাবস্থানের কণ্ঠ ধীরে-ধীরে ইতিহাসের প্রান্তে সরে গেছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের আকাশে যে কালো ধোঁয়া উঠেছিল, তা কেবল ইস্পাত আর কংক্রিটের ধ্বংসচিহ্ন ছিল না; তা ছিল সময়ের বুকে আঁকা এক গভীর ক্ষত। সেই ধোঁয়ার মধ্যেই জন্ম নিল এক নতুন বৈশ্বিক যুগ— যে যুগে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর নামে পৃথিবীর মানচিত্রে বারবার টানা হলো আগুনের রেখা। রাবীন্দ্রিক ভাষায় বললে বলা উচিত— সেই দিন থেকেই মানবসভ্যতার আঙিনায় ঢুকে পড়ল এক অদৃশ্য অন্ধকার—যেখানে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো শক্তির জোরে এবং শান্তির নাম করে স্থায়ী অস্থিরতাকে করে তোলা হলো নিয়তির মতো অনিবার্য।

Advertisement

যুদ্ধের নামে সভ্যতার ক্ষয়:
আফগানিস্তান ছিল সেই যুদ্ধযাত্রার প্রথম গন্তব্য। তালিবান ও আল-কায়েদাকে ধ্বংস করার অজুহাতে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ কুড়ি বছর পর এসে দাঁড়াল ইতিহাসের এক নির্মম বিদ্রুপে। ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়, হাজার-হাজার সৈনিকের মৃত্যু, লক্ষ-লক্ষ আফগান নাগরিকের জীবনছিন্ন হওয়ার পরও—২০২১ সালে আমেরিকার বিশৃঙ্খল প্রস্থানে তালিবান আবার ক্ষমতায়। যুদ্ধ জেতা গেল, কিন্তু শান্তি এল না; রাষ্ট্র গড়া গেল না, কেবল ধ্বংসস্তূপ রেখে যাওয়া হলো।

Advertisement

ইরাকের ক্ষেত্রে সেই ধ্বংস আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী। ২০০৩ সালে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’-এর অভিযোগ তুলে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে আক্রমণ চালানো হলো। অস্ত্র মিলল না, কিন্তু ভেঙে পড়ল একটি সমাজব্যবস্থা। সাদ্দাম হোসেনের পতনের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিল ক্ষমতার শূন্যতা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং শেষ পর্যন্ত আইএসআইএসের মতো চরমপন্থী দানব। ইরাক যুদ্ধ প্রমাণ করে দিল যে একটি রাষ্ট্র ভাঙা যত সহজ– সমাজকে আবার জোড়া লাগানো ততটাই কঠিন।

আরব বসন্ত থেকে ধ্বংসের মরুভূমি:
২০১১ সালের আরব বসন্তকে একসময় গণতন্ত্রের নতুন সূর্যোদয় বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু লিবিয়া ও সিরিয়ায় মার্কিন ও ন্যাটো হস্তক্ষেপ সেই স্বপ্নকে রূপান্তরিত করল দুঃস্বপ্নে। গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া আজও একটি ভাঙা রাষ্ট্র—যেখানে অস্ত্রই শেষ কথা। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের নামে বহুপাক্ষিক হস্তক্ষেপ একদিকে যেমন আসাদ বিরোধী রাজনীতিকে জটিল করেছে, অন্যদিকে চরমপন্থীদের বিস্তারের পথ প্রশস্ত করেছে। গণতন্ত্রের নামে শুরু হওয়া এই অভিযাত্রা শেষ পর্যন্ত মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস হয়ে রইল।

ড্রোন যুদ্ধ ও নীরব হত্যাযজ্ঞ:
সময় যত এগিয়েছে, মার্কিন যুদ্ধনীতি তত ‘পরিশীলিত’ হয়েছে—কিন্তু মানবিকতার দিক থেকে তা ততটাই নিষ্ঠুর। ইয়েমেন, পাকিস্তানের উপজাতীয় অঞ্চল কিংবা আফ্রিকার প্রত্যন্ত প্রান্তে ড্রোন হামলা ‘টার্গেটেড কিলিং’-এর নামে নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধে সেনা কম মরে, কিন্তু নিরীহ মানুষ মারা যায় নীরবে—যাদের নাম কখনো সংবাদ শিরোনাম হয় না। যুদ্ধ যেন এখন একটি প্রযুক্তিনির্ভর রিমোট কন্ট্রোলের খেলায় পরিণত হয়েছে যেখানে বোতাম টিপে মৃত্যু নামিয়ে আনা যায়।

নিষেধাজ্ঞা: আধুনিক যুগের অবরোধ
সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হয়ে উঠেছে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি শক্তিশালী অস্ত্র। ইরান, কিউবা, ভেনেজুয়েলা—এই সব দেশে নিষেধাজ্ঞা শাসকগোষ্ঠী ছাড়াও মূলত সাধারণ মানুষকেই শাস্তি দিয়েছে। ওষুধের অভাব, খাদ্য সংকট, কর্মসংস্থানের পতন—এই নীরব সহিংসতা আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে নিষ্ঠুর রূপ।

ইরান–আমেরিকা সংঘাত: আগুনের কিনারায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব
২০২৪–২৫ সালে এসে ইরান ও আমেরিকার সম্পর্ক আবারও বৈশ্বিক রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা—এই তিনটি অক্ষকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ক্রমেই ঘনীভূত। পাল্টাপাল্টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সামরিক মহড়া, কূটনৈতিক হুমকি—সব মিলিয়ে গোটা অঞ্চল যেন স্থায়ী বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। এই সংঘাত দেখিয়ে দেয় যে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে আজও শক্তির ভাষাই প্রধান। সংলাপ আসে অনেক পরে, ক্ষেপণাস্ত্র আসে আগে এবং সেই আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, গোটা বিশ্বের।

এই উত্তাল প্রেক্ষাপটে ভারতের ভূমিকা এক নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রম। আমেরিকার মতো আগ্রাসী সামরিক নীতি নয়, আবার কোনো পরাশক্তির ছায়াতলে আত্মসমর্পণও নয়—ভারত বেছে নিয়েছে কৌশলগত সংযমের পথ। ইরান–আমেরিকা সংঘাতে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় এই ভারসাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, চাবাহার বন্দর ও আঞ্চলিক সংযোগের স্বার্থ—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারত যুদ্ধ নয়, সংলাপ ও বহুপাক্ষিকতার পক্ষে কথা বলেছে। শক্তির দম্ভের বদলে সহাবস্থানের দর্শনই যে একবিংশ শতাব্দীর ভবিষ্যৎ হতে পারে—ভারতের অবস্থান সেই ইঙ্গিতই দেয়।

আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার ভাঙন:
২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক একতরফা হস্তক্ষেপ—বারবার রাষ্ট্রসংঘকে পাশ কাটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত দুর্বল করেছে। যখন ‘বিশ্ব পুলিশ’ নিজেই নিয়ম ভাঙে, তখন নিয়ম মানার নৈতিক অধিকারও সে হারায়। এর ফলে বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই শক্তিনির্ভর অরাজকতার দিকে এগোচ্ছে।

বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য ও আমেরিকার বিপজ্জনক রূপ:
অতিরিক্ত সামরিক ব্যয়, লাগাতার যুদ্ধ এবং নৈতিক দ্বিচারিতার ফলে আমেরিকার ‘সফট পাওয়ার’ ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এর ফলেই একক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের বদলে বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে—যেখানে চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আরও দৃঢ় হচ্ছে। ডলারনির্ভরতার বিকল্প খোঁজার প্রবণতাও এই পরিবর্তনেরই লক্ষণ।আমেরিকা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে তখনই, যখন সে নিজের নিরাপত্তাকে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা বলে ধরে নেয়। গণতন্ত্রের নামে যুদ্ধ, মানবাধিকারের ভাষায় আগ্রাসন—এই দ্বিচারিতা বিশ্বকে শিখিয়েছে যে শক্তি থাকলেই নিয়ম বদলানো যায়।

কোন পথে মানবসভ্যতা?
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পঁচিশ বছর আমাদের শিখিয়েছে যে সামরিক বিজয় মানেই শান্তি নয়। বরং হস্তক্ষেপের দ্বারাই জন্ম নেয় নতুন সংকট, নতুন শত্রু এবং নতুন যুদ্ধের। আজ বিশ্ব এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যদি আমেরিকা তার আগ্রাসী নীতি থেকে সরে এসে কূটনীতি, সংলাপ ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পথে না হাঁটে, তবে এই আগুন শুধু অন্য দেশকে নয়—নিজেকেও গ্রাস করবে।
ইতিহাস তখন প্রশ্ন করবে—একটি দেশ কি সত্যিই নিজের নিরাপত্তার নামে গোটা পৃথিবীকে বিপন্ন করে তুলেছিল?
সেই প্রশ্নের উত্তর আজও লেখা হচ্ছে—যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ও বিশ্বের মানচিত্রে ছড়িয়ে পড়া আগুনের কালো দাগে।

Advertisement