• facebook
  • twitter
Monday, 19 January, 2026

যুদ্ধ নয়, ইরানের প্রয়োজন দ্রুত সংস্কার ও অধিক স্বাধীনতা

এই বিক্ষোভ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার নগ্ন প্রকাশ

ইরানের সাম্প্রতিক অস্থিরতা নিছক একটি অর্থনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এক গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ, যা বহুদিন ধরে জমে উঠছিল। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড বাজারে দোকানদারদের ধর্মঘট দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা, তা দ্রুতই গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জের রূপ নেয়। রিয়ালের ভয়াবহ পতন, লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যভর্তুকি প্রত্যাহার— সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বিস্ফোরণের দিকেই যাচ্ছিল।
এই বিক্ষোভ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার নগ্ন প্রকাশ। বহু বছর ধরে পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরান আরও গভীর সংকটে পড়ে ২০২৫ সালের জুনে ইজরায়েলের বিমান হামলার পর। শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান— সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়ে। এর মধ্যেই সরকার জ্বালানির দাম বাড়ায় ও খাদ্যভর্তুকির কিছু অংশ প্রত্যাহার করে নেয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত জনজীবনে কার্যত আগুন ঢেলে দেয়।
গত সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হিংসাত্মক হয়ে ওঠে এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শুরু হয় কঠোর দমননীতি। যুক্তরাষ্ট্র ও নরওয়ের মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, শতাধিক প্রতিবাদকারী নিহত হয়েছেন। তবে ইরান যেখানে দাবি করেছে বর্তমান বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা প্রায় এক হাজার, সেখানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রিপোর্ট ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুসারে মৃতের সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, ‘দাঙ্গাবাজদের’ হাতে বহু নিরাপত্তারক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন। সংখ্যার সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটুকু স্পষ্ট যে, রাষ্ট্র ও জনগণের সংঘর্ষ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
ইরান অবশ্য এই প্রথম অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুখোমুখি হল না। অতীতেও বহুবার গণবিক্ষোভ হয়েছে— ২০০৯ সালের ‘গ্রিন মুভমেন্ট’, ২০১৭-১৮ এবং ২০১৯ সালের বিক্ষোভ তার উদাহরণ। একই সঙ্গে ইরান বারবার বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও হুমকির মুখে পড়েছে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হল, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বহিরাগত সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা একসঙ্গে উপস্থিত। এই দ্বৈত সংকট ইরানকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।১৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের প্রতিবাদকারীদের ‘রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান দখল’ করার আহ্বান জানান এবং বলেন, ‘সহায়তা আসছে’। এই বক্তব্য নিছক কূটনৈতিক মন্তব্য নয়, বরং এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত বহন করে।
ইরানের ইতিহাস ও পশ্চিম এশিয়ার বাস্তবতা জানেন এমন যে কোনও ব্যক্তির কাছেই এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তেমন দৃঢ় নয়। একের পর এক গণবিক্ষোভ তার কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। যুবসমাজের বেকারত্ব, নারীদের ওপর বিধিনিষেধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব, দুর্নীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ— সব মিলিয়ে রাষ্ট্র সাধারণ নাগরিকের আস্থা হারাচ্ছে। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান কি আরেকটি যুদ্ধ?
অনেকেই মনে করছেন, শাসকগোষ্ঠী এখন চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন। বাস্তব চিত্র কিন্তু ততটা সরল নয়। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় ৩ কোটি মানুষ ভোট দিয়েছেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৫০ শতাংশ। জানুয়ারির মাঝামাঝি হাজার হাজার মানুষ সরকারের সমর্থনে রাস্তায় নেমেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এখনও পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী বা সেনাবাহিনীর আনুগত্যে কোনও ফাটল দেখা যায়নি। অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্র এখনও কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কোনও সামরিক আক্রমণ বা জোর করে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যকে আরও গভীর অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে। ইরান শুধু একটি দেশ নয়,  এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি। সেখানে সংঘর্ষ মানে লেবানন, ইরাক, সিরিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল— সব জায়গায় তার অভিঘাত পড়বে। তেলের বাজার থেকে শুরু করে বৈশ্বিক রাজনীতি, সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব হবে মারাত্মক।
যাঁরা ‘মুক্তি’ বা ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’র নামে যুদ্ধের পক্ষে সওয়াল করছেন, তাঁদের আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা স্মরণ করা উচিত। মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই দেশগুলিতে সরকার পরিবর্তন হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু স্থিতিশীলতা আসেনি। বরং দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ ও মানবিক বিপর্যয় সেই সমাজগুলিকে আরও দুর্বল করেছে। ইরানও সেই একই পরিণতির দিকে যেতে পারে।
বাস্তব সত্য হল, যুদ্ধ কখনও কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সমাধান নয়। বরং এটি
শাসকগোষ্ঠীকে আরও কঠোর হতে প্ররোচিত করে এবং জাতীয়তাবাদের আবরণে ভিন্নমত দমন করার সুযোগ দেয়। সাধারণ মানুষই এর সবচেয়ে বড় শিকার হয়।যাঁরা সত্যিই ইরানের মানুষের কল্যাণ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাঁদের উচিত ভিন্ন পথ ভাবা। সামরিক হুমকি নয়, প্রয়োজন কূটনৈতিক সংযোগ ও আলোচনা। নিষেধাজ্ঞা ও বোমাবর্ষণ নয়, দরকার অর্থনৈতিক সহায়তা ও রাজনৈতিক সংলাপ। ইরানের শাসকদের ওপর চাপ তৈরি করা যেতে পারে, কিন্তু তা হতে হবে সংস্কারের জন্য, ধ্বংসের জন্য নয়।
ইরানের আজ সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার। অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, সামাজিক স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা— এই সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনতে হবে। এই কাজ একা তেহরান সরকারের পক্ষে কঠিন, যদি আন্তর্জাতিক সমাজ সহযোগিতার হাত না বাড়ায়। বিদেশি সহায়তা দরকার, কিন্তু তা হতে হবে শান্তির, উন্নয়নের ও সংস্কারের জন্য,  সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জন্য নয়।
ইরান আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে দমন ও যুদ্ধের পথ, অন্যদিকে সংস্কার ও সংলাপের সুযোগ। ইতিহাস বলছে, দ্বিতীয় পথই দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও মানুষের জন্য মঙ্গলজনক। যুদ্ধ নয়— ইরানের প্রয়োজন স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও দ্রুত সংস্কার।

Advertisement

Advertisement