সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের এই বক্তব্য শুধু একটি কূটনৈতিক ঘোষণা নয়, বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির দুর্বলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে ভারতের এই অবস্থানের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শান্তির কথা বলা হচ্ছে, অথচ নানা অঞ্চলে যুদ্ধ, হিংসা ও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেনের যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে ক্রমাগত বিপন্ন করছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একে কোনোভাবেই যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়া যায় না। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য আরও গভীর, কারণ তিনি মনে করেন, সব রাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সমানভাবে শূন্য-সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করে না। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত হিসাব মানবিক মূল্যবোধের উপরে স্থান পায়। ভারতের অভিজ্ঞতার আলোকে এই বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সন্ত্রাসবাদ শুধু নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটায় না, এটি একটি দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে। আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে তখনই, যখন কোনও রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে ব্যবহার করে অন্য দেশের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়। এর ফলে সন্ত্রাসবাদ বিচ্ছিন্ন অপরাধের সীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বিপজ্জনক অস্ত্রে পরিণত হয়।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের সমস্যার মুখোমুখি। জম্মু ও কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদী হিংসা থেকে বিভিন্ন শহরে জঙ্গি হামলা— ভারতের নিরাপত্তা ও জনজীবন বারবার আক্রান্ত হয়েছে। ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহতা এবং তার আন্তর্দেশীয় চরিত্রকে স্পষ্ট করে দিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকেই ভারতের বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদকে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা কৌশলগত স্বার্থের অজুহাতে গ্রহণযোগ্য করা যায় না।
তবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই বলতে শুধু সামরিক অভিযান বা নিরাপত্তা জোরদার করাকে বোঝায় না। সন্ত্রাসবাদী অর্থায়ন বন্ধ করা, অস্ত্র ও মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকর প্রয়োগও সমান জরুরি। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে নিরীহ মানুষের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সে দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতির পরিচয়।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হল জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ভারত মনে করে, আন্তর্জাতিক বিরোধের স্থায়ী সমাধান আলোচনার মাধ্যমে খুঁজে বের করা উচিত। জয়শঙ্কর ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রসঙ্গে বলেছেন, সংলাপ ও কূটনীতিই সমাধানের পথ।
এই অবস্থানের মধ্যে ভারতের বাস্তববাদী কূটনীতির পরিচয় রয়েছে। ভারত একদিকে আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তির গুরুত্ব তুলে ধরে, অন্যদিকে নিজের জাতীয় স্বার্থ এবং কৌশলগত স্বাধীনতাকেও অগ্রাধিকার দেয়। রাশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপীয় দেশগুলি এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রকৃতি এক নয়। ফলে কোনও একটি শক্তিশিবিরের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা ভারতের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ।
জয়শঙ্করের বক্তব্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রাষ্ট্রসঙ্ঘের ভূমিকা। তাঁর মতে, বিশ্বব্যাপী সংকটের সময় রাষ্ট্রসঙ্ঘের শুধু দর্শকের ভূমিকায় থাকা উচিত নয়, নেতৃত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি প্রতিদিন আরও জোরালো হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতা ১৯৪৫ সালের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের কাঠামোতে তার যথাযথ প্রতিফলন নেই।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের দাবি জানিয়ে আসছে। বিশ্বের বৃহত্তম জনবহুল দেশ, একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের দাবি উপেক্ষা করা সহজ নয়। কিন্তু সংস্কার শুধু নতুন সদস্য যুক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, প্রতিনিধিত্বমূলক ও কার্যকর হওয়া দরকার।
বিশেষত, কোনও সংঘাতের ক্ষেত্রে শক্তিধর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ যদি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপকে আটকে দেয়, তবে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। কোনও সংগঠনকে এক দেশের কাছে সন্ত্রাসবাদী এবং অন্য দেশের কাছে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দুর্বল হয়। ভারতের উচিত এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সওয়াল করা এবং একই সঙ্গে সব দেশের জন্য সমান নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
জয়শঙ্কর উন্নয়নশীল দেশগুলির সামনে চারটি বড় সংকটের কথা বলেছেন— অর্থায়ন, জ্বালানি, খাদ্য এবং সার। এই ‘ফোর এফ’ সংকটের প্রভাব বিশেষভাবে পড়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির উপর।
যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনা জ্বালানি এবং খাদ্যের সরবরাহব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। সুদের হার বৃদ্ধি, ঋণের বোঝা এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তোলে। আবার সার ও কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে গেলে খাদ্য উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়— দুটিই প্রভাবিত হয়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংঘাতের মূল্য শুধু যুদ্ধরত দেশগুলিকেই দিতে হয় না, বহু দূরের দরিদ্র দেশগুলির মানুষও তার বোঝা বহন করেন।
ভারত এই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে উন্নয়নশীল দেশগুলির খাদ্যনিরাপত্তা, ঋণসংকট, জ্বালানি প্রাপ্তি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্ন তুলে ধরা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা সম্পর্কে জয়শঙ্কর আশাবাদ প্রকাশ করলেও এর বিকাশ ও প্রভাব কয়েকটি শক্তিশালী দেশ বা সংস্থার হাতে সীমাবদ্ধ থাকার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এত ব্যাপক প্রভাবসম্পন্ন প্রযুক্তির বিকাশ হতে হবে দায়িত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানবকেন্দ্রিক।
এই সতর্কতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও প্রশাসনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা যদি কেবল ধনী দেশ ও বড় সংস্থাগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বিশ্বে বর্তমান বৈষম্য আরও বাড়বে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেন মানবকল্যাণের পরিবর্তে নতুন ক্ষমতার একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
জয়শঙ্করের বক্তব্যের মূল সুর হল, বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি পরস্পরের পরিপূরক। পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক মানুষ যদি দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং বঞ্চনার মধ্যে থাকেন, তবে বিশ্বব্যাপী অগ্রগতির দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে। আবার যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের পরিবেশে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন।
সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান তাই শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দায়িত্বশীল আচরণের দাবিও।




