• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 29 September, 2026

সন্ত্রাসবাদকে কূটনীতির আড়ালে স্বাভাবিক করা যাবে না, স্পষ্ট অবস্থান ভারতের

রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাম্প্রতিক পর্বে ভারতের বক্তব্য তাই শুধু পাকিস্তানকে উদ্দেশ করে দেওয়া হুঁশিয়ারি নয়। এর মধ্যে একটি বৃহত্তর নীতি স্পষ্ট হয়েছে— সন্ত্রাসের সঙ্গে আপস নয়, সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা নয় এবং সন্ত্রাসের পরিণতি থেকে রেহাইয়ের সুযোগও নয়। একই সঙ্গে ভারত তার আত্মরক্ষার অধিকারকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

সন্ত্রাসবাদকে কূটনীতির আড়ালে স্বাভাবিক করা যাবে না, স্পষ্ট অবস্থান ভারতের

Photo: File Photo

রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বাক্‌যুদ্ধকে নিছক কূটনৈতিক বাক্‌যুদ্ধ বলে দেখলে বিষয়টির আসল তাৎপর্য ধরা পড়বে না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কাশ্মীরের প্রসঙ্গ তুলে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন এবং সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারতের অবস্থানকে ‘যুদ্ধের কাজ’ বলে সতর্ক করেছেন। তার জবাবে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘে ভারতের প্রতিনিধি পেটাল গেহলট যে ভাষায় পাকিস্তানের সন্ত্রাস-নীতির প্রশ্ন তুলেছেন, তাতে দিল্লির বর্তমান অবস্থানটি বেশ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে।

এই অবস্থানের মূল কথা একটাই— সন্ত্রাসবাদকে আর কূটনৈতিক কথাবার্তার আড়ালে স্বাভাবিক করে তোলা যাবে না। জয়শঙ্কর সরাসরি পাকিস্তানের নাম না করেও তাকে ‘সন্ত্রাসের ধারাবাহিক চর্চাকারী’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা এবং তার পরিণতি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভারত তার আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করবে এবং সন্ত্রাসে মদতদাতাকেই নিজের পথ পরিবর্তন করতে হবে।

এখানেই ভারতের বক্তব্যের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব। এত দিন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের আলোচনায় কাশ্মীর প্রায়শই কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে থেকেছে। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীরের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’-এর কথা বলেছে, আর ভারত পাল্টা বলেছে সীমান্তপারের সন্ত্রাস বন্ধ না হলে শান্তি ও আলোচনা অর্থহীন। এবারের বক্তব্যে ভারত সেই দ্বিতীয় বিষয়টিকেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ, কাশ্মীর নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই, আগে প্রশ্ন উঠুক—সীমান্তপারের সন্ত্রাসের অবসান ঘটছে কি না।

পেটাল গেহলটের বক্তব্যেও একই কৌশল দেখা গিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যখন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রসঙ্গ তুলেছেন, তখন ভারতীয় প্রতিনিধি পাল্টা পাক-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে হিংসা, প্রাণহানি ও মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের অবস্থার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে মার্কিন সামরিক অ্যাকাডেমির কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন— এই ঘটনাটিও তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় শুধু ‘কে আক্রান্ত’ সেই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়; ‘সন্ত্রাসের পরিকাঠামো কোথায়’, ‘কে তাকে আশ্রয় দিচ্ছে’, ‘অর্থ আসছে কোথা থেকে’— এই প্রশ্নগুলিও করতে হবে। ভারতের দাবি, পহেলগামে পর্যটকদের উপর হামলা সীমান্তপারের সন্ত্রাসের সাম্প্রতিক উদাহরণ। ফলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শুধু হামলার পরে প্রতিক্রিয়া দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তার উৎস ও অর্থনৈতিক ভিত্তির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই প্রসঙ্গে জয়শঙ্করের আর একটি বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ— সন্ত্রাসে অর্থের জোগান বন্ধ করা। কোনও সন্ত্রাসী সংগঠন শুধু অস্ত্রের জোরে টিকে থাকে না। তার পিছনে থাকে অর্থ, প্রশিক্ষণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ আশ্রয়। তাই সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে শুধু সামরিক অভিযান হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি অংশই দেখা হয়। আর্থিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ানো এবং সন্ত্রাসী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে একযোগে ব্যবস্থা নেওয়া সমান জরুরি।

ভারতের বর্তমান অবস্থানের আর একটি দিক হল— সন্ত্রাস এবং শান্তি একসঙ্গে চলতে পারে না। এটি আবেগের কথা নয়, বাস্তব কূটনীতির প্রশ্ন। এক দিকে যদি শান্তির প্রস্তাব থাকে, অন্য দিকে যদি সীমান্তপারের সন্ত্রাস অব্যাহত থাকে, তবে সেই শান্তির উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ভারত তাই বলছে, সন্ত্রাস বন্ধ করার দায়িত্ব যার, তাকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

তবে এখানেই ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও রয়েছে। কঠোর অবস্থান নেওয়া এক জিনিস, আর সেই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক স্তরে দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনে পরিণত করা অন্য জিনিস। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের বক্তব্য যতই দৃঢ় হোক, তার সঙ্গে প্রমাণ, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। শুধু শক্তিশালী ভাষা দিয়ে সন্ত্রাস নির্মূল করা যায় না।

সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে বর্তমান উত্তেজনা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। শরিফ রাষ্ট্রসঙ্ঘে বলেছেন, পাকিস্তানের জলের প্রবাহ বন্ধ, বাধাগ্রস্ত বা ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে তা ‘যুদ্ধের কাজ’ হিসেবে বিবেচিত হবে। ভারত অন্য দিকে বলেছে, পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্যভাবে সীমান্তপারের সন্ত্রাস বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তিটি স্থগিত রাখার অবস্থান বহাল থাকবে। ফলে জল, নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাস— তিনটি বিষয়ই এখন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে।

এখানে সতর্কতার প্রয়োজনও কম নয়। জল কোনও সাধারণ কূটনৈতিক হাতিয়ার নয়, কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে তার সম্পর্ক। একই ভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সময়ও সংঘাত যাতে আরও বিস্তৃত না হয়, সে দিকটি দেখতে হবে। ভারতের আত্মরক্ষার অধিকার নিয়ে দিল্লির অবস্থান স্পষ্ট, কিন্তু সেই অধিকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সংযমের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ।

জয়শঙ্করের বক্তব্যের আর একটি তাৎপর্য হল, তিনি সন্ত্রাসকে শুধু ভারত-পাকিস্তান সমস্যা হিসেবে দেখেননি। ৯/১১ থেকে পহেলগাম— আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিভিন্ন ঘটনার দিকে তাকিয়ে ভারতের বক্তব্য হল, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বের অবস্থান অভিন্ন হওয়া দরকার। কোনও সন্ত্রাসী সংগঠন যদি এক দেশে ‘স্বাধীনতার যোদ্ধা’ আর অন্য দেশে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

অবশ্য ভারত নিশ্চয়ই এটাও মনে রাখে যে, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ ও সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় মূল্য সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। ভবিষ্যতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনও সুযোগ তৈরি হলে সেই দরজা পুরোপুরি বন্ধ না রাখাও কূটনীতির অংশ।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাম্প্রতিক পর্বে ভারতের বক্তব্য তাই শুধু পাকিস্তানকে উদ্দেশ করে দেওয়া হুঁশিয়ারি নয়। এর মধ্যে একটি বৃহত্তর নীতি স্পষ্ট হয়েছে— সন্ত্রাসের সঙ্গে আপস নয়, সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা নয় এবং সন্ত্রাসের পরিণতি থেকে রেহাইয়ের সুযোগও নয়। একই সঙ্গে ভারত তার আত্মরক্ষার অধিকারকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাফল্যের অর্থ প্রতিশোধ নেওয়া নয়; এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে পরবর্তী হামলার সম্ভাবনাই কমে যায়। তার জন্য সীমান্ত সুরক্ষা যেমন দরকার, তেমনই দরকার গোয়েন্দা সহযোগিতা, সন্ত্রাসের অর্থের উৎস বন্ধ করা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ এবং প্রয়োজনে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। ভারতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে সেই দীর্ঘ লড়াইয়েরই একটি অধ্যায় হিসেবে দেখা যেতে পারে।