• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 7 October, 2026

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ভারতের কূটনীতি

ইউরোপকেও ভারত তাই নতুন গুরুত্ব দিতে চাইছে। ইউরোপ এখন শুধু বাণিজ্যের ক্ষেত্র নয়; প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও কূটনীতিতেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও গভীর হলে তা ভারতের অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পক্ষে লাভজনক হতে পারে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ভারতের কূটনীতি

Image: IANS

বিশ্ব রাজনীতিতে একের পর এক পরিবর্তন ঘটছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার ভিত এখন আর আগের মতো শক্ত নয়। একদিকে আমেরিকার নীতিতে বড় পরিবর্তন, অন্যদিকে চিনের দ্রুত উত্থান, রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমের সংঘাত এবং বিভিন্ন দেশের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার নতুন চেষ্টা— সব মিলিয়ে পৃথিবী ক্রমশ একটি নতুন বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

দিল্লিতে মিউনিখ লিডার্স মিটিংয়ে জয়শঙ্কর বলেছেন, আমেরিকা নিজের পছন্দেই অনেকটা ‘একাকী শক্তি’ হয়ে উঠছে এবং চিনের উত্থান বিশ্বব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুরটি হলো— আজকের পৃথিবীতে কোনও একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে থাকা নিরাপদ নয়। দেশগুলিকে নিজেদের স্বার্থে ঝুঁকি কমাতে হবে, সরবরাহ-শৃঙ্খলকে বৈচিত্র্যময় করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সহযোগিতার পথ তৈরি করতে হবে।

এই ভাবনার মধ্যে ভারতের বর্তমান বিদেশনীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত একদিকে আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গেও ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। একই সঙ্গে চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও সীমান্ত-সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ভারত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এমন কোনও অবস্থান নিতে চাইছে না, যাতে তার কূটনৈতিক বিকল্পগুলি সংকুচিত হয়ে যায়। অর্থাৎ ভারত কোনও এক শিবিরের স্থায়ী সদস্য হওয়ার বদলে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার নীতি অনুসরণ করছে।

রাশিয়া প্রসঙ্গে জয়শঙ্করের বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও রাশিয়া ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পাশে ছিল, যখন পশ্চিমা বিশ্বের একটি অংশ পাকিস্তানের সামরিক শাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেছিল। ইতিহাসের সেই স্মৃতি ভারত সহজে ভুলতে চায় না। তবে ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক এখন আর শুধু প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পারমাণবিক শক্তি এবং মহাকাশ— বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে। তাই বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের কাছে শুধু আবেগের বিষয় নয়, বাস্তব কৌশলগত স্বার্থেরও বিষয়।

তবে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন চিনকে ঘিরে। চিনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি দ্রুত বেড়েছে। এশিয়ায় তার প্রভাবও বাড়ছে। ফলে ভারতকে একই সঙ্গে চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতা— দুই পথই খোলা রাখতে হচ্ছে। জয়শঙ্করের ‘ডি-রিস্কিং’ বা ঝুঁকি কমানোর কথা আসলে এই বাস্তবতাকেই নির্দেশ করে। কোনও একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিপদ ডেকে আনতে পারে।

ইউরোপকেও ভারত তাই নতুন গুরুত্ব দিতে চাইছে। ইউরোপ এখন শুধু বাণিজ্যের ক্ষেত্র নয়; প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও কূটনীতিতেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও গভীর হলে তা ভারতের অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পক্ষে লাভজনক হতে পারে।

জয়শঙ্করের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাষ্ট্রসঙ্ঘ সম্পর্কে— ‘আমাদের একটি উন্নত রাষ্ট্রসঙ্ঘ দরকার, রাষ্ট্রসঙ্ঘহীন বিশ্ব নয়।’ এই বক্তব্যের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থানের মিল রয়েছে। বর্তমান রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাঠামোতে ক্ষমতার বণ্টন আজকের পৃথিবীর বাস্তবতাকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার জরুরি। ভারত যে আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান চায়, এই বক্তব্য তারই প্রকাশ।

সব মিলিয়ে জয়শঙ্করের বক্তব্যে ভারতের বিদেশনীতির একটি বাস্তববাদী ছবি পাওয়া যায়। ভারত কোনও পক্ষের সঙ্গে অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং বহু পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইছে। তবে এই নীতি সফল করতে হলে শুধু কূটনৈতিক ভারসাম্য নয়, দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও উৎপাদন ক্ষমতাকেও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যার নিজের ভিত শক্ত, তার কণ্ঠই সবচেয়ে জোরালো হয়।