• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 14 July, 2026

৩৭০ ধারার বিরোধিতা করার ফলে শহীদ হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী

ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তি এবং ভারতীয় জনসংঘের জন্মলগ্ন থেকেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কাশ্মীর প্রসঙ্গ নিয়ে বিশেষভাবে সচেতন ছিলেন। তিনি তাঁর

৩৭০ ধারার বিরোধিতা করার ফলে শহীদ হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী

Pic Source-ANI

ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তি এবং ভারতীয় জনসংঘের জন্মলগ্ন থেকেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কাশ্মীর প্রসঙ্গ নিয়ে বিশেষভাবে সচেতন ছিলেন। তিনি তাঁর জীবনের শেষ সংগ্রাম করে যান কাশ্মীরকে  নিয়ে। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৭ অক্টোবর পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে কাশ্মীরকে রক্ষা করার জন্য ভারতভুক্তির সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন তদানীন্তন কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং নালওয়া। জম্মু ও কাশ্মীরের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ততক্ষণে অবশ্য পাকিস্তানিদের দখলে চলে যায় এবং বাকি অংশ ভারতীয় সৈনিকরা অধিকার করেন। এই অবস্থায় কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে কাশ্মীরকে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারার রক্ষাকবচ প্রদান করা হয় এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের বিষয়টিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু আন্তর্জাতিকরণ করেন। কাশ্মীরকে ৩৭০ নম্বর ধারা দ্বারা বিশেষ অধিকার প্রদানের বিরোধিতা ভারতের বহু নেতৃবৃন্দ করেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ এই বিশেষ অধিকার প্রশ্নে বলেন, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগষ্ট প্রায় ৫০০ দেশীয় রাজ্য ভারতভুক্তির সনদে স্বাক্ষর করে ভারতের অন্তর্গত হন, কিন্তু তাদের অধিকার রক্ষার জন্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোনও বিশেষ অধিকার প্রদান করা হয়নি সেইসব দেশীয় রাজ্য যে সনদে স্বাক্ষর করেছিল, জম্মু ও কাশ্মীর সেই একই সনদে স্বাক্ষর করে ভারতভুক্ত হয়েছিল। তাহলে শুধুমাত্র জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য এই অধিকার কেন!
কাশ্মীরের ভারতভুক্তি ও ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ক প্রক্রিয়া আইন অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এই জায়গার জন্য বিশেষ কোনও সাংবিধানিক আইন থাকতে পারে, সে বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। এমনকি জহরলাল নেহরু সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারার খসড়া বাবাসাহেব আম্বেদকরকে পাঠান, তখন তিনি বলেন যে, ‘তিনি ভারতবর্ষের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে কেবলমাত্র শেখ আবদুল্লাকে সন্তুষ্ট করতে ভারতের আইন মন্ত্রী হননি। শেখ আবদুল্লা কীভাবে ভাবতে পারে যে ভারত জম্মু ও কাশ্মীরকে রক্ষা করবে, সেতু ও রাস্তা তৈরি করবে, জনগনকে খাওয়াবে, সেখানে কোনও রাজনৈতিক অধিকার ছাড়াই?’
কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ শ্যামাপ্রসাদের বাকরুদ্ধ করতে পারেনি। পার্লামেন্টে থাকাকালীন সময়ে বারবার তিনি কাশ্মীর সংক্রান্ত বিষয়ে অকাট্য যুক্তি ও তথ্যের দ্বারা সরকারি তোষণ নীতির সমালোচনা করেছিলেন।
শ্যামাপ্রসাদ জহরলাল নেহরুকে এক পত্রে লেখেন, ‘জম্মু ও কাশ্মীর ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ, সুতরাং ওই রাজ্য সম্বন্ধে চিন্তা করা এবং তার উপর লক্ষ্য রাখবার অধিকার ভারতের জনগণের আছে। জম্মুর অধিবাসীরা জিজ্ঞাসা করছেন, ভারতের অন্যান্য অংশে যে শাসন বিধির দ্বারা শাসিত হচ্ছে, সেই একই সংবিধান অনুসারে তাঁদের ও শাসনকার্য পরিচালিত হবে কি না? তাঁরা আরও জানতে চান যে, মুসলিম প্রধান কাশ্মীর উপত্যাকার মানুষেরা যদি ভিন্নমত পোষণ করেন (ভারতীয় সংবিধান না মানেন) তবে তার জন্য জম্মুবাসীরা কেন বিপদের সম্মুখীন হবেন? বাস্তবে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ক্রমশ: বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে— আপনি ও শেখ আবদুল্লা কাশ্মীর বিভাগ (অর্থাৎ) পাকিস্তান অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরের অস্তিত্ব স্বীকার করেন কি না? আপনি বরাবরই এই জরুরি প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়েছেন। ভারতের বাকি সকল অংশে যখন ভারতীয় সংবিধান প্রয়োগযোগ্য বিবেচিত হয়, তখন জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যে তা প্রযুক্ত হবে না কেন?’
সংসদে বারবার কাশ্মীর সংক্রান্ত বিতর্কে শ্যামাপ্রসাদ অকাট্য যুক্তি ও তথ্য দিয়ে নেহরু সরকারের নীতির সমালোচনা করেছেন। ৭ আগষ্ট ১৯৫২-র বিতর্কে আবার তিনি শাণিত যুক্তি সহকারে তাঁর মত তুলে ধরেন—
‘কাশ্মীর যখন ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তখন কী করে একদেশে দুই সংবিধান, দুই পতাকা, দুই প্রধান থাকবে? যদিও এসব প্রশ্নের সদুত্তর তিনি কোনোদিনই পাননি।’
এভাবেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী সম্পর্কে আলোচনায় বিস্ময়করভাবে দেখা যায় যে, দেশমাতৃকার জন্য তাঁর যে ভূমিকা, সেটি তেমনভাবে গুরুত্ব পায়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁকে এবং তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সাম্প্রদায়িকতার তকমা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে তাঁকে কেবলমাত্র একজন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদ হিসাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রকৃত বাস্তবতা থেকে দূরে সরে এসে কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট ঘেরাটোপের মধ্যে আবদ্ধ রেখে শ্যামাপ্রসাদের চিন্তাকে রূপদানের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায় যে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর জীবন অত্যন্ত ঘটনাবহুল।
সেই সময় আবদুল্লার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরূদ্ধে, কেন্দ্রের ৩৭০ ধারার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী জম্মু প্রজা পরিষদের আন্দোলনে উপত্যকা উত্তাল। পুরোভাগে প্রেমনাথ ডোগরা। ধরপাকড়, নৃশংস অত্যাচার চলছে চারিদিকে। শামিল হতে শ্যামাপ্রসাদ বেরিয়ে পড়লেন ৮ মে, ১৯৫৩। সঙ্গে অটলবিহারী বাজপেয়ী, বলরাজ মাধক, টেকচাঁদ, গুরুদত্ত বৈদ্য। উদ্দেশ্য, সমস্ত কিছু সরেজমিনে দেখে শেখ আবদুল্লার সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে দুই যুযুধান দলের মধ্যে হিতকর সমঝোতা সূত্র বের করা। প্রথমে অমৃতসর, তারপর পাঠানকোট হয়ে পৌছলেন উধমপুর। সেখান থেকে জম্মু সীমান্তে ঢুকতেই, সুপ্রিম কোর্টের অধিক্ষেত্র পেরোতেই তাওয়াই ব্রিজের ওপর গ্রেপ্তার। অপেক্ষমান সমর্থকদের চোখের সামনে দিয়ে জীপে করে শ্রীনগর সেন্ট্রাল জেল। সেখান থেকে ডাল লেকের পাশে ছোট একটা কটেজ, ১০ বাই ১১ বর্গফুটের ঘর। হাঁটা চলার জায়গা বলতে এক চিলতে উঠোন। নেহরু যদিও পুত্রহারা যোগমায়া দেবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন— আপনার ছেলে ছিল রাজসমাদরে। শুনেছি বিলাসব্যসনের আয়োজন ছিল ত্রুটিহীন।
আবদুল্লার রাজ্যে বন্দী হলেন সংসদের বিরোধী নেতা তথা প্রধান মুখপাত্র। কারণ, কাশ্মীর পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট লঙ্ঘন। অত:পর শরীর খারাপের শুরু। পায়ে ভেরিকোজ ভেনের অসহ্য ব্যথা। কাতর বন্দীর বারংবার ব্যক্তিগত চিকিৎসক বিধান রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবার, আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবার একান্ত প্রার্থনা এবং বারংবারই নাকচ। অ্যালার্জির কারণে রোগীর অসম্মতি ছিল স্ট্রেপটোমাইসিন ওষুধে। জেলের ডাক্তার আশ্বাস দিয়ে বললেন ‘ভ্রান্ত ধারণা’। অবস্থার অবণতি হতে থাকল ক্রমশ। দুটো হার্ট অ্যাটাক আগেই হয়েছিল। এবার হল তৃতীয়টি। সেই মুমূর্ষু অবস্থায় ‘উন্নত’ চিকিৎসার জন্য তাঁকে খাড়াই লম্বা সিঁড়ি হাঁটিয়ে তোলা হল সরকারি হাসপাতালের ম্যাটারনিটি ওয়ার্ডে এবং সেখান থেকেই সহকর্মী ব্যারিস্টার ত্রিবেদী, সহবন্দী টেকচাঁদ, গুরু দত্ত খবর পেলেন ২৩ জুন ভোরে, শ্যামা প্রদীপ নেভার মুখে। পরের দিনই ছিল আদালতে তাঁর কৃত হ্যাবিয়াস কর্পাস মামলার চুড়ান্ত শুনানি তথা বিচারপতির অবিলম্বে বন্দীমুক্তির রায় দেবার কথা। কিন্তু সেই দিন ২৩ জুন ১৯৫৩-তে তাঁর প্রাণবায়ু নির্বাপিত হয়ে যায়।