• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 21 August, 2026

কাশ্মীর নিয়ে আমেরিকার নতুন বার্তা: ইতিহাস ও বাস্তবতার মুখোমুখি পাকিস্তান

জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ— এই অবস্থান ভারতের কাছে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত এই সত্যের ভিত্তিতে কাশ্মীরের

কাশ্মীর নিয়ে আমেরিকার নতুন বার্তা: ইতিহাস ও বাস্তবতার মুখোমুখি পাকিস্তান

জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ— এই অবস্থান ভারতের কাছে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত এই সত্যের ভিত্তিতে কাশ্মীরের সঙ্গে তার সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করে এসেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক একটি মন্তব্য নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শ্রীনগরে এসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’ কাশ্মীর প্রশ্নে মার্কিন প্রশাসনের কোনও উচ্চপদস্থ আধিকারিকের মুখে এত সরাসরি এই বক্তব্য আগে শোনা যায়নি।
পাকিস্তান যে এই বক্তব্য মেনে নেবে না, তা অনুমান করা কঠিন ছিল না। গোরের মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামাবাদে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের দাবি, জম্মু ও কাশ্মীর একটি বিতর্কিত অঞ্চল এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য আমেরিকার দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু পাকিস্তানের এই আপত্তির আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা রয়েছে। তা হলো, কাশ্মীরের ভারতভুক্তির ইতিহাস।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সময় ভারতীয় উপমহাদেশে কয়েকশো দেশীয় রাজ্য ছিল। জম্মু ও কাশ্মীর ছিল তার অন্যতম। রাজ্যের শাসক মহারাজা হরি সিং প্রথম দিকে ভারত ও পাকিস্তান— দুই দেশের সঙ্গেই দূরত্ব বজায় রেখে স্বাধীন থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট উপজাতীয় সশস্ত্র বাহিনী জম্মু ও কাশ্মীরে আক্রমণ চালায়। রাজ্যের নিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে পড়লে মহারাজা হরি সিং ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চান। তার আগে তিনি ভারতের সঙ্গে সংযুক্তির দলিলে, অর্থাৎ ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন-এ স্বাক্ষর করেন। সেই দলিলের ভিত্তিতেই ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে এবং আক্রমণ প্রতিহত করার অভিযান শুরু করে।
এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কাশ্মীরের ভারতভুক্তি কোনও পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না। ১৯৪৭ সালেই আইনগত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। পাকিস্তানের সশস্ত্র হস্তক্ষেপই বরং পরবর্তীকালে কাশ্মীরের একটি অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের দৃষ্টিতে সেই অঞ্চলই আজ পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে)।
অতএব, পাকিস্তান যখন গোটা জম্মু ও কাশ্মীরকে ‘বিতর্কিত অঞ্চল’ হিসেবে তুলে ধরে, তখন প্রশ্ন ওঠে— যে অঞ্চলটির একটি অংশ পাকিস্তান নিজেই সামরিকভাবে দখল করে রেখেছে, সেই দখলের ইতিহাসের দায় সে কীভাবে এড়িয়ে যায়?
কাশ্মীর প্রশ্ন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ককে গত প্রায় আট দশক ধরে প্রভাবিত করেছে। ১৯৪৭-৪৮-এর সংঘর্ষের পর ১৯৬৫ সালে আবার যুদ্ধ হয়েছে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও তার পরের শিমলা চুক্তি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রতিষ্ঠা করে— দুই দেশ নিজেদের সমস্যার সমাধান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে করবে।
১৯৯৯ সালের কার্গিল সংঘাত দেখিয়ে দেয়, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে ওঠে। মুম্বাই হামলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জঙ্গি হামলার পর ভারত বারবার পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে। দিল্লি মনে করে, কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের যে কোনও সমস্যা দুই দেশের মধ্যেই আলোচনা হওয়া উচিত। তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ভারত বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছে।
২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রত্যাহার এবং রাজ্যকে পুনর্গঠন করে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ— দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করার সিদ্ধান্ত ভারতীয় রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। পাকিস্তান এর তীব্র বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি তোলার চেষ্টা করে। ভারত অবশ্য জানিয়ে দেয়, এটি সম্পূর্ণ তার সাংবিধানিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়।
কাশ্মীর প্রশ্নে আমেরিকার অবস্থানও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে। শীতল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান ছিল আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট। ফলে কাশ্মীর প্রশ্নে আমেরিকার বক্তব্যে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতিফলন অনেক সময় দেখা যেত।
কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বদলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের গুরুত্ব ক্রমশ বেড়েছে। একুশ শতকে ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, মহাকাশ, ইন্দো-প্যাসিফিক এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা— এরকম বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক এখন গভীর।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কও তার চরিত্র বদলেছে। আফগানিস্তান ও সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের প্রয়োজনীয়তা ছিল অত্যন্ত বেশি। সেই প্রয়োজনও এখন আগের মতো নেই।
এই বৃহত্তর পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই সার্জিও গোরের শ্রীনগর সফরকে দেখতে হবে। তাঁর বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন একটি মন্তব্য হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমে যায়। বরং এটি ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান এবং কাশ্মীরের পরিবর্তিত পরিস্থিতির একটি প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
গোরের সফরের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পর্যটন নিয়ে তাঁর মন্তব্য। তিনি বলেছেন, কাশ্মীরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি বিবেচনা করে আমেরিকা তার ভ্রমণ-নির্দেশিকা পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
এটি বাস্তবায়িত হলে কাশ্মীরের অর্থনীতির জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ হবে। পর্যটন এই উপত্যকার বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আশঙ্কা বিদেশি পর্যটকদের কাশ্মীর থেকে দূরে রেখেছে। আমেরিকার মতো একটি দেশের ভ্রমণ-নির্দেশিকায় পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে নিশ্চয়ই ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
এখানেই কাশ্মীরের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক বয়ানের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। একসময় কাশ্মীরের নাম আন্তর্জাতিক সংবাদে প্রধানত সংঘাত, সন্ত্রাস ও অস্থিরতার সঙ্গে উচ্চারিত হতো। এখন সেখানে পর্যটন, উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার কথাও সামনে আসছে। এই পরিবর্তন ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের জন্য বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় পাকিস্তান গোরের বক্তব্যে আপত্তি জানাতেই পারে। কিন্তু কূটনৈতিক প্রতিবাদ দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না। জম্মু ও কাশ্মীরের ভারতভুক্তির ইতিহাস যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনই পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মীরের অংশটির বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না।
ভারত কখনও বলেনি যে, কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার কোনও সুযোগ নেই। ভারতের বক্তব্য হলো, আলোচনা হলে তা হতে হবে দ্বিপাক্ষিক কাঠামোয় এবং সন্ত্রাস ও হিংসামুক্ত পরিবেশে। তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘদিন ধরে ভারত-পাকিস্তানকে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধানের পরামর্শ দিয়ে এসেছে।
সুতরাং সার্জিও গোরের বক্তব্যের তাৎপর্য মূলত এই জায়গায়— তিনি কাশ্মীরের মাটিতে দাঁড়িয়ে বর্তমান বাস্তবতাকে স্বীকার করেছেন। তাঁর মন্তব্যকে ভারত কোনও বিদেশি স্বীকৃতির প্রয়োজন হিসেবে দেখছে না। ভারতের সার্বভৌমত্ব অন্য কোনও দেশের বক্তব্যের উপর নির্ভরশীল নয়।
তবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতিটি শব্দের গুরুত্ব থাকে। সেই অর্থে শ্রীনগরে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তানের জন্য এর বার্তা পরিষ্কার— কাশ্মীর নিয়ে পুরনো আন্তর্জাতিক প্রচার আর আগের মতো কার্যকর নয়।

শেষ পর্যন্ত কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সেখানকার শান্তি, উন্নয়ন এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবন। ভারত সেই পথেই এগোতে চায়। কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ— এই অবস্থান নিয়ে ভারতের কোনও দ্বিধা নেই। এখন সময় কাশ্মীরকে সংঘাতের প্রতীক নয়, শান্তি ও উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার। শ্রীনগর থেকে সার্জিও গোরের বক্তব্য সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিধ্বনি।