• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 20 August, 2026

ক্যাম্পাসে মোদীর নতুন উদ্যোগ শাসক-বিরোধী দুই শিবিরেই ছাত্র-ভাবনা

গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচনে জয়লাভে নয়; মানুষের পরিবর্তিত মন বুঝে সময়মতো নিজের রাজনৈতিক ভাষা বদলানোর ক্ষমতার মধ্যেও

ক্যাম্পাসে মোদীর নতুন উদ্যোগ শাসক-বিরোধী দুই শিবিরেই ছাত্র-ভাবনা

Photo: File Photo

গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচনে জয়লাভে নয়; মানুষের পরিবর্তিত মন বুঝে সময়মতো নিজের রাজনৈতিক ভাষা বদলানোর ক্ষমতার মধ্যেও তার পরিচয়। বিশেষত ছাত্র-যুব সমাজের ক্ষেত্রে এই সত্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকের ছাত্রই আগামী দিনের ভোটার, নাগরিক, পেশাজীবী এবং নেতৃত্ব। দিল্লির যন্তর মন্তরের ছাত্র-যুব বিক্ষোভ তাই নিছক একটি আন্দোলন নয়; তার অভিঘাত শাসক ও বিরোধী— দুই শিবিরকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদী সরকারের ‘এক দিন, এক বিশ্ববিদ্যালয়’ কর্মসূচির ভাবনা প্রশংসনীয়। এক এক দিনে এক এক বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলবেন, তাঁদের সমস্যা শুনবেন, উদ্বেগ বুঝবেন এবং সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে জানাবেন। এর মধ্যে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা— তরুণদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হলে সেই দূরত্ব কমানোর দায়িত্ব সরকারেরই।
কোনও আন্দোলন হলেই তাকে বিরোধিতার ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু সরকার যদি উল্টো প্রশ্ন করে— কেন তরুণেরা ক্ষুব্ধ? তাঁদের উদ্বেগ কোথায়? কোথায় যোগাযোগের ঘাটতি?—তবে সেটিই পরিণত গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয়। শক্তিশালী সরকার শুধু নিজের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে না, প্রয়োজন হলে মানুষের কাছে গিয়ে তাঁদের কথাও শোনে।
অবশ্য এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের উপর। মন্ত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শুধু সরকারের সাফল্যের তালিকা শোনালে কর্মসূচিটি আর পাঁচটি প্রচারের মতোই হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁরা যদি সত্যিই ছাত্রদের প্রশ্ন শোনেন, সমালোচনার মুখোমুখি হন এবং সেই মতামত নীতিনির্ধারণে পৌঁছে দেন, তবে ‘এক দিন, এক বিশ্ববিদ্যালয়’ রাষ্ট্র ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিশ্বাসের সেতু হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে কংগ্রেসের ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিকেও ইতিবাচক ভাবে দেখা উচিত। বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়, সমাজের যে অংশের প্রশ্ন যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না, তাদের পাশে দাঁড়ানোও তার দায়িত্ব। দেশের ৮০০টি ছোট ও মাঝারি শহরে ছাত্র-সম্মেলনের পরিকল্পনা সেই অর্থে তাৎপর্যপূর্ণ। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ছাত্রসমাজের কাছে পৌঁছনোর এই প্রয়াস অন্তত একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— তরুণদের রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে রাখা যাবে না।
অবশ্যই এর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের মধ্য দিয়েও যদি ছাত্রদের সমস্যা জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসে, তবে তার গণতান্ত্রিক মূল্য রয়েছে। বরং শাসক ও বিরোধী— দুই পক্ষই যদি তরুণদের আস্থা অর্জনের প্রতিযোগিতায় নামে, তাতে লাভ ছাত্রসমাজেরই।
যন্তর মন্তরের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, নতুন প্রজন্মকে শুধু ভোটার হিসেবে দেখলে চলবে না। তারা প্রশ্ন করে, তথ্য যাচাই করে, প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার তুলনা করে এবং প্রয়োজন হলে প্রচলিত দলগুলির বাইরেও নিজের মত প্রকাশের জায়গা তৈরি করে। ফলে তরুণদের কাছে পৌঁছনোর একমাত্র কার্যকর পথ সংলাপ— একতরফা বক্তৃতা নয়।
এই জায়গাতেই মোদী সরকারের উদ্যোগের বিশেষ তাৎপর্য। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ক্যাম্পাসে যাওয়া মানে শুধু মন্ত্রীদের সফর নয়, এটি তরুণ সমাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা। আর কংগ্রেসের ছাত্র-সম্মেলন বিরোধী রাজনীতির সেই পরিসরকে শক্তিশালী করার প্রয়াস। দুই পক্ষের রাজনৈতিক লক্ষ্য আলাদা হলেও ছাত্রদের গুরুত্ব দেওয়ার জায়গায় একটি মিল তৈরি হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা ইতিবাচক হোক।
তরুণেরা কারও করুণার প্রার্থী নয়, তারা অংশীদার হতে চায়। তাদের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া মানে ভবিষ্যৎ ভারতকে গুরুত্ব দেওয়া। কংগ্রেস ছাত্রদের পাশে দাঁড়াক, প্রশ্ন তুলুক— এটি গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব আরও বড়। বিরোধী দল প্রশ্ন করবে, সরকার উত্তর দেবে— এই ভারসাম্যই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
এই জায়গায় নরেন্দ্র মোদী সরকারের উদ্যোগ বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। একটি আন্দোলনের অভিঘাতকে অস্বীকার না করে ছাত্রদের কাছে পৌঁছনোর সিদ্ধান্ত দেখাচ্ছে, সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের যোগাযোগের পদ্ধতি বদলাতে প্রস্তুত। ক্ষমতার অলিন্দ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে গিয়ে তরুণদের কথা শোনার এই উদ্যোগ রাজনৈতিক কৌশলের চেয়েও বড়— এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে গড়ার প্রয়াস।
শেষ পর্যন্ত যে সরকার তরুণদের প্রশ্ন শুনতে পারে, সমালোচনাকে ভয় পায় না এবং প্রয়োজন হলে নিজের পদ্ধতি সংশোধন করতে পারে, ভবিষ্যৎ ভারত নির্মাণে তার দাবিই সবচেয়ে শক্তিশালী। মোদী সরকারের ‘এক দিন, এক বিশ্ববিদ্যালয়’ সেই সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। আর কংগ্রেসের ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ প্রমাণ করছে, ছাত্রসমাজকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আগামী দিনের ভারত তাই শুধু নির্বাচনী মঞ্চে নির্ধারিত হবে না। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে— তরুণদের কথা কে বেশি জোরে বলল, তা নয়; কে বেশি মন দিয়ে শুনল, তার উপর।